kalerkantho


ডিজিটাল অর্থনীতির গলার কাঁটা সাইবার সন্ত্রাস

মুহাম্মদ শরীফ হোসেন   

২০ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ডিজিটাল অর্থনীতির গলার কাঁটা সাইবার সন্ত্রাস

প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন আর ডিজিটালাইজেশন প্রচেষ্টা বিশ্ব অর্থনীতিকে যেমন শক্তিশালী করছে, তেমনি বের করে আনছে নিত্যনতুন দুর্বলতাও। বিশ্ব অর্থনীতিতে গলার কাঁটা হয়ে উঠছে এখন সাইবার সন্ত্রাস। আর এতে শুধু উন্নয়নশীল দেশগুলো নয়, উন্নত বিশ্বের অত্যাধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও যেন অসহায় পড়েছে।

সম্প্রতি ওয়াশিংটনভিত্তিক আর্থিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান হ্যামিলটন প্লেস স্ট্র্যাটেজিসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সাইবার সন্ত্রাসের ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রতিবছর ক্ষতি হচ্ছে ৪৫০ বিলিয়ন ডলার। ‘সাইবারক্রাইম কস্টস মোর দেন ইউ থিংক’ শীর্ষক এ প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈশ্বিক ডিজিটালাইজেশন এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর একে অন্যের সঙ্গে আন্তসংযুক্ত হয়ে পড়ায় সাইবার সন্ত্রাস এখন বড় ব্যবসা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, গত পাঁচ বছরে সাইবার সন্ত্রাস বেড়েছে ২০০ গুণ, যা অব্যাহতভাবে বাড়ছে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থনৈতিক যে মূল্য গুনতে হয় তার চেয়ে বেশি ক্ষতি হয় ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়া বা গ্রাহক আস্থা হারানোর মধ্য দিয়ে। এ নিয়ে পিডাব্লিউসির এক জরিপে বলা হয়, সাইবার সন্ত্রাসের পরিমাণ ২০১৪ সালের ২৪ শতাংশ থেকে গত বছর বেড়ে হয়েছে ৩২ শতাংশ। জরিপে দেখা যায়, ৩৪ শতাংশ প্রতিষ্ঠানকেই সাইবার সন্ত্রাসের অভিজ্ঞতা নিতে হয়েছে গত দুই বছরে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) এক গবেষণায় বলা হয়, সাইবার সন্ত্রাস দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। যা বাণিজ্য, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা এবং উদ্ভাবনকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এতে প্রতিবছর শুধু যুক্তরাষ্ট্রকেই অর্থনৈতিক গচ্ছা দিতে হচ্ছে ১০০ বিলিয়ন ডলার।

সিএসআইএসের সিনিয়র ফেলো জেমস এ লুইস বলেন, ‘এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা। অথচ এ ঝুঁকি মোকাবিলায় আমরা এখনো যথেষ্ট পরিমাণ পদক্ষেপ নিইনি। ’ তাঁর মতে, সাইবার সন্ত্রাস হচ্ছে উদ্ভাবনের ওপর এক ধরনের কর। এর ফলে উদ্ভাবনকারীরা শ্রম এবং অর্থ বিনিয়োগ করে তাদের প্রাপ্তি সুখকর হয় না। এতে স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বে উদ্ভাবন কমে যায়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সাইবার সন্ত্রাসের কারণে দেশগুলোর অর্থনেতিক ক্ষতি যতক্ষণ তাদের জাতীয় আয়ের ২ শতাংশের নিচে থাকবে ততক্ষণ তারা এটি সহ্য করবে। এরপর লোকসান জাতীয় আয়ের ২ শতাংশের ওপরে হলে তখন এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তারা তত্পর হয়ে উঠবে।

গত বছর কম্পিউটার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান কাস্পারস্কির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বের ১০০ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্তত ১০০ কোটি ডলার চুরি করেছে একটি সাইবার গ্রুপ। যারা ২০১৩ সাল থেকে এ হামলা শুরু করেছে, এখনো চলছে। প্রতিষ্ঠানটির মতে, এ দলের সদস্যদের মধ্যে রয়েছে রাশিয়া, ইউক্রেন এবং চীনসহ কয়েকটি দেশের নাগরিকরা। আর এ হামলাগুলো হয়েছে রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, চীন, ইউক্রেন ও কানাডাসহ বিশ্বের ৩০টি দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর।

কাস্পারস্কির মতে, এ দস্যুদল সাইবার ডাকাতির নতুন ফর্মুলা ব্যবহার করছে। তারা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ চুরি করে তাদের খুঁজে পাওয়ার পথও বন্ধ করে দিচ্ছে। এরা কম্পিউটার ভাইরাস ব্যবহার করে কম্পানির নেটওয়ার্ক নষ্ট করে দেয় এবং কম্পানির সব ধরনের রেকর্ড ও লেনদেন ভালো করে দেখে নেয়। অনেক সময় গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ তাদের নিজেদের অ্যাকউন্টে নিয়ে নেয়। কাস্পারস্কির মতে, ব্যাংক ডাকাতির এসব ঘটনা প্রতি দুই থেকে চার মাসের মধ্যে হয়।

গত বছর ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডাব্লিউইএফ) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সাইবার নিরাপত্তা বাড়াতে না পারলে বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষতি হবে তিন ট্রিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে ধ্বংসাত্মক হামলা মোকাবিলায় যেসব নিয়ম-কানুন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হচ্ছে তাতে ব্যাহত হচ্ছে উদ্ভাবন। এ অবস্থায় অব্যাহত সাইবার হামলা মোকাবিলায় করপোরেট নির্বাহীদের তথ্যসম্ভার নিরাপদ করার পাশাপাশি অনলাইন লেনদেন নিরাপদ করার দিকে আরো মনোযোগী হতে হবে বলে পরামর্শ দেয় প্রতিষ্ঠানটি।

‘রিস্ক অ্যান্ড রেসপনসিবিলিটি ইন এ হাইপারকানেক্টেড ওয়ার্ল্ড’ শীর্ষক এ প্রতিবেদনে বলা হয়, হামলা বন্ধে যদি প্রতিষ্ঠানগুলো সাইবার সক্ষমতা না বাড়ায় তবে আগামী দিনগুলোতে এ ধরনের হামলা আরো বাড়বে। অথচ প্রযুক্তি কম্পানিগুলোর উত্কর্ষতা ও আরো বিশ্লেষণী অবস্থান বিশ্ব অর্থনীতিতে ৯.৬ ট্রিলিয়ন থেকে শুরু করে ২১.৬ ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত যোগ করতে পারে। কিন্তু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্ভাবনী শক্তির চেয়ে যদি হামলাকারীদের সক্ষমতা ছাড়িয়ে যায় তবে আরো অনেক বেশি বিধ্বংসী হামলা হবে এবং ২০২০ সাল নাগাদ বিশ্ব অর্থনীতিতে ক্ষতি হতে পারে তিন ট্রিলিয়ন ডলার। রয়টার্স, ওয়াশিংটন পোস্ট, সিএনবিসি, ফেডারেল নিউজ রেডিও।


মন্তব্য