kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


গ্রাহকদের ডিজিটাল লাইফে যুক্ত করছে গ্রামীণফোন

পুরো দেশে ইন্টারনেট ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে দেশের ডিজিটাল রূপান্তরের পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে টেলিকম খাতের সফল কম্পানি গ্রামীণফোন। আর প্রতিষ্ঠানটির চিফ মার্কেটিং অফিসার (সিএমও) হিসেবে এ অগ্রযাত্রায় নেতৃস্থানীয় ভূমিকা রাখছেন ইয়াসির আজমান। এ গুরুত্বপূর্ণ পদে বাংলাদেশি হিসেবে তিনিই প্রথম। কালের কণ্ঠ’র বিশেষ প্রতিনিধি কাজী হাফিজের সঙ্গে গ্রামীণফোনের ডিজিটাল সেবা নিয়ে নানা পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন অভিজ্ঞ এ কর্মকর্তা

১৩ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



গ্রাহকদের ডিজিটাল লাইফে যুক্ত করছে গ্রামীণফোন

অর্থনৈতিক উন্নয়ন আর প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ক্রমেই ডিজিটাল হচ্ছে। আর এতে টেলিকম কম্পানি হিসেবে পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করছে গ্রামীণফোন।

এমন দাবি করে গ্রামীণফোনের চিফ মার্কেটিং অফিসার (সিএমও) ইয়াসির আজমান বলেন, ‘গ্রাহকদের চাহিদা এবং ডিজিটাল বাংলাদেশের চাহিদা মেটাতে গ্রামীণফোন পুরোপুরি প্রস্তুত হচ্ছে। আমরা আগামী জুনের মধ্যেই শতভাগ সাইট থ্রিজি কভারেজে আনতে যাচ্ছি। ’

ইয়াসির আজমান আরো বলেন, ‘গ্রাহকদের চাহিদা বিভিন্ন রকম। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের চাহিদার ভিন্নতা রয়েছে। সবার চাহিদা পূরণে কাজ করে যাচ্ছি আমরা। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি সব ক্ষেত্রেই নতুন নতুন সেবা ও পণ্য উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে গ্রামীণফোন ডিজিটাল বাংলাদেশ হওয়ার পথে অগ্রণী ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। গ্রাহকদের চাহিদা অনুসারে আমরা তাদের ফেভারিট পার্টনার হতে চাই। বাংলাদেশের ৫০ শতাংশ জনসংখ্যা হচ্ছে যুব প্রজন্ম। এ জনসংখ্যার মধ্যে ব্যাপক কর্মউদ্দীপনা রয়েছে। আমরা তাদের শক্তি কাজে লাগাতে চাই। ’ 

টেলিকম খাতের এ কর্মকর্তা বলেন, ‘ডিজিটাল এখন আর ভবিষ্যতের কোনো শব্দ নয়। ডিজিটাল হচ্ছে বাস্তবতা, যা এখন প্রতিনিয়ত ঘটছে। অনেকে প্রশ্ন করতে পারে, কিভাবে এটি ঘটছে? কানেক্টিভিটি, ইন্টারনেট এবং বিশেষ করে মোবাইল ইন্টারনেট। এই তিনটি বিষয়ের সঙ্গে সংযুক্ত থাকলে আপনারা কনটেন্ট খোঁজায় ব্যস্ত হয়ে পড়বেন। কাজের ভিন্নতার ওপর নির্ভর করে কনটেন্টের প্রয়োজনীয়তা গুরুত্ব পায়। যেমন—শিক্ষার্থীরা শিক্ষনীয়, গবেষকরা জ্ঞানের পরিধি বাড়ানো এবং তরুণরা মিউজিক বিষয়ক কনটেন্ট খুঁজবে। সব জায়গায় আমরা ডিজিটাল সেবা দেখতে পাই। আর বাংলাদেশের মতো দেশে ব্যাপারটি অসাধারণ। কারণ আমরা উন্নত ডিজিটাল সেবার সঙ্গে যুক্ত। আর তাই আমরা এ সেবার উপযুক্ত ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারি, যা আমাদের জীবনযাত্রার মানকে আরো উন্নত করার পাশাপাশি নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হবে। ’

ইয়াসির আজমান বলেন, “মানসম্মত শিক্ষা, তথ্য জানার অধিকার ও সুযোগ এবং উপযুক্ত অবকাঠামোর অপর্যাপ্ততার কারণে উন্নত দেশের প্রযুক্তিগত ব্যবহারের সঙ্গে আমরা তাল মিলিয়ে চলতে পারছি না। এ ব্যাপারগুলো নিশ্চিত করতে পারলে দেশের উন্নতি প্রকৃতপক্ষেই পরিলক্ষিত হবে। আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশ সরকার আগামী ২০২০ সালের মধ্যে দেশকে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এ পরিণত করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। ” 

ইয়াসির আজমান বলেন, ‘স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কৃষি খাতে উন্নয়নের লক্ষ্যে আমরা বিভিন্ন কৌশলগত অগ্রাধিকার ঠিক করেছি। পাশাপাশি অবশ্যই বিনোদন, যোগাযোগ, জীবনযাত্রা এবং নাগরিকসেবার মতো বিষয়গুলোকেও আমাদের নজরে রেখেছি। তাই ডিজিটাল এখন আর ভবিষ্যৎ কোনো চিন্তা নয়, বরং এটি একটি বাস্তবতা যা সবাইকে ইতিবাচক মনোভাব নিয়েই গ্রহণ করতে হবে। ’ 

ইয়াসির আজমান বলেন, দেশে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে ব্যবসায়িক সাফল্য কয়েক গুণ বৃদ্ধির পাশাপাশি নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। দেশের উন্নয়নের ধারাও বজায় থাকছে। ডিজিটাল বা আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে ব্যাপক সুযোগ তৈরি হচ্ছে এবং এর মাধ্যমে গতানুগতিক পদ্ধতির ঊর্ধ্বে গিয়ে আমাদের গ্রাহকরা একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত হতে পারছে অনেক সহজেই। সময় কিংবা স্থানভেদে ডিজিটাল সেবা কোনো ধরনের সীমাবদ্ধতার মধ্যে আটকে নেই। তিনি বলেন, এ নতুন সুযোগ গ্রহণ করতে প্রয়োজন দীর্ঘদেয়াদি পরিকল্পনা এবং বিনিয়োগ। ’ ভবিষ্যতে গ্রামীণফোন টেলিকমিউনিকেশন প্রোভাইডার থেকে ডিজিটাল লাইফস্টাইল প্রোভাইডার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে ইয়াসির আজমান বলেন, “যদিও ভবিষ্যতে ডাটা ও ভয়েস সেবা প্রদান আমাদের ব্যবসার প্রধান মূল অংশ, তবে আমরা আমাদের গ্রাহকদের ‘ডিজিটাল লাইফ’-এর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি। এটি তখনই সম্ভব হবে যখন সারা দেশের গ্রাহকদের আমরা স্বল্প দামে উন্নত ইন্টারনেট সেবা দিতে পারি। আমাদের জন্য এটাই ডিজিটাল বাংলাদেশের মর্মকথা এবং এটাই এখন মৌলিক প্রতিবন্ধকতা। যেদিন আমরা সবার জন্য ইন্টারনেট নিশ্চিত করতে পারব সেদিনই সংশ্লিষ্ট কনটেন্ট, সেবা ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম দেওয়ার মাধ্যমে আমরা আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারব। ”

ইয়াসির আজমান বলেন, “আমরা শুধু টেলিকমিউনিকেশন প্রতিষ্ঠান হিসেবে না থেকে ভয়েস ও ডাটা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ডিজিটাল সেবা প্রদান এবং ডিজিটাল অংশীদারদের জন্য ইকো-সিস্টেমভিত্তিক সেবার পরিধি আরো বাড়াতে চাই। তাই স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং কৃষিবিষয়ক মোবাইল কনটেন্ট নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করছে গ্রামীণফোন। সম্প্রতি আমরা ‘কমোয়ো’ নামের একটি অ্যাপ্লিকেশন সবার জন্য উন্মুক্ত করেছি, যা দিয়ে বন্ধুদের স্টিকার পাঠানো যায়, এ ছাড়া লাইফস্টাইলভিত্তিক অ্যাপ ‘ওয়াওবক্স’, ফোনে সংরক্ষিত ফোন নম্বর ক্লাউডে আপলোড করে রাখার জন্য ‘মাই কন্টাক্টস’, মিউজিকপ্রেমীদের জন্য ‘জিপি মিউজিক’সহ অনলাইনে উপযুক্ত সমাধানের জন্য ‘ফ্লেক্সিপ্ল্যান’ নামের অভিনব সেবা চালু করেছি। এ ছাড়া যারা নতুন ইন্টারনেট ব্যবহার করছে তাদের জন্য আমাদের আছে ভিন্নমাত্রার ‘ইজিনেট’ প্ল্যাটফর্ম। যেখানে ব্যবহারকারীরা ওয়েবে ঠিকানা বা ইআরএল কিভাবে লিখতে হয় তা শেখার পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষনীয় টুল ব্যবহার করতে পারবে। ”

প্রগতিশীল ডিজিটাল সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গ্রামীণফোনের অবস্থান তুলে ধরে ইয়াসির আজমান বলেন, ‘সামাজিক উন্নয়নে আমরা প্রতিনিয়ত নতুন কিছু উদ্ভাবন করছি এবং বাংলাদেশে প্রযুক্তিগত ব্যবহারের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছি। অতীতে টেলিকম খাতে অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে আমরা ডিজিটাল পরিবর্তন এনেছি। পুরনো অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নতুন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আমরা সফল হওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী। ’

ইয়াসির আজমান বলেন, “ডিজিটাল বিপ্লবে আমরা বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছি। বাংলাদেশ সরকার ও বেসিসের সঙ্গে মিলে উদ্বোধন করেছি ‘বাংলাদেশ ইন্টারনেট উইক’। ডিজিটাল স্টার্টআপসদের যুগান্তকারী সুযোগ তৈরিতে সম্প্রতি আমরা আয়োজন করেছি ‘জিপি অ্যাকসেলারেটর’। বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে এসডি এশিয়ার সঙ্গে মিলে আমরা আয়োজন করতে যাচ্ছি ‘ইনোভেশন এক্সট্রিম’। ” তিনি বলেন, ‘ডিজিটাল রূপান্তরের পথ বেশ লম্বা, আর আমরা ইতিমধ্যে এই পথে চলতে শুরু করেছি। ’

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম প্রসঙ্গে ইয়াসির আজমান বলেন, “এটি একটি শক্তিশালী টুল। প্রথমবার ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে ফেইসবুক অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমরা আমাদের বিভিন্ন জরিপে অবাক করা একটি মন্তব্য পেয়েছি। তা হলো, ‘আমি ইন্টারনেট ব্যবহার করি না, তবে ফেইসবুক ব্যবহার করি। ’ এটাই হলো ফেইসবুকের সফলতা। বাংলাদেশে বেশির ভাগ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর ক্ষেত্রেই এ মন্তব্যটি প্রযোজ্য। গ্রাহকরা কিভাবে যোগাযোগ করে তা সামাজিক যোগাযোগের প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অনেকটাই বোঝা যায়। সামাজিক যোগাযোগের একটি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা মাথায় নিয়ে আমরা গ্রাহকভিত্তিক ডিজিটাল রূপান্তরিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত হতে চাই। গ্রাহকরা যেসব ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে পছন্দ করে সেগুলোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে আমরা আমাদের পরিকল্পনা সাজিয়ে থাকি। যার মাধ্যমে গ্রাহকদের অনেক কাছাকাছি পৌঁছানো যায়। ”  

ইয়াসির আজমান বলেন, ‘ডিজিটাল রূপান্তরে একটি প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে প্রতিষ্ঠান যখন রূপান্তর হতে থাকে তখন অনেক জটিল সিদ্ধান্ত নিতে হয়। প্রথম বিষয় হচ্ছে, বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া এবং সে অনুযায়ী কাজ করা। ভবিষ্যতের সম্ভাব্য হুমকি সম্পর্কে  শুরুতেই পর্যবেক্ষণ করতে হবে, যা বর্তমানের অনেক স্টার্টআপসরা না করে সমস্যার সম্মুখীন হয়। তাদের খুব সতর্কতার সঙ্গে অবস্থা বুঝে সে অনুযায়ী নিজেদের কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করতে হবে। প্রতিদিনের সম্মেলন কক্ষে আলোচনা অনেক বেশি অর্থবহ। ডিজিটাল দক্ষতা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি এবং উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে সিনিয়রদের চ্যাম্পিয়নের মতো অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। ’

ইয়াসির আজমান বলেন, ‘ঝুঁকি নিতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উচিত তাদের সদস্যদের সব সময় উত্সাহ দেওয়া। এটা স্বাভাবিক নয় যে সব সময় যে পদক্ষেপগুলো নেওয়া হবে তা সফল হবে। ’


মন্তব্য