kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


দক্ষ কর্মীরা সুনাম ফেরাবে সোনালী ব্যাংকের

মোশতাক আহমদ   

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



দক্ষ কর্মীরা সুনাম ফেরাবে সোনালী ব্যাংকের

সোনালী ব্যাংকের দক্ষ কর্মীরাই এই ব্যাংকের সুনাম ফেরাবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন ব্যাংকটির নবনিযুক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ। তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন দেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক ব্যাংকটির সারা দেশে এক হাজার ২০০ শাখায় এখন কাজ করছেন বিশাল দক্ষ জনগোষ্ঠী।

এই কর্মীদের মনোবল ফিরিয়ে তাঁদের দক্ষতা বৃদ্ধি করে সোনালী ব্যাংককে সত্যিকারের একটি বিনিয়োগবান্ধব ব্যাংক হিসেবে গড়ে তোলা হবে। সম্প্রতি কালের কণ্ঠকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে সোনালী ব্যাংক নিয়ে নানা পরিকল্পনার কথা বলেন তিনি।

ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ বলেন, ‘প্রায় ২৩ হাজার প্রশিক্ষিত ও দক্ষ কর্মকর্তা রয়েছে সোনালী ব্যাংকের। আমার প্রধান কাজ হবে প্রত্যেক কর্মকর্তার সেরাটা বের করে নিয়ে আসা। এ জন্য আমি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্ন বিষয়ে অনুপ্রাণিত করার পদক্ষেপ নিচ্ছি। ’ প্রত্যেকের কাজের বিচার বিশ্লেষণ করে পদোন্নতি ও পুরস্কারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান তিনি।

দূরদর্শী ব্যাংকার মো. ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ ১৯৮২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগ থেকে বিকম (অনার্স) এবং ১৯৮৮ সালে আইবিএ থেকে ফিন্যান্স বিষয়ে এমবিএ ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি ঢাকা শিক্ষা বোর্ড থেকে এসএসসিতে বাণিজ্য বিভাগে মেধা তালিকায় তৃতীয় স্থান অধিকার করেন। দীর্ঘ পেশাজীবনে তিনি রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের জিএম হিসেবে ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম সার্কেলে দায়িত্ব পালন করেন। সর্বশেষ কর্মসংস্থান ব্যাংকের এমডি হিসেবে কাজ করেন।

দেশের ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় হলমার্ক, বিসমিল্লাহসহ নানা কেলেঙ্কারির ঘটনায় ইমেজ হারিয়েছে সোনালী ব্যাংক। সোনালী ব্যাংককে দুর্নীতিমুক্ত করার মাধ্যমে এর হারানো ইমেজ ফেরাতে চান নতুন এমডি। তিনি বলেন, ‘আগের হলমার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপের ঘটনাগুলো নিয়ে এখনো গভীরে যেতে পারিনি। তবে সমস্যাগুলো পর্যবেক্ষণ করেছি। তবে এই প্রতিষ্ঠানে আগে যেভাবেই বা যাদের অবহেলা ও অনিয়মের কারণে সুনাম নষ্ট হয়েছে তা ফেরাতে নতুনভাবে কাজ শুরু করা হবে। ব্যাংকে যোগ দেওয়ার পরপরই সব পর্যায়ের কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। ব্যাংকটিতে কী ধরনের দুর্বলতা রয়েছে, সেগুলো বাছাই করা হয়েছে। আমরা সবার মতামত নিয়েই দুর্নীতিমুক্ত সোনালী ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছি। এ ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদেরও সহযোগিতা প্রয়োজন। ’

ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ আরো বলেন, ‘হলমার্ক দুর্ঘটনার পর সবাই সমালোচনা করে এর সব দায় সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ওপর চাপায়। এ ধরনের দুর্ঘটনা নিয়ে সংশ্লিষ্টরা মতামত দিলে ব্যাংকটির জন্য ভালো হতো। ফলে মানুষের মনে ব্যাংকের প্রতি একটা ভ্রান্ত ধারণার সৃষ্টি এবং নেতিবাচক মনোভাবের কারণে সারা দেশে ব্যাংকের সুনাম নষ্ট হয়। এসব কারণে ব্যাংক কর্মকর্তারা ঋণ দিতে ভয় পান। ঋণের একটি প্রক্রিয়া আছে এবং ব্যাংকে ঋণ মঞ্জুর করার জন্য একটি সিলেকশন বোর্ড আছে। আমি সিলেকশন বোর্ডের মতামত অনুযায়ী ঋণ প্রদান করতে চাই। আমি প্রথমে শক্তি, সুযোগ, দুর্বলতা ও হুমকি বিবেচনা করে এবং সার্বিক বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করে লক্ষ্য ও কৌশল নির্ধারণ করতে চাই। ’ নতুন চেয়ারম্যানসহ পরিচালনা পর্ষদকে নিয়ে সারা দেশের সব শাখার মাধ্যমে ঋণ কার্যক্রম ছড়িয়ে দেওয়া হবে উল্লেখ ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ বলেন, মাত্র ৪৭টি শাখা মোট ঋণের ৭৫ শতাংশ বিনিয়োগ করে। সেখানে এখন অন্য সব শাখাকেও ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর কাজে নিয়োজিত করতে নির্দেশনা দেওয়া হবে। এ ছাড়া দেশের সবচেয়ে বড় এই বাণিজ্যিক ব্যাংকটির অনিয়ম, দুর্নীতি শূন্যের কোটায় নামিয়ে এনে এটিকে দেশের নাগরিকদের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে।

ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ বলেন, ‘বড় ব্যাংক হওয়ার সুবিধা যেমন আছে, তেমনি অসুবিধাও আছে। এটি সত্যি যে, বড় ব্যাংক ঘিরে সব ধরনের মানুষের প্রত্যাশা থাকে সবচেয়ে বেশি। তবে সেটিকে আমি ইতিবাচকভাবেই নিতে চাই। প্রথমে আমি ব্যাংকের গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে জেনে একটি মূল্যায়ন ও পরিকল্পনা করব। কেননা এ ব্যাংকের ছায়াতলে ভালো, মন্দ, সুবিধাবাদী ও শুভাকাঙ্ক্ষী সব ধরনের মানুষই রয়েছে। ব্যাংকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মানুষকে আশ্রয় দেওয়া হবে আমার নৈতিক দায়িত্ব। ’ তিনি বলেন, ‘দক্ষ ও প্রশিক্ষিত বিশাল কর্মীবাহিনী সোনালী ব্যাংকের জন্য বাড়তি সুবিধা। এখন খেলাপি ঋণ কমিয়ে যত দ্রুত সম্ভব ব্যাংকটিকে বিনিয়োগবান্ধব করাই আমার প্রধান কাজ। ’

ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ জানান, ব্যাংকের উন্নয়নের ধারাকে এগিয়ে নিতে ঋণ বিতরণে শহরের পাশাপাশি গ্রামকেও প্রাধান্য দিতে হবে। গ্রামীণ অর্থনীতি যত শক্তিশালী হবে, দেশের অর্থনীতির ভিত তত মজবুত হবে। ব্যক্তিস্বার্থ পরিহার করে ব্যাংকের উন্নয়নে কাজ করতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে নতুন সিইও বলেন, শহরের পাশাপাশি গ্রামেও ঋণ বিতরণে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বশীল হতে হবে। গ্রামের সাধারণ গ্রাহকদের সঙ্গে সাধারণ আচরণ করে তাদের কাছে ব্যাংকের সেবা পৌঁছে দিতে হবে। কারো কোনো গাফিলতি বরদাশত করা হবে না। অনিয়মের জন্য কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। আমানত সংগ্রহ, শাখা বিস্তার, বিনিয়োগ, ঋণ প্রদানসহ ব্যাংকিং খাতের বিভিন্ন সূচকে এখনো সোনালী ব্যাংক শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে উল্লেখ করে ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ বলেন, ‘এই সূচকগুলো আরো উন্নত করাই আমার প্রধান লক্ষ্য। স্বল্প সময়ে গতি বাড়াতে প্রয়োজন দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনশক্তি। যা রয়েছে সোনালী ব্যাংকের জন্য প্লাস পয়েন্ট। এখন আমার স্বপ্ন ব্যাংকিং সেক্টরের নতুন নতুন জিনিস খুঁজে বের করা। খেলাপি কমিয়ে যত দ্রুত সম্ভব ব্যাংকটিকে বিনিয়োগবান্ধব করা। ’

ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে গত এপ্রিলে ব্যাংক খাতে আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে আট লাখ ১৮ হাজার ৯৯৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১০.২৭ শতাংশ আমানত রয়েছে সোনালী ব্যাংকের। আর আগস্টের শেষ নাগাদ আমাদের ডিপোজিট ছাড়িয়েছে ৯৭ হাজার কোটি টাকা। সারা দেশে বিভিন্ন ব্যাংকের প্রায় ৯ হাজারের মতো শাখা আছে, যার মধ্যে সোনালী ব্যাংকের শাখাই হলো এক হাজার ২০৭টি। আমাদের বিনিয়োগ আছে ৯৩ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ হিসেবে এবং ৫৮ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ। নানামুখী খাতে এ বিনিয়োগকে আরো বাড়াতে হবে। কেননা অর্থনীতি শক্তিশালী করতে এখন বিনিয়োগের কোনো বিকল্প নেই। সোনালী ব্যাংককে বিনিয়োগবান্ধব করার মাধ্যমে অর্থনীতির ভিত্তি মজবুত করার দায়িত্ব নিতে চাই। এ জন্য সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা আমার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। ’

সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে অসতর্কভাবে শুধু সংখ্যাটা উল্লেখ করলেও সঠিক মাত্রায় পরিমাপ করা যায় না। সব খেলাপি ঋণ এক জাতীয় নয়। খেলাপি ঋণকে শ্রেণিবিন্যাস করতে হবে এবং নির্ধারণ করতে হবে কী কারণে ঋণগুলো খেলাপি হয়েছে। যেমন—প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ব্যবসায়িক শত্রুতা কিংবা ব্যবসায়িক ক্ষতি ইত্যাদির কারণে খেলাপি ঋণের সৃষ্টি হয়। খেলাপি ঋণের শ্রেণিবিন্যাস ও পুনর্বিন্যাস করে তা কমানো হবে।

সোনালী ব্যাংকের এই শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, অর্থকে যত বিনিয়োগ করা সম্ভব হবে ততই ব্যাংকটির সক্ষমতা ও সচ্ছলতা বাড়বে। এ জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। সব ধরনের শাখা ব্যবস্থাপককে এ বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য নির্দেশ পাঠানো হবে।

সোনালী বাংকের নতুন এই সিইও বলেন, ‘রেমিট্যান্স আহরণে শীর্ষ ১০ ব্যাংকের মধ্যে শীর্ষ কাতারে রয়েছে সোনালী ব্যাংক। ২০১৫ সালের এপ্রিল থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ব্যাংকটিতে রেমিট্যান্স এসেছে ১৭৮ কোটি ৩০ লাখ ডলার, যা মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ১০ শতাংশ। ফলে প্রবাসীদের কষ্টার্জিত অর্থ দেশে থাকা স্বজনদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে আস্থার সঙ্গে কাজ করবে। অন্যদিকে গত বছরে ১৭ হাজার ৬৪৬ কোটি টাকা কৃষিঋণ বিতরণ করেছে দেশের সমগ্র ব্যাংকিং খাত। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংকের অংশগ্রহণ এক হাজার ১৩০ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৭ শতাংশ। এটিকে আমরা আরো বাড়ানোর চেষ্টা করছি। কেননা কৃষির উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নির্ভর করছে। আর কৃষিঋণের বহুমুখিতা আনতে সর্বাত্মক চেষ্টা করা হবে। ’


মন্তব্য