kalerkantho


দুর্নীতি কমে মুনাফায় মিল্ক ভিটা

বাজার সম্প্রসারণে সাত বিভাগে প্লান্ট হবে : চেয়ারম্যান

৩ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



দুর্নীতি কমে মুনাফায় মিল্ক ভিটা

মিল্ক ভিটার চেয়ারম্যান শেখ নাদির হোসেন লিপু

অনিয়ম-দুর্নীতির চক্র থেকে বের হতে পারছিল না বাংলাদেশ দুগ্ধ উত্পাদনকারী সমবায় ইউনিয়ন লিমিটেড (মিল্ক ভিটা)। একের পর এক লোকসানে ক্রমেই ডুবতে বসেছিল সরকারি দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত পণ্য উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু অনিয়ম-দুর্নীতিতে লাগাম টেনে নানা সংস্কারমূলক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে মিল্ক ভিটাকে মুনাফায় ফেরাতে সক্ষম হয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান শেখ নাদির হোসেন লিপু। সম্প্রতি কালের কণ্ঠ’র প্রতিবেদক ফারজানা লাবনীকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে তিনি পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহ ও বিপণন ব্যবস্থার উন্নয়ন, সাত বিভাগে প্লান্ট স্থাপন, অপচয় কমানোসহ নানা উদ্যোগের মাধ্যমে মিল্ক ভিটাকে সেরা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করার নানা পরিকল্পনার কথা জানান

২০১৫ সালের ৩১ মার্চ মিল্ক ভিটার চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম দিনই শেখ নাদির হোসেন লিপু জানতে পারেন, বেতন-ভাতা-দুধ সরবরাহকারী সমবায়ী কৃষকের পাওনা পরিশোধসহ প্রতিষ্ঠানের খরচ মেটানোর অর্থও নেই মিল্ক ভিটার কোষাগারে। আপতকালীন সময়ের জন্য রাখা এফডিআরের ৬৯ কোটি টাকা, যা তুলে পাওনা পরিশোধ করা ছাড়া উপায় নেই। এ প্রস্তাবে রাজি হলেন না শেখ নাদির হোসেন লিপু। বৈঠকে বসলেন পরিচালনা পর্ষদের ১২ সদস্যকে নিয়ে। সমবায়ীদের নিয়ে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা অবশেষে পথ দেখাল তাঁকে। অল্প সময়ে প্রতিষ্ঠানটির গুদামে জমে থাকা পণ্য বিক্রি করতে সক্ষম হলেন তিনি। এখান থেকে পাওয়া মুনাফা দিয়ে পাওনা পরিশোধ করলেন। এভাবে চ্যালেঞ্জ নিয়ে শুরু হয় মিল্ক ভিটার সঙ্গে পথ চলা।

মিল্ক ভিটার চেয়ারম্যান বলেন, বঙ্গবন্ধু অনেক স্বপ্ন নিয়ে মিল্ক ভিটা গড়ে তোলেন। অথচ দুর্নীতিবাজরা নিজেদের আখের গোছাতে প্রতিষ্ঠানটি লুটেপুটে খেয়েছে। মিল্ক ভিটার অর্থ নিজের পকেটে নিতে মিথ্যা হিসাব দেওয়া হতো। দুধ সরবরাহে পরিবহন ব্যয় প্রতি কিলোমিটারে ২৭ পয়সা নির্ধারিত থাকলেও আগে এক টাকা ৩৫ পয়সা হিসাবে কাগজে-কলমে হিসাব দেখানো হতো। আবার দূরত্ব বেশি দেখানোও হয়। এভাবে ১৪ কোটি টাকা বাড়তি ব্যয় দেখানো হতো। বর্তমানে তা সমন্বয় করা হচ্ছে। নিয়ম মতো ২৭ পয়সা হারে পরিশোধ করা হচ্ছে। বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা আলাদাভাবে প্রত্যেক বিভাগের দায়িত্ব নিয়ে কাজ করছেন। যৌথ টিমওয়ার্কের মাধ্যমে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে দাবি করেন শেখ নাদির হোসেন লিপু।

মিল্ক ভিটাকে মুনাফায় আনার নানা উদ্যোগের কথা জানিয়ে শেখ নাদির হোসেন বলেন, মিল্ক ভিটার দায়িত্ব গ্রহণের পরও মিল্ক ভিটা যারা লুটেপুটে খাচ্ছিল তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছি। তাদের ষড়যন্ত্র থামেনি, সব প্রতিকূলতাকে জয় করে এগিয়ে চলেছি। নতুন পরিচালনা পর্ষদকে সঙ্গে নিয়ে দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র তিন মাসেই লোকসান কাটিয়ে মুনাফা অর্জনকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে মিল্ক ভিটা। এর পরিমাণ পাঁচ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। দুধ সংগ্রহ, সংরক্ষণ থেকে বিপণন সব জায়গায় আনা হয়েছে নতুন কৌশল। পণ্যের গুণগতমান বৃদ্ধির পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

লোকসানি প্রতিষ্ঠান মিল্ক ভিটা এখন মুনাফার হিসাব কষছে উল্লেখ করে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান শেখ নাদির হোসেন লিপু বলেন, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে রাজনৈতিক অস্থিরতায় স্বাভাবিক পণ্য পরিবহন হয়নি। আর এ সুযোগে বিপণন-সরবরাহ প্রক্রিয়ার অনিয়ম-দুর্নীতিও চরমে ওঠে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে প্রথমভাগে প্রতিষ্ঠানটি চরম লোকসানে পড়ে। অসমবায়ীর হাতে ব্যবস্থাপনা, অনিয়ম-দুর্নীতি, রাজনৈতিক অস্থিরতাসহ বিভিন্ন কারণে প্রতিষ্ঠানটি লোকসানের ভারে নিমজ্জিত হয়। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছি। মাত্র তিন মাসেই লোকসান কাটিয়ে গত অর্থবছরে তিন গুণ মুনাফা অর্জন করেছে মিল্ক ভিটা। মিল্ক ভিটার চেয়ারম্যান হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া দায়িত্ব সততার সঙ্গে পালন করব। মিল্ক ভিটায় এখন নতুন তৈরি ১০টি দুগ্ধ শীতলীকরণ কারখানায় দুধ সংগ্রহ শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে বন্ধ থাকা এক লাখ লিটারের কনডেন্সড ও এক লাখ ৪০ হাজার লিটারের তরল ইউএইচটি দুধের কারখানা চালুর কাজ শেষের পথে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সারা দেশে আরো ব্যাপকভাবে তরল দুধ বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

পণ্য বৈচিত্র্যকরণ, গুণগতমান বৃদ্ধি, সরবরাহ ও বাজারজাতকরণে নতুন ও যুগোপযোগী কৌশল গ্রহণে সবচেয়ে জোর দেওয়া হয়েছে জানিয়ে লিপু বলেন, আমি দায়িত্ব গ্রহণের পরই আমাকে জানানো হয়, ভোক্তা পর্যায়ে মিল্ক ভিটার চাহিদা নেই। মিল্ক ভিটার পণ্য কেনাবেচা কমে আসছে। বিক্রির চেষ্টা না করে পণ্য মজুদ করে রাখা হতো। এতে প্রতিষ্ঠানটির লোকসানের বোঝা প্রতিনিয়ত বেড়ে যাচ্ছিল। আমার দায়িত্ব গ্রহণের সময়ে ৬০০ টনের বেশি গুঁড়া দুধ ও ৭২ টন ঘি মজুদ ছিল। এ পণ্যের বাজারমূল্য ছিল ৪০ থেকে ৪২ কোটি টাকা। আমি পণ্যের সুষ্ঠু বাজারজাতকরণে মিল্ক ভিটার বিপণন বিভাগকে পুনর্গঠন করি। মিল্ক ভিটার প্রত্যেকটি বিভাগের অনিয়ম ও দুর্নীতি রোধে একগুচ্ছ নতুন কৌশল গ্রহণ করি। পদক্ষেপ গ্রহণ করেই থেমে থাকিনি, বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ জোর দিয়েছি। কঠোর হাতে নিয়ম রক্ষা করেছি। লোকসান কাটিয়ে প্রতিষ্ঠানটি মুনাফায় আসতে থাকে।

মিল্ক ভিটাকে দেশের আধুনিকতম দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত পণ্য উত্পাদনকারী হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্নের কথা জানিয়ে শেখ নাদির হোসেন লিপু বলেন, যেসব পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে তা বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশ আমদানি নির্ভরশীলতা কাটিয়ে দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত পণ্য উত্পাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে।

তিনি বলেন, মিল্ক ভিটার কিছু অসৎ কর্মচারী চক্রান্ত করে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে মিল্ক ভিটার পণ্য দেশের ৮০ শতাংশ এলাকায় পৌঁছে দেয় না। এসব এলাকায় পণ্য পৌঁছে দিতে ডিলার নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষভাবে রাজধানীর ৫০টি থানা অনুযায়ী এলাকা ভাগ করে মিল্ক ভিটার পণ্যের বাজার বাড়াতে নতুন ডিলার নিয়োগ নিয়েছি।

নাদির হোসেন বলেন, মিল্ক ভিটার বাজার বাড়াতে সারা দেশের মিল্ক ভিটা কম্পানির সাতটি বিভাগে সাতটি পূর্ণাঙ্গ প্লান্ট স্থাপন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০০৭ সালের পর থেকে বন্ধ থাকা ইউএইচটি দুগ্ধ কারখানা ও কনডেন্সড মিল্ক কারখানা দুটি চালু করা হচ্ছে। এগুলো চালু হলে এক লাখ ৪০ হাজার লিটার ইউএইচটি তরল দুধ ও এক লাখ লিটার কনডেন্সড মিল্ক বাজারজাত করা সম্ভব হবে। নতুন তৈরি ১০টি শীতলীকরণ কারখানায় বর্তমানে দুধ সংগ্রহ চালু করা হচ্ছে।

সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ীতে প্রায় ৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে গুঁড়া দুধ তৈরির কারখানা স্থাপনের কাজ চলছে উল্লেখ করে লিপু বলেন, এতে বছরে ৯০০ টন গুঁড়া দুধ উত্পাদন হবে। এ ছাড়া গবাদি পশুর ওষুধ উত্পাদনে টুঙ্গিপাড়ায় ৩২ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে কারখানা স্থাপনের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। দৈনিক দুধ সরবরাহ এক লাখ ৬৩ হাজার থেকে বেড়ে এখন গড়ে দুই লাখ লিটারে দাঁড়িয়েছে।


মন্তব্য