kalerkantho


সব শাখা লাভজনক করে এগিয়ে যাবে অগ্রণী ব্যাংক

মোশতাক আহমদ   

১৬ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



সব শাখা লাভজনক করে এগিয়ে যাবে অগ্রণী ব্যাংক

প্রতিটি শাখাকে লাভজনক করার মাধমে অগ্রণী ব্যাংক একটি সফল প্রতিষ্ঠান হিসেবে এগিয়ে যাবে বলে আশা করছেন ব্যাংকের সিইও ও এমডি মোহাম্মদ শামস-উল ইসলাম। সম্প্রতি রাষ্ট্রায়ত্ত এ প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে আসা এ দক্ষ কর্মকর্তা জানালেন, সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা ছয় শতাধিক শাখার মাধ্যমে যথার্থতা যাচাই করে প্রকৃত গ্রাহকদের মধ্যে ঋণ প্রদান করা হবে, সেই সঙ্গে কৃচ্ছ তা সাধনের মাধ্যমে অতিরিক্ত খরচ কমানো হবে। এভাবে ক্রমান্বয়ে অগ্রণী ব্যাংক হয়ে উঠবে একটি সফল ব্যাংকের প্রতিচ্ছবি।

গত ২৪ আগস্ট অগ্রণী ব্যাংকের নতুন এমডি হিসেবে যোগ দেওয়ার আগে শামস-উল ইসলাম আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের এমডি ছিলেন। তবে অগ্রণী ব্যাংকে তিনি নতুন নয়, বরং এ ব্যাংকেই সিনিয়র অফিসার হিসেবে তাঁর কর্মজীবনের হাতেখড়ি বলে জানান। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ চাকরি জীবনে অগ্রণী ব্যাংকের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছি। তাই আবারও নিজের পুরনো কর্মস্থলে আসতে পেরে আনন্দিত। ’ সেই সঙ্গে নতুন পরিকল্পনার কথাও জানালেন। তিনি আরো বলেন, ‘ব্যাংকিং খাতে সাফল্য অর্জনে স্বচ্ছতা-জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি। সেই সঙ্গে স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা, মনিটরিং সেল জোরদার করা, দক্ষ ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন লোকবল নিয়োগ করা, সুদূরপ্রসারী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করাও প্রয়োজন। সব কর্মকতা-কর্মচারী যদি নিজ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে তবে ব্যাংক সফল হবে।

শামস-উল ইসলাম বলেন, ‘আমি অগ্রণী ব্যাংকের সিইও হিসেবে যোগ দেওয়ার পর প্রথমেই ১০০ দিনের একটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করেছি। সেখানে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিজ্ঞাপন দেওয়ার ক্ষমতা ১৫ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ১০ হাজার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ব্যাংকের সব উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে যতটা সম্ভব কৃচ্ছ তা সাধনের কথাও বলে দেওয়া হয়েছে। আমি দীর্ঘদিন ধরে বৈদেশিক শাখায় কর্মরত ছিলাম। মানি লন্ডারিং কিভাবে রোধ করা যায় এ বিষয়ে আমার অভিজ্ঞতা অনেক। আশা করি এখন থেকে এসব বিষয়ে কেউ অনিয়মের সুযোগ পাবে না। তা ছাড়া দায়িত্ব পালনে কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ড ক্লোজ মনিটরিং করা হবে। হঠাৎ শাখা পরিদর্শনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এরই মধ্যে কয়েকটি শাখা পরিদর্শনে গিয়ে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে তাত্ক্ষণিক বদলি করা হয়েছে। এই ধারা অব্যাহত রাখতে পারলে আশা করি সবাই তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হবে। ’

শামস-উল ইসলাম বলেন, অগ্রণী ব্যাংক পাঁচ কোটি টাকার অনুমোদিত মূলধন ও এক কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধন নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল। পরবর্তী সময়ে ২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠানটি পাবলিক লিমিটেড কম্পানিতে পরিণত হয়। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাংকের ১১টি পরিষদ অফিস, ৩৪টি বিভাগের হেড অফিস, ২৭টি করপোরেট অফিস, ৬২টি আঞ্চলিক অফিস এবং ৪০টি অনুমোদিত পরিবেশক শাখা ও ৯৩৬টি শাখা রয়েছে। অগ্রণী ব্যাংকের বর্তমানে অনলাইন শাখার সংখ্যা ৩৫২টি।

অগ্রণী ব্যাংকের নতুন এমডি মনে করেন ব্যাংকিং খাতে এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আমানতের সুদের হার। ব্যাংকগুলো ক্রমাগত আমানতের সুদহার কমাচ্ছে। দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জটি হলো ঋণের গুণগত মান বাড়ানো। ব্যাংকগুলো ঋণ দেবে কিন্তু সে ঋণ যেন অবশ্যই গুণগত মানের হয়। গ্রামে বসবাসকারী প্রান্তিক জনগণকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির মধ্যে নিয়ে আসাও ব্যাংকিং খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

শামস-উল ইসলাম বলেন, ‘খেলাপি ঋণ হলো ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি অসমাপ্ত বা অনন্ত বেদনাগাথা। এটি শেষ হয় না কখনো। ভারতসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর খেলাপি ঋণ অনেক কম। তারা যদি কমিয়ে আনতে পারে, তাহলে আমরা পারব না কেন? খেলাপি ঋণ কমানোর জন্য আর্থিক খাতে আরো কিছু বিষয় যুক্ত করতে হবে—আর্থিক খাতের জন্য আলাদা জুডিশিয়ারি থাকা প্রয়োজন। ব্যবসা-বাণিজ্যসংক্রান্ত মামলা এত বেড়ে গেছে, যা প্রচলিত জুডিশিয়ারিতে দীর্ঘসূত্রতার সৃষ্টি করছে। যারা ঋণ দিতে চায় না তারা নানাভাবে মিথ্যা তথ্য দিয়ে আদালতের শরণাপন্ন হয়। ’ তিনি বলেন, অবলোপনকৃত ঋণসহ দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ১৭ শতাংশ। খেলাপি ঋণ আদায়ের চেষ্টা অব্যাহত রেখে কর্মকর্তাদের আগামীতে সঠিক নিয়মে ঋণ দেওয়ার বিষয়ে আন্তরিক হওয়ার পাশাপাশি সতর্ক হতে হবে বলে তিনি জানান।

শামস-উল ইসলাম বলেন, ‘২০১৫ সাল থেকে স্থায়ী আমানতে সুদহার ০.৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়েছে সরকারি মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। কস্ট অব ফান্ড কমিয়ে আনার জন্যই ব্যাংকগুলো আমানতের সুদহার কমিয়েছে। ব্যাংকের সুদের হার কমলে ব্যবসা-বাণিজ্য ভালো হবে। বিদেশের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশের মতো এত বেশি সুদ নেই। তাই তারা ভালো করছে। এ কারণে গত কয়েক বছর ধরে বিদেশি ব্যাংক থেকে আমাদের দেশীয় ব্যবসায়ীরা ঋণ নিচ্ছে। ’ তিনি জানান, সুদের হার কমলে ব্যাংকের তো কোনো সমস্যা নেই। কারণ ব্যাংক যে হারেই ঋণ দেবে তা থেকে চার থেকে পাঁচ শতাংশ লাভ করবে। তাহলে ব্যাংকের অগ্রগতিতে সমস্যা কোথায়।  

এ কর্মকর্তা বলেন, অগ্রণী ব্যাংকসহ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো সাধারণ ব্যাংকিং ছাড়াও রাষ্ট্রের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে। মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, বয়স্ক ভাতা ও বিধবা ভাতা প্রদান এবং সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনীর প্রকল্প। এ ছাড়া সরকারের বিভিন্ন ধরনের বিল গ্রহণ ও বেতন-ভাতা প্রদানেও ব্যস্ত থাকতে হয় তাদের। এ জন্য বিভিন্ন শাখায় অনেক সময় গ্রাহকদের বসার জায়গাও দেওয়া যায় না।

শামস-উল ইসলাম বলেন, ব্যাংকিং খাত অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি জায়গা। সারা বিশ্বেই এই খাতে কিছু কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে থাকে। এখানেও এ ধরনের দুই-একটা ঘটনা ঘটেছে। তবে ব্যাংকারদের অনিয়ম, দুর্নীতি এবং গ্রাহক হয়রানি প্রমাণিত হলে যদি তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যায় তবে তারা সতর্ক হবে। আর এতে এ খাতে অনিয়ম অনেক কমে আসবে। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার যেভাবে বেতন-ভাতা বাড়িয়েছে তাতে অন্তত কারো পক্ষে অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকার কোনো সুযোগ নেই। শামস-উল ইসলাম বলেন, ‘আমরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কাজ করার পাশাপাশি দেশের বাইরেও অন্তত অর্ধশত ব্যাংকিং এজেন্ট নিয়োগের চিন্তাভাবনা করছি। এরই মধ্যে বিভিন্ন দেশে এর সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছে। এটি করতে পারলে অগ্রণী ব্যাংকের রেমিট্যান্স সংগ্রহ কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। ’


মন্তব্য