kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি এনেছে বিকাশ

৮০ শতাংশ রিকশাচালক টাকা পাঠান এ মাধ্যমে

বাণিজ্য ডেস্ক   

৬ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি এনেছে বিকাশ

বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক দরিদ্র মানুষকে ব্যাংকিং ধারায় এনেছে আর্থিক মোবাইল পেমেন্ট ব্যবস্থা ‘বিকাশ’। সেই সঙ্গে গ্রামীণ অর্থনীতিতে জোয়ার এনেছে, তৈরি করেছে বিপুলসংখ্যক কর্মসংস্থান।

সম্প্রতি আর্থিক খাতের ম্যাগাজিন দ্য ব্যাংকার ‘বাংলাদেশ বিকাশ রেভল্যুশন’ নামে এক প্রতিবেদনে এমন দাবি করে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মাত্র চার বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশের আর্থিক খাতে নাটকীয় পরিবর্তন এনেছে মোবাইল পেমেন্ট ব্যবস্থা ‘বিকাশ’। দেশের শহর থেকে গ্রামে টাকা পাঠানো কিংবা দরিদ্র মানুষকে ব্যাংকিং সুবিধা দেওয়া—সব কিছুই সম্ভব এখন বিকাশের মাধ্যমে। এমনকি করপোরেট কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সাধারণ একজন কর্মী সবাই বিকাশের আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে পরিচিত। যা দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার পাশাপাশি হয়ে উঠেছে কর্মসংস্থানের একটি বড় উৎসও।

বর্তমানে বাংলাদেশের দুই বড় শহর ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে যেকোনো প্রত্যন্ত অঞ্চলে মুহূর্তে টাকা পাঠানো যায় বিকাশের মাধ্যমে। ফলে ‘বিকাশ’ শব্দটিই এখন টাকা পাঠানোর মাধ্যম হিসেবে বাংলা অভিধানে প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশের মাত্র ১৫ শতাংশ মানুষের ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট রয়েছে। দেশের বিশালসংখ্যক জনগণ যখন ব্যাংকিং নেটওয়ার্কের বাইরে, তখন বিকাশ সেসব মানুষকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকরণে নিয়ে এসেছে। বলা যায় বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বিকাশ আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে বিপ্লব তৈরি করেছে।

স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী আবরার আনওয়ার বলেন, ‘আমাদের আধুনিক যে ব্যাংকিং ব্যবস্থা রয়েছে তাতে অন্তর্ভুক্ত হতে হলে একজন মানুষের কিছুটা হলেও শিক্ষা থাকা জরুরি, যারা ব্যাংকিং লেনদেনের বিষয়গুলো বুঝবে। কিন্তু দেশের বিশালসংখ্যক জনগণের কাছে এ বিষয়গুলো এখনো দুর্বোধ্য। ’

কিন্তু এ দেশের সম্ভাবনার দিক হচ্ছে এখানে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশের ওপরে। ২০১৫ সালেও জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬.৫ শতাংশ। দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক অবস্থাও স্থিতিশীল। বেশির ভাগ জনসংখ্যা যুবক। যাদের অর্ধেকেরই বয়স ২৪ বছরের কম। আর দেশের এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক আর্থিক খাতে যুগোপযোগী সংস্কার করেছে। যার ফলে আনুষ্ঠানিক আর্থিক খাত শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি অনানুষ্ঠানিক আর্থিক খাতও বিকশিত হয়েছে। আবরার আনওয়ার আরো বলেন, ‘বাংলাদেশের দারুণ সম্ভাবনা রয়েছে। এমনকি আগামী পাঁচ থেকে সাত বছরে এ দেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে পারে। ’

বাংলাদেশে মোবাইল ফোনের মালিকানা রয়েছে অন্তত ১০ কোটি মানুষের। আর যাদের মোবাইল ফোন আছে তারাই টাকা পাঠাতে পারবে, সেই সুযোগটিই করে দিয়েছে বিকাশ। কেনিয়াসহ অন্য দেশগুলোতে মোবাইল ফোনে আর্থিক লেনদেনের সুযোগ এনে দিয়েছে মূলত টেলিকম কম্পানিগুলো। আর বাংলাদেশে এ সুযোগ দিয়েছে মূলধারার ব্যাংক। বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠান ব্র্যাকের সহায়ক প্রতিষ্ঠান বিকাশ।

মাত্র চার বছরের ব্যবধানে বিকাশ ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেড়ে হয় দুই কোটি ১২ লাখ। যা বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় ১২.৫ শতাংশ। বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং খাত যে পরিমাণ মানুষ ব্যবহার করে তার চেয়েও বেশি ব্যবহার করে বিকাশ। ২০১৫ সালেই বিকাশে ১০০ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। গড়ে প্রতি মাসে ১০ কোটি টাকা লেনদেন হয় বিকশে। একই সময়ে নতুন গ্রাহক হচ্ছে ১০ লাখ।

বিকাশের সাফল্যের বড় কারণ মনে করা হয় এটি দরিদ্র মানুষকে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে টাকা পাঠানোর একটি সহজ সুযোগ করে দিয়েছে। বিকাশের প্রধান নির্বাহী কামাল কাদির বলেন, ‘দেশের বিপুলসংখ্যক জনগণ ব্যাংকিং খাতের বাইরে। তাই তাদের জন্য আমাদের বিকল্প ব্যবস্থা করার প্রয়োজন ছিল। আমাদের যুক্তি হচ্ছে, প্রথমত কম আয়ের মানুষ ব্যাংকের একটি অত্যাধুনিক শাখায় প্রবেশ করতে স্বস্তিবোধ করে না, দ্বিতীয়ত এ শ্রেণির মানুষের ব্যাংকিং ব্যবস্থা সম্পর্কেও ধারণা নেই। ’

বাংলাদেশে বিকাশের এজেন্ট রয়েছে এক লাখ ১৭ হাজার। যাদের একেকজন এটিএম বুথের বিকল্প হিসেবে কাজ করে। কামাল কাদির আরো বলেন, ‘বাংলাদেশের মতো একটি অনুন্নয়নশীল দেশে প্রত্যন্ত অঞ্চলে এটিএম বুথ পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত কঠিন। অথচ বিকাশের এজেন্ট সেই সুযোগই দিচ্ছে। এখান থেকে মোবাইল ফোনে টাকা ঢুকানো যাবে, আবার বের করাও যাবে। একজন গ্রাহকের মোবাইল ফোনেই তার টাকা থাকছে, আর এজেন্টের মাধ্যমে তা বের করে নিতে পারছে। এ ক্ষেত্রে মোবাইল নেটওয়ার্কই হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ। ’ তিনি বলেন, বিকাশে নিবন্ধন করতে কোনো খরচ লাগে না। এ ছাড়া লেনদেনের খরচও মানুষের সাধ্যের মধ্যে।

আর্থিক লেনদেনের এ ব্যবস্থা সম্পর্কে অনেকের ধারণা ছিল এখানে কম্পানির লোকসান হবে। কিন্তু বিকাশ প্রাথমিক অবস্থায় লাভবান না হলেও ২০১৪ সালের জুন থেকে মুনাফা করতে থাকে। ২০১৪ সালে বিকাশের মুনাফা আসে ১৮৮.৫৪ মিলিয়ন টাকা।

বিকাশ আসার আগে অনেক ক্ষেত্রেই মানুষকে টাকা পাঠানোর জন্য পোস্ট অফিস ব্যবহার করতে হতো। এতে বাড়িতে টাকা যেতে যেতে অনেক সময় লেগে যেত। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে শহরের চেয়ে গ্রামে দরিদ্র তিনগুণ বেশি। বিকাশের মাধ্যমে শহরে কাজ করতে আসা দরিদ্র মানুষ গ্রামে তার স্বজনের কাছে মুহূর্তেই টাকা পাঠাতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান জানান, রাজধানী ঢাকার ৮০ শতাংশ রিকশাচালক নিয়মিত বিকাশ ব্যবহার করেন। অথচ এর আগে তাঁদের অনেকেই বাড়িতে টাকা পাঠাতে পারতেন না। এ জন্য তাঁর পরিবারকে এক মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো। অনেক ক্ষেত্রে অনিরাপদ মাধ্যমে তাদের টাকা পাঠাতে হতো। অথচ এখন প্রতি ঘণ্টায় টাকা পাঠানো যায়। তিনি বলেন, এর ফলে বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা হয়েছে। আর্থিক লেনদেনের সুযোগ তৈরির পাশাপাশি গ্রামে বিপুল কর্মসংস্থানও তৈরি করছে বিকাশ। ব্যবসায়িক সুবিধার পাশাপাশি বিকাশের এজেন্ট হচ্ছে তরুণরা। দ্য ব্যাংকার।


মন্তব্য