দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনায় খরচ (কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস) বাড়ছে বলে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তিনি বলেন, এটাকে সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হবে। তবে এই মুহূর্তে এই সমস্যার সমাধানে তাঁর কাছে কোনো সমাধান নেই। বাজেটের পর এই সমস্যার সমাধানে করণীয় ঠিক করতে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বসবেন বলে আশ্বস্ত করেন তিনি। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই ও এনটিভি যৌথভাবে ‘আইএফআইসি কেমন বাজেট চাই’ শীর্ষক প্রাক-বাজেট আলোচনার আয়োজন করে। ওই আলোচনায় অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। গত শুক্রবার রাতে রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত আলোচনা সঞ্চালনা করেন ফেডারেশন অব চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এফবিসিসিআই) সভাপতি আবদুল মাতলুব আহমাদ। অর্থমন্ত্রী বলেন, আগামী বাজেটে সরকারের নেওয়া বড় বড় প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। তাই আটটি মেঘা প্রকল্প নিয়ে স্বতন্ত্র বাজেট থাকছে এই বাজেটে। এটা হবে মূল বাজেটেরই অংশ। (আট মেগা প্রকল্পের মধ্যে অন্যতম পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, মেট্রো রেল, এলএনজি টার্মিনাল, মাতারবাড়ি বিদ্যুৎ প্রকল্প, পায়রা সমুদ্রবন্দর ইত্যাদি)। বাজেটে অগ্রাধিকার খাত সম্পর্কে তিনি আরো বলেন, এবারের বাজেটে অবশ্য তৈরি পোশাক খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া ওষুধ, চামড়া, আইটি, কৃষিপণ্যেও অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এর পাশাপাশি রপ্তানি বাড়াতে নতুন শিল্প হিসেবে জাহাজ নির্মাণে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলেও তিনি জানান। অর্থমন্ত্রী বলেন, সম্পদ সৃষ্টির জন্য রপ্তানি আয় বাড়াতে হবে। তাই সরকারের পরিকল্পনা উত্পাদন খাতে সহায়তা দেওয়া। মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এমসিসিআই) সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুরের এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের ব্যবসায় খরচ বাড়ছে এটা ঠিক। তবে এ মুহূর্তে আমার কাছে কোনো সমাধান নেই। বাজেটের পর ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বসে করণীয় ঠিক করা যেতে পারে।’ বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘আমাদের সরকার ব্যবসা করে না। এ ছাড়া অর্থমন্ত্রী ও আমি নিজেও কোনো ব্যবসা করি না। তবে আমরা ব্যবসায়ীদের ব্যাপারে খুবই যত্নবান। এ ছাড়া বর্তমান সরকার বাস্তবধর্মী সরকার। আমার আশা বাস্তবতাকে সামনে নিয়েই এবারের বাজেট হবে।’ তিনি বলেন, ‘অর্থমন্ত্রী এবার নিয়ে ১০ বারের মতো সরকারের বাজেট উপস্থাপন করছেন। আমার আশা তিনি এবারও সারা দেশের সাধারণ মানুষ এবং ব্যবসায়ীদের কথা মাথায় বেখেই আসন্ন বাজেট উপস্থাপন করবেন।’ নতুন ভ্যাট আইন নিয়ে মন্ত্রী বলেন, সরকার এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না যার ফলে দেশের সাধারণ মানুষকে সমস্যায় পড়তে হয়। তবে একসময় সবাইকেই নতুন ভ্যাট আইনের আওতায় যেতে হবে। অর্থনীতিবিদ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, দেশে যে পরিমাণ বিনিয়োগযোগ্য আর্থিক মূলধনের জোগান আছে, সেই হারে বিনিয়োগ নেই। তার কারণ হলো, গত কয়েক বছর ধরে দেশে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগে একটা মন্দাভাব চলছে। তাই বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে বাজেটে কী রাখা হয়েছে তা দেখার ব্যাপার আছে। ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ আরো বলেন, গত অর্থবছরের চেয়ে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেটের আকার বাড়ছে প্রায় ৩০ শতাংশ। এতে সবচেয়ে বেশি বাড়ছে রাজস্ব ব্যয়ে। এটা ইতিমধ্যেই বাস্তবায়িত হয়ে গেছে। কারণ সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা অনেকে বেড়েছে। এটা প্রায় দ্বিগুণ। তবে উন্নয়ন বাজেটে বাস্তবায়নে বেশ সমস্যা রয়েছে। সেখানে ২২ শতাংশ ধরা হয়েছে। এটাই একটা বড় চ্যালেঞ্জ। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, গত কয়েকটি বাজেট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বছর শেষে বাজেট বাস্তবায়নের ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে। বাস্তবায়নের গতি কিভাবে বাড়ানো যায় এটি সরকারের একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি আরো বলেন, অবকাঠামো খাতে সরকারের নেওয়া প্রকল্পগুলোতেই সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয়। তিন বছর আগেই ঢাকা-চট্টগ্রাম এবং ঢাকা-ময়মনসিংহ চার লেন সড়ক প্রকল্প বাস্তবায়ন করার কথা থাকলেও এটা এখনো সম্ভব হয়নি। তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, বাজেট হওয়া উচিত উত্পাদনবান্ধব, বিনিয়োগবান্ধব এবং সর্বোপরি জনবান্ধব। কারণ জনগণই হলো দেশের মূল চালিকাশক্তি। তৈরি পোশাক খাতের বাস্তবতা তুলে ধরে বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, রানা প্লাজা ধসের পর এই খাত ঘুরে দাঁড়ালেও এ জন্য উদ্যোক্তাদের বেশ রক্তক্ষরণ হয়েছে। গত ১০ মাসে পোশাক খাতের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশ হয়েছে। এতে পোশাক রপ্তানির সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু মূল্য বাড়েনি। এ ছাড়া ডলারের বিপরীতে টাকা শক্তিশালী হওয়ায় উদ্যোক্তারা আর্থিকভাবে ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সেন্টার ফর পলিসি ডেভেলপমেন্টের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, তিন লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকার বাজেট বাস্তবায়নে বেসরকারি বিনিয়োগ অগ্রাধিকার দিতে হবে। এ খরা কাটতে পারে সরকারের নেওয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো কার্যকর করা গেলে। তবে সে ক্ষেত্রে আয়ের ক্ষেত্রে দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ব্যয়ে সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এ ছাড়া সরকারি বিনিয়োগে আর্থিক খাতে সুশাসনে নজরদারি বাড়াতে হবে বলে তিনি অভিমত দেন।