kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


জিডিপির প্রবৃদ্ধিই সমৃদ্ধি নয়

আবুল কাশেম   

৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



জিডিপির প্রবৃদ্ধিই সমৃদ্ধি নয়

মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি হলো গাড়ির স্পিডোমিটারের মতো। অর্থনীতি কতটা দ্রুত বা মন্থর তা বোঝা যায় এটি দেখে।

তবে স্পিডোমিটার বলতে পারে না গাড়িটি সঠিক পথে চলছে কি না। পথ বেঠিক বা অসম হলে গতি বৃদ্ধিতে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। জিডিপি সামগ্রিক পরিমাণগত হিসাব দেয়। প্রবৃদ্ধিতে জিডিপি বাড়ে, কিন্তু এটি সমৃদ্ধির নির্দেশক নয়। বেশির ভাগ মানুষের জীবনমানের পতন সত্ত্বেও সম্পদশালী কিছু মানুষের আয় বৃদ্ধি কোনো দেশকে উচ্চ প্রবৃদ্ধি এনে দিতে পারে। জিডিপি বিষয়ক এ ধারণা নিউ ইকোনমিকস ফাউন্ডেশনের (এনইএফ) নির্বাহী পরিচালক জর্জ জেমস স্টুয়ার্ট ওয়ালিসের। শুধু ওয়ালিস নন, বিশ্বের নামকরা অনেক অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষক বলছেন, জিডিপি পদ্ধতিতে কোনো দেশের আর্থিক অগ্রগতি পরিমাপ করা গেলেও এটি ওই দেশের মানুষের সমৃদ্ধি বা সুখের নির্দেশক নয়।

গত জানুয়ারিতে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সম্মেলনে অনেক অর্থনীতিবিদই বলেন, জিডিপির মধ্যে একটি দেশের মানুষের উন্নয়ন, সন্তুষ্টি বা সমৃদ্ধি পরিমাপের কিছু নেই। এসব বোঝার জন্য ভিন্ন উপায় খুঁজে বের করার ওপর গুরুত্ব দেন তাঁরা। তাঁদের মতে, জিডিপি দিয়ে একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মাপা যায়, কিন্তু দেশের মানুষের ভালো-মন্দের কিছুই বুঝা যায় না।

ওই অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, একটি সুষম অর্থনীতির দেশ প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক চাহিদা পূরণ করবে। অর্থাৎ মানুষ স্বাস্থ্যসম্মত ও সুখী জীবন যাপন করবে, চরম বৈষম্য ও পরিবেশগত বিপর্যয় থেকে সুরক্ষা পাবে। কিন্তু জিডিপির উচ্চ প্রবৃদ্ধিও এসবের নির্দেশক নয়। অর্থাৎ জিডিপির প্রবৃদ্ধি মানুষের জীবনে সমৃদ্ধি এনে দিতে পারে না।

এই পরিপ্রেক্ষিতে দেশের মানুষ কতটা ভালো আছে তা জানার জন্য যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ২০১০ সালের ১৫ নভেম্বর প্রথমবারের মতো জিডিপির বাইরে পাঁচটি সূচক ব্যবহার করার ঘোষণা দেন। এগুলো হলো ভালো চাকরি, সরকারি নীতির ভালো-মন্দ, পরিবেশ সুরক্ষা, স্বচ্ছতা ও সুস্বাস্থ্য।

বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর বিদেশি কর্মীরা যে পাঁচ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স নিয়ে যাচ্ছে, তাও এ দেশের প্রবৃদ্ধি বাড়াতে ভূমিকা রাখছে। এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে হ্যাকাররা যে আট কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি করেছে, সেটিও চলতি অর্থবছরের জিডিপির হিসাবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এ টাকা ফেরত পাওয়া গেলেও নতুন করে জিডিপিতে ঢুকবে না। প্রবাস থেকে বাংলাদেশিরা যে ১৫ বিলিয়ন ডলার পাঠায় বছর বছর, তার জায়গা নেই জিডিপির হিসাবে।

জিডিপির ধারণার প্রবর্তক ইংরেজ অর্থনীতিবিদ উইলিয়াম পেটি। ১৬৫২ থেকে ১৬৭৪ সালের মধ্যে এ ধারণা প্রবর্তন করেন তিনি। ১৬৯৫ সালে ইংরেজ অর্থনীতিবিদ চার্লস ডেভন্যান্ট এ ধারণার আরো বিকাশ ঘটান। ১৯৩৪ সালে জিডিপি পরিমাপের আধুনিক পদ্ধতির প্রস্তাব করেন রুশ বংশোদ্ভূত আমেরিকান অর্থনীতিবিদ সাইমন কুজনেটস। তবে তিনি সতর্কতা ব্যক্ত করে বলেছিলেন, এটি কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন বিচারের যথাযথ উপায় নয়। ১৯৪৪ সালে ব্রেটন উডস সম্মেলনে জিডিপিকে একটি দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার মূল্যায়নের প্রতিনিধিত্বমূলক উপায় হিসেবে গ্রহণ করে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ। তারপর থেকে বিশ্বজুড়ে কোনো দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা বোঝার জন্য এ পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। একটি দেশে এক বছরে যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হয়, জিডিপি পরিমাপে তা বিবেচনা করা হয়। অর্থাৎ কোনো বছরে কোনো একটি দেশে যে পণ্য ও সেবা উত্পাদিত হয়, তার আর্থিক মূল্যই ওই বছরে ওই দেশের জিডিপি। এখনকার অর্থনীতিবিদরা বলছেন, তিনটি বিষয় জিডিপির প্রবৃদ্ধির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এগুলো হলো মৌলিক মানবিক চাহিদা (খাদ্য, পানি, আশ্রয় ও নিরাপত্তা), ভালো থাকার ভিত্তি (মৌলিক শিক্ষা, তথ্য, স্বাস্থ্য ও টেকসই পরিবেশ) ও সুযোগ-সুবিধা (জনগণের অধিকার নিশ্চিত করা, পছন্দের স্বাধীনতা বা ফ্রিডম অব চয়েস, বৈষম্য দূর করা এবং উচ্চশিক্ষায় প্রবেশাধিকার)।

বিশ্লেষকরা বলছেন, দুটি দেশের কথা ভাবা যাক। দুটি দেশই এক বছরে ১০০ টাকার পণ্য ও সেবা উত্পাদন করেছে। অর্থাৎ তাদের জিডিপি সমান। কিন্তু একটি দেশের সরকার ১০০ টাকার মধ্যে ৯০ টাকা লুট করেছে। আরেক দেশের সরকার ১০০ টাকা জনগণের কল্যাণে সমহারে ব্যয় করেছে। এই দুই দেশের মধ্যে কোনটি ভালো, তা জিডিপি বলতে পারে না। জিডিপির প্রবৃদ্ধি দেখে একটি দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঠিক চিত্রও বুঝা যায় না। তা সত্ত্বেও উন্নয়নশীল দেশগুলো জিডিপির উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জন করে বাহবা কুড়ানোর চেষ্টা করছে। গত জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত দাভোস সম্মেলনে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিেসর মতে, জিডিপি একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা পরিমাপের সঠিক উপায় নয়। এটি নাগরিকের অবস্থার ভালো-মন্দ তুলে ধরতে পারে না। ২০০৯ সাল বাদে প্রতিবছরই যুক্তরাষ্ট্রে জিডিপির ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি ঘটছে। কিন্তু বেশির ভাগ নাগরিকের জীবনমান ৩৩ বছর আগের মানের চেয়েও খারাপ দশায় পৌঁছেছে। অর্থনীতির সুফল চলে গেছে সর্বোচ্চ সম্পদশালীদের কাছে। আর নিচের দিকে এখন যে মজুরি রয়েছে, প্রকৃত অর্থে এটি ৬০ বছর আগের মজুরির চেয়ে কম।

ওই সম্মেলনে আইএমএফ প্রধান ক্রিস্টিন লাগার্দে বলেন, জিডিপি থেকে পিছু হটতে হবে। এটি শুধু উত্পাদিত পণ্য ও সেবার মূল্যের যোগফল। জিডিপি অর্থনীতির স্বাস্থ্যের পুরো চিত্র তুলে ধরতে পারে না। দ্রুত ভিন্ন কোনো মাপকাঠি খুঁজে বের করতে হবে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রধান অর্থনীতিবিদ জেনিফার ব্লাংকির বক্তব্য, একটি দেশের পণ্য ও সেবার মোট মূল্যের নির্দেশক জিডিপি। দেশটি কেমন পণ্য উত্পাদন করছে তা এখানে মুখ্য নয়, কে উত্পাদন করছে তাও বিবেচ্য নয়। দেশটির কোনো অবৈধ মাদক কারখানায় উত্পাদিত মাদকও জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

জিডিপির প্রবৃদ্ধি নিয়ে তিনটি প্রশ্ন তুলেছেন ব্লাংকি—প্রবৃদ্ধি কি স্বচ্ছ? এটি কি পরিবেশবান্ধব? এটি কি জীবনমান উন্নত করছে? তাঁর মতে, জিডিপি একটি আংশিক, স্বল্পমেয়াদি মাপকাঠি। দরকার বড় পরিসরের ও দায়বদ্ধ মাপকাঠি।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, জিডিপি একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চিত্র বহন করে। তবে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জনগণের মঙ্গল হলো কি না তা তুলে ধরতে ব্যর্থ হচ্ছে। আয়বৈষম্য জিডিপিতে ধরা পড়ে না। দুটি দেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধি সমান হলেও কোন দেশ ভালো, তা জিডিপিতে বুঝা যায় না। বিভিন্ন মানব উন্নয়ন সূচক, যেমন শিক্ষার উন্নয়ন, নিরাপদ পানি ও বাসস্থানের সুবিধা—এসব জিডিপি নিশ্চিত করতে পারে না। তিনি বলেন, তবু অর্থনৈতিক উন্নয়নে জিডিপির উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে।


মন্তব্য