প্রতিবছর নভেম্বরের একটি শুক্রবারকে 'ব্ল্যাক ফ্রাইডে' হিসেবে উদ্যাপন করে আমেরিকানরা। দিনটি অলুক্ষণে মনে হলেও মার্কিন জনগণের কাছে 'ব্ল্যাক ফ্রাইডে' বহু আকাঙ্ক্ষিত একটি দিন। কারণ এই দিনে আমেরিকার বেশির ভাগ ব্যবসায়ী তাদের পণ্য অস্বাভাবিক মূল্য ছাড় দিয়ে বিক্রি করে দেয়। ফলে আমেরিকায় সারা বছরে যে পরিমাণ বেচাকেনা হয়, তার প্রায় অর্ধেক হয় শুধু এই একটি দিনেই। আমেরিকায় নভেম্বর মাসের চতুর্থ বৃহস্পতিবার পালিত হয় 'থ্যাংকস গিভিং ডে'। এদিন আমেরিকার জনগণ একে অন্যকে ধন্যবাদ জানায়। ঠিক এর পরদিন শুক্রবার পালিত হয় 'ব্ল্যাক ফ্রাইডে'। দিনটিকে কেন্দ্র করে পুরো আমেরিকায় এত পরিমাণ বেচাকেনা হয় যে, এই এক দিনে আমেরিকার অর্থনীতির সূচক এক লাফে অনেকখানি সামনে এগিয়ে যায়। আমেরিকার মতো বাংলাদেশেও ব্ল্যাক ফ্রাইডে উদ্যাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে দারাজ। প্রতিষ্ঠানটির উপপ্রধান নির্বাহী জার্মান নাগরিক ড. জোনাথান ডোয়ের বলেন, 'আমাদের মূল প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং মিয়ানমারের মার্কেটে ৫৬ মিলিয়ন ইউরো বিনিয়োগ করেছে, যা মূলত আমেরিকার ব্লাক ফ্রাইডের আলোকে নভেম্বর নাগাদ মেগা ইভেন্টের মাধ্যমে খরচ করা হবে। এর বেশির ভাগই বাংলাদেশের গ্রাহকদের জন্য থাকবে।' উর্দু শব্দ 'দারাজ'-এর ইংরেজি অর্থ হচ্ছে ড্রয়ার যা এশিয়া প্যাসিফিক ইন্টারনেট গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান। জার্মানভিত্তিক রকেট ইন্টারনেট ও ওরেডোর যৌথ উদ্যোগে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দারাজ ছাড়াও বাংলাদেশে ফুড পান্ডা, লামুদি, কারমুদিসহ ১০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠান রয়েছে রকেট ইন্টারনেটের। জোনাথান ডোয়ের জানান, দারাজ সর্বপ্রথম ২০১২ সালে পাকিস্তানে চালু হয়। বর্তমানে পাকিস্তানসহ বাংলাদেশ এবং মিয়ানমারে এটি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বাংলাদেশে এটি www.daraz.com.bd নামে চালু করা হয়েছে। এই মুহূর্তে দারাজে আড়াই শরও বেশি ব্র্যান্ডের প্রায় ১৫ হাজার পণ্য পাওয়া যাচ্ছে, যা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। ব্ল্যাক ফ্রাইডে উপলক্ষে 'সামথিং বিগেস্ট কামিং' স্লোগান ঠিক করেছে দারাজ। ন্যূনতম ৩০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দেবে প্রতিষ্ঠানটি, যা শুধু 'ব্ল্যাক ফ্রাইডে'র দিন ২৭ নভেম্বরের জন্য। ওই দিন স্মার্টফোন থেকে শুরু করে বিভিন্ন ইলেকট্রনিকস সামগ্রী ৮০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়ে শুধু দারাজের অনলাইনে কেনা যাবে। সরকারি হিসাবে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৩২ শতাংশ বা পাঁচ কোটি ২২ লাখ মানুষ বর্তমানে ইন্টারনেট ব্যবহার করে। ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন ব্যবহারকারী বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে দারাজ ক্রমেই জনপ্রিয় হচ্ছে উল্লেখ করে প্রতিষ্ঠানের উপপ্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, 'আমাদের ই-কমার্স পোর্টালে এখন ২০ লাখ দর্শনার্থী আসছে। প্রতি মাসেই আমাদের প্রবৃদ্ধি দ্বিগুণ হচ্ছে। বাংলাদেশে প্রতিনিয়তই ব্যবসা সম্প্রসারণ করছি। আমরা ক্রেতাদের সেরা কেনাকাটার অভিজ্ঞতা দিতে চাই। সেরা দামে সেরা সেবা দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য। বর্তমানে ২০০ কর্মী দারাজে কাজ করছেন এবং আমাদের সঙ্গে ২০০ ভেন্ডর বর্তমানে যুক্ত রয়েছে, যা বাড়ছে।' তিনি আরো বলেন, 'গ্রাহকসেবা নিশ্চিত করতে আমরা পৃথক বিভাগ চালু করেছি। আমরা যেহেতু মার্কেটপ্লেস, তাই বিক্রয়োত্তর সেবার জন্য আমাদের ভেন্ডররা দায়িত্বশীল। আমরা বাংলাদেশের মানুষকে ই-কমার্স নিয়ে সচেতন করব।' বিবিএস মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) হিসাব করতে খুচরা ও পাইকারি ব্যবসা এবং মেরামতসেবার আকার নিয়ে পরিসংখ্যান তৈরি করে। ওই পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে খুচরা-পাইকারি ব্যবসা ও মেরামতসেবার বাজারের আকার দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৯৩ হাজার ১২৯ কোটি টাকা। যা আগের বছরের চেয়ে ২০ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকা বেশি। এ ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১১.৯১ শতাংশ। কিন্তু বিশাল এ খুচরা বাজারে ই-কমার্সে লেনদেন হয় খুবই সামান্য। এ কারণে ই-কমার্সের বাংলাদেশকে খুবই প্রবৃদ্ধিশীল বাজার উল্লেখ করে জোনাথান ডোয়ের বলেন, 'বাংলাদেশের খুচরা বাজারের আকার ৫৫ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ই-কমার্স বাজার ০.১ শতাংশ। এই তথ্যেই বোঝা যায় বাংলাদেশে ই-কমার্সের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে এবং প্রতিবছর দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব। দুই-তিন বছরের মধ্যে এটা অনেক বড় বাজার হবে।' ই-কমার্সে কেনাকাটার পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে জোনাথান ডোয়ের বলেন, 'আমরা ক্রেতার সময় বাঁচাচ্ছি। সনাতনী বাজারের তুলনায় অনলাইনে বর্তমানে দাম কিছুটা কম, যা আগামীতে আরো কমবে। খুব সহজেই আমাদের ওয়েবসাইটে গিয়ে অর্ডার দিলেই আমরা দুই থেকে সর্বোচ্চ চার দিনের মধ্যেই পণ্য নিয়ে গ্রাহকের দোরগোড়ায় হাজির হচ্ছি। পণ্য পেয়ে নগদে মূল্য পরিশোধ করতে পারে ক্রেতা। ঢাকার বাইরেও আমরা পণ্য পৌঁছে দিচ্ছি।' অনলাইনে পণ্যের মান নিয়ে গ্রাহকদের নানা সংশয়, সন্দেহ রয়েছে। নিম্নমানের নকল পণ্যও বিক্রি হচ্ছে নানাভাবে। কিভাবে দারাজ পণ্যের মানের ব্যাপারে নিশ্চয়তা দিচ্ছে জানতে চাইলে জোনাথান ডোয়ের বলেন, 'আমরা কোনো নকল ও ব্যবহৃত পণ্য বিক্রি করি না। আমরা এটা নিশ্চিত করতে চাই, যারা দারাজকে পণ্য সরবরাহ করে তারা খুবই উচ্চমানের ভেন্ডর।' মোবাইল হ্যান্ডসেট, ট্যাবলেটসহ অন্যান্য বেতারযন্ত্র আমদানি ও বাজারজাতে বিশেষ সতর্কতা জারি করে সম্প্রতি টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি বলেছে, নকল মোবাইল হ্যান্ডসেট আমদানি ও বাজারজাতের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিটিআরসির পূর্বানুমতি ছাড়া হ্যান্ডসেট আমদানি করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। এ প্রসঙ্গে দারাজের কো-সিইও বলেন, 'আমাদের ভেন্ডররা বিটিআরসির নিয়ম-কানুন মেনে হ্যান্ডসেট আমদানি করে।'