সংস্কৃতিচর্চা শিশুর চিন্তাশক্তির-334895 | গোলটেবিল | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১২ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৪ জিলহজ ১৪৩৭


সংস্কৃতিচর্চা শিশুর চিন্তাশক্তির বিকাশ ঘটায়

ব্র্যাক-চ্যানেল আই-কালের কণ্ঠ গোলটেবিল বৈঠক

১২ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



সংস্কৃতিচর্চা শিশুর চিন্তাশক্তির বিকাশ ঘটায়

গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত আলোচকরা

শিক্ষণ কার্যক্রম কতগুলো পাঠ্যপুস্তকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার বিষয় নয়। শুধু বই, খাতা, কলম দিয়ে শিক্ষাকে চার দেয়ালের মধ্যে বন্দি রাখলে একটি শিশু পূর্ণাঙ্গভাবে বিকশিত হতে পারে না। শিশুদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি দরকার সহশিক্ষা কার্যক্রম। এ জন্য সরকারের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে। বিষয়টি নিয়ে বিশদভাবে আলোকপাত করতে ‘সংস্কৃতিচর্চা শিশুর চিন্তাশক্তির বিকাশ ঘটায়, প্রসঙ্গ : ব্র্যাকের শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে ব্র্যাক, চ্যানেল আই ও কালের কণ্ঠ। গত ১০ মার্চ কালের কণ্ঠ সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলনের সঞ্চালনায় চ্যানেল আই কার্যালয়ে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। কালের কণ্ঠ’র পাঠকদের জন্য বিস্তারিত তুলে ধরেছেন শরীফুল আলম সুমন, জামাল হোসেইন ও জাকারিয়া জামান

 

প্রাথমিক শিক্ষাই আমাদের শিক্ষার মূল ভিত্তি

অ্যাডভোকেট মোস্তাফিজুর রহমান

মন্ত্রী, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়

সুস্থ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে আমরা যদি শিশুদের পরিবেশ সৃষ্টি করে দিতে পারি তাহলে তাদের চিন্তাচেতনার মধ্যে আমরা পরিবর্তন আনতে পারব। সুনাগরিকের ভাবনা নিয়ে যদি কাজ করা যায় তাহলেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সোনার বাংলা বাস্তবায়িত হবে।

ব্র্যাক তাদের জায়গা থেকে কাজটি করছে। আমরা আমাদের জায়গা থেকে কাজ করছি। আমাদের স্কুলের সংখ্যা প্রায় ৬৪ হাজার। এই স্কুলগুলোতে আবৃত্তি, নাচ, গান, সামাজিক মূল্যবোধের জন্য আর যে কাজগুলো রয়েছে সেটাও করছি। স্কুল কোনো ভয়ের জায়গা নয়। স্কুল যেন তাদের আকর্ষণ করে। প্রতিটি স্কুলে প্রাক-প্রাথমিক খুলেছি। ৩৬ হাজার ১৪৫টি স্কুলে আমরা এখন পর্যন্ত খুলেছি। ব্র্যাকেরও প্রাক-প্রাথমিক রয়েছে। শিশুরা যেন প্রথম শ্রেণিতে যাওয়ার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নেয়, সে জন্যই এই শ্রেণির ব্যবস্থা। এ জন্য আলাদা শিক্ষকও নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। তারা প্রকৃতি, দেশ, মানুষ সব কিছুর ধারণা দিয়েই একটি শিশুকে পড়ালেখার জন্য প্রস্তুত করবে। আমাদের বিস্তৃত কাজ আছে। কিন্তু ব্র্যাক যেমনভাবে উপস্থাপন করতে পারে আমাদের প্রাথমিকে সেভাবে উপস্থাপিত হয়নি। আগে তো প্রাথমিকে এসএসসি বা এইচএসসি পাস ছাড়া গ্র্যাজুয়েট শিক্ষক ছিলেনই না। এখন ৬০ শতাংশ শিক্ষকই এমএ-এমএসসি করে শিক্ষকতায় আসছেন। ৬০ শতাংশ শিক্ষকতার পদ আমরা মেয়েদের নিচ্ছি। তারা এইচএসসি হলেই শিক্ষক হতে পারবে। কিন্তু বিএ-এমএদের দাপটে তারা পিছিয়ে পড়ছে। প্রাথমিকটাই আমাদের শিক্ষার মূল ভিত্তি। তাই সেই জায়গাটা শক্ত করে ধরতে হবে। পরবর্তী প্রজন্ম যাতে দেশটাকে এগিয়ে নিতে পারে সে চেষ্টাই করছি। আগে জাতীয় সংগীত বাধ্যতামূলক ছিল না। এখন আমরা বাধ্য না করলেও আবহটা তৈরি করেছি। বাঙালিত্ব যাতে বিজর্সন না দেয় সে চেষ্টা করছি। শিশুরাই আমাদের ভবিষ্যৎ। তাদের আমরা কেমনভাবে গড়ে তুলতে চাই সেটা আমাদেরই ঠিক করতে হবে। খুব জোরে চলতে না পারলেও আমরা নিরবচ্ছিন্নভাবে চলছি। আমরা শতভাগ শিশুকে স্কুলে আনতে পেরেছি। ৩০ লাখ শিশু স্কুল ফিডিংয়ের আওতায় থাকলেও প্রাথমিকে পড়ছে প্রায় দুই কোটি। ঝরে পড়ার হার আগে ৪৯ শতাংশে ছিল, সেটা ২০ শতাংশে নেমে এসেছে। আশা করছি, ২০১৮ সালের মধ্যে এটা শেষ হবে।

 

শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে আলোকিত হোক আমাদের শিশুরা

ইমদাদুল হক মিলন

সম্পাদক, কালের কণ্ঠ

বাংলাদেশের শিশুদের একটি বড় অংশ যারা গ্রামে বাস করে তাদের নিয়ে ব্র্যাকের কর্মসূচি সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। ব্র্যাকের পাঠাগার নিয়ে কিছু কার্যক্রম আমার দেখার সুযোগ হয়েছে। আসলে ব্র্যাক যে জায়গাটিতে উন্নয়নের চেষ্টা করছে এটাই আসল বাংলাদেশ।

আমরা শহরে থেকে আমাদের সন্তানদের যেভাবে মানুষ করার চেষ্টা করছি সেভাবে আসলে একটা দেশ দাঁড়ায় না। একটা দেশ দাঁড়াতে হলে গ্রামের শিশুদেরও প্রয়োজন হয়। আরো দরকার সর্বস্তরের নারী-পুরুষসহ দেশের সব শ্রেণির মানুষের অংশগ্রহণ। ব্র্যাক এই কাজে অনেকখানি এগিয়েছে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধসহ প্রতিটি বড় অর্জনের পেছনে সাংস্কৃতিক কর্মীরা একটি বড় ভূমিকা রেখেছেন। আমরা আমাদের পরের প্রজন্মকেও সেভাবে তৈরি করতে চাই। শিশুদের সংস্কৃতিচর্চা নিয়ে, শিক্ষা নিয়ে কিভাবে তাদের পাশে আমরা দাঁড়াতে পারি, কিভাবে একেকটি শিশুকে একজন আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারি সেটাই মূল আলোচ্য বিষয়।

আমাদের শিশুরা স্কুলে সংস্কৃতিচর্চা ঠিকমতো করতে পারছে কি না এসব বিষয়ে নজর দিতে হবে। এ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আমরা কেমন শিক্ষক নিয়োগ দিচ্ছি, সংস্কৃতিচর্চায় তাঁদের আগ্রহ আছে কি না কিংবা বাচ্চাদের তাঁরা কতটুকু সংস্কৃতিচর্চার দিকে ধাবিত করছেন এই বিষয়গুলোর প্রতি আমাদের লক্ষ রাখতে হবে। আমরা ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি শিক্ষকরা মানুষ গড়ার কারিগর। আমি তাঁদের কারিগর বলি না, তাঁরা আসলে মানুষ গড়ার শিল্পী। কারিগর ও শিল্পীর মধ্যে একটি বড় ব্যবধান আছে। কারিগর শুধু তৈরি করে দেন কিন্তু একজন শিল্পী তার মধ্যে প্রাণের সঞ্চার করেন। এ জন্য আমি বলি, আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকরা মানুষ গড়ার শিল্পী। আমরা আমাদের অনেক অহংকারের জায়গাগুলো নষ্ট করে ফেলেছি। তার পরও আমি অনেক আলো দেখতে পাই, যখন দেখি আমাদের তরুণ প্রজন্ম কিছু কিছু জায়গায় এসে দায়িত্ব নিচ্ছে। শিশুদের পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। আমরা ছোটবেলায় দেখেছি, যেকোনো পরিবারেই একটি বইয়ের আলমারি থাকত, যেখানে বেশ কিছু বিখ্যাত বই থাকত। সেই বইয়ের আলমারি কিন্তু এখন হারিয়ে গেছে আমাদের সংস্কৃতি থেকে। এমন অনেক কিছুই আমরা হারিয়ে ফেলেছি। তার পরও ভালো নতুন অনেক কিছু যুক্ত হয়েছে আমাদের সংস্কৃতিতে। আমরা সেই জায়গাগুলোতেই আমাদের সন্তানদের আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছি। মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার জন্য শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রয়োজন। আমরা যেন আমাদের সন্তানদের এই দুটি জায়গায় মানুষ হিসেবে তৈরি করতে পারি।

 

শিশুদের ভালো রাখার দায়িত্ব নিতে হবে আমাদেরই

লিয়াকত আলী লাকী

মহাপরিচালক, শিল্পকলা একাডেমি

একটি অসাধারণ শক্তি নিয়ে পৃথিবীতে শিশুরা আসে। আমরা তাদের সাধারণ বানিয়ে ফেলি। শিশুরা বড়দের চেয়েও জ্ঞানী হতে পারে। দেশের মোট জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশ শিশু। এদের মৌলিক অধিকারের পাঁচটি দেহের জন্য। একমাত্র শিক্ষা আছে মনের জন্য।

আমি মনে করি, শিক্ষাই একজন মানুষের জন্য যথেষ্ট নয়। সংস্কৃতিতে যতটা সম্ভব যুক্ত করে শিক্ষাকে সাজাতে হবে। পৃথিবীতে মানুষ এসেছে কিছু সৃজনশীল কাজ করার জন্য। তাদের জন্য সেই সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।

দেশে ২৫০টির মতো শিশু সংগঠন গড়ে তুলেছি। একটি নাট্যোৎসবের আয়োজন করেছি। এখানে ১৩০টির মতো সংগঠন যোগ দিয়েছে। শিশুদের জন্য ৬৫০টি কর্মশালা করেছি। এক বছরের শিশুদের নিয়েও কর্মশালা করা যায়। অনেক দিনের অভিজ্ঞতায় দেখলাম, মায়ের পেটের ভেতরেই একটি শিশুর অনুভূতির শুরু হয়। তার মায়ের কিছু হলে তার অনুভূতিও শিশু বুঝতে পারে। ভুমিষ্ঠ হওয়ার পর মায়ের নাক, কান ও হাতের আঙুল তার খেলনা হয়। এগুলো নিয়ে খেলতে খেলতে মানুষ সম্পর্কে শিশুটি ধারণা লাভ করে। সে বুঝতে পারে, তার প্রিয় মানুষ বিভিন্ন বাধার মধ্যেও তাকে রক্ষা করছে।

আজকের শিশুদের নিয়ে বিশ্ব যা ভাবছে, আমাদের কবিরা ১০০ বছর আগে তা লিখে গেছেন। শিশুদের ভালো রাখার দায়িত্ব আমাদের। তবে এখনকার শিশুরা যে শিক্ষায় বড় হচ্ছে, তাতে ওরা না মানুষ হবে, না এ দেশে  থাকবে। তাদের সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা না দেওয়ায় তারা জানতে পারছে না।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে তারা জানতে পারছে না। শিশুদের জন্য আমাদের শিক্ষকরা আছেন। তাঁরা কী পড়াচ্ছেন, তা নিয়ে আমাদের প্রশ্ন রয়েছে। সমাজ যদি শিশুবান্ধব না হয়, তাহলে একজন শিক্ষক বা একটি পরিবার শিশুদের বড় মানুষ করতে পারে না।

 

সংস্কৃতিচর্চাকে পাঠদানের মূলধারায় নিয়ে আসতে হবে

ডা. মুহাম্মাদ মুসা

নির্বাহী পরিচালক, ব্র্যাক

আগামী দিনে এ দেশ কেমন থাকবে, পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ কিভাবে তার স্থান করে নেবে তা নির্ভর করছে আজকের শিশুরা কিভাবে তৈরি হচ্ছে? কতটা সামগ্রিকভাবে তৈরি হচ্ছে। কিভাবে তারা নেতৃত্ব দিতে পারবে দেশে ও দেশের বাইরে।

শিশুদের তৈরি করার পেছনে সংস্কৃতিচর্চার একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। স্কুলের মাধ্যমে কিভাবে এগিয়ে নেওয়া যায় সে চেষ্টাই আমাদের থাকবে। আমাদের প্রতিযোগিতা এখন বিশ্বব্যাপী। আমাদের বেঁচে থাকা না থাকা সব কিছু বিশ্বের অন্যান্য জায়গার সঙ্গে সম্পৃক্ত। আমাদের সন্তানরা সারা পৃথিবীকেই তাদের কর্মক্ষেত্র হিসেবে ধরে নেবে। আজকের দিনে আমাদের একাডেমিক সেক্টর সত্যিকার অর্থে পরবর্তী প্রজন্মকে কতটা তৈরি করছে। বর্তমানে যে কারিকুলাম আমরা ব্যবহার করছি তাতে বেশি দূর এগোনো যাবে না। দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হলে সংস্কৃতিচর্চা যেমন মিউজিক, ডান্স, স্পোর্টস, ড্রামা, ডিবেট ইত্যাদির প্রয়োজন। যা একাডেমিক শিক্ষার চেয়েও দক্ষতা বৃদ্ধিতে বেশি ভূমিকা রাখবে। এখনো সংস্কৃতিচর্চাকে এক্সট্রা কারিকুলাম হিসেবে দেখা হয়। সংস্কৃতিচর্চাকে মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। এ জন্য ইনভেস্টমেন্ট বাড়ানো দরকার। স্কুলে শিশুদের শিক্ষাপদ্ধতি এখন বেশি একাডেমিক। একটি বাচ্চার আট ধরনের চাহিদা থাকে। আমরা যা পড়াই সেখান থেকে দু-একটা চাহিদা পূরণ হয়।

কিভাবে আমরা ব্যালান্সড কারিকুলাম তৈরি করব তা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমরা ব্র্যাক থেকে যেটা করছি সেটা হচ্ছে, সংস্কৃতিচর্চাকে হাইলাইট করছি। আমরা শিক্ষকের কাছ থেকে অনেক কিছু আশা করলেও তাদের কি সেভাবে তৈরি করেছি? এখন কি বলব অঙ্কের পাশাপাশি একটু গানও শেখান। সামাজিকভাবে আমরা কতটুকু প্রস্তুত। এই প্রস্তুতির জন্য বাজেটের একটা ভূমিকা আছে। প্রতিটি এলাকায় আমরা কাজ না করলে মনে হয় ব্যাপকভাবে এগোতে পারব না।

 

চারু-কারুকলাকেও বাংলা ইংরেজির মতো গুরুত্ব দিতে হবে

ড. শফিকুল ইসলাম

পরিচালক, ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচি

এখন শতভাগ শিশুই স্কুলে আসছে। আর সেখানে ৫০ শতাংশের বেশি মেয়ে শিক্ষার্থী। এই দুটি অর্জন বাংলাদেশকে পৃথিবীর মানচিত্রে অনেক বেশি এগিয়ে নিয়ে গেছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। বিদ্যালয়ের ভেতরেও আমাদের অনেক অর্জন রয়েছে।

চারু ও কারুকলা বিষয়টি প্রাথমিকের পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্তই আছে। কিন্তু উপস্থিতি থাকলেও সেটা কতটুকু সফল, কতটুকু দৃষ্টি পাচ্ছে। আর আমরা এ বিষয়ে কতটুকুই বা বিনিয়োগ করছি সেটাই মূল বিষয়। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, শিক্ষণ কার্যক্রমটা আসলে কতগুলো পাঠ্যপুস্তকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার বিষয় নয়। সেটা তার বাইরে যেতে হবে। এ জন্য তার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো লাগবে। এটাই হচ্ছে পাঠাগার। শহরে যারা বসবাস করি তারা আমাদের সন্তানদের ললিতকলা একাডেমিতে পাঠাচ্ছি। আর্ট, গান, কবিতা, নাচ শেখাচ্ছি। আমাদের পাশে রিসোর্সগুলো থাকায় সেটা করতে পারছি। আমাদের অল্পদিনে সব শিশুকে বিদ্যালয়ে নিয়ে আসতে শিক্ষক, কক্ষের দিকে দৃষ্টি দিতে হয়েছে। কিন্তু এখন মোক্ষম সময় সংস্কৃতির বিষয়ে নজর দেওয়া। প্রাথমিক সমাপনীতে চারু ও কারুকলা পরীক্ষা না হওয়ায় বাবা-মা সেটাতে ইনভেস্ট করে না। কিন্তু একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলে তার গান গাওয়ার সামর্থ্যও থাকবে না। কারণ সেই শিক্ষা সে ছোটবেলায় পায়নি। দুই কোটি শিশুর মধ্যে পূর্ণাঙ্গ মানুষ হওয়ার জন্য আমরা ক্ষেত্র তৈরি করছি। গরিব মানুষ কি সব সময়ই বঞ্চিত থাকবে? যেই শিক্ষকদের আগ্রহ আছে সেখানে চারু ও কারুকলা একটি ভিন্ন মাত্রায় থাকে। যাদের দক্ষতা নেই সেই জায়গাটা ভিন্ন। চারু ও কারুকলা সাইডে রাখার বিষয় নয়। বাংলা, ইংরেজি, গণিত যদি গুরুত্বপূর্ণ হয় প্রথম হতে হবে চারু ও কারুকলা। এ বিষয়ে অবশ্যই শিক্ষকদের দক্ষতা থাকতে হবে। সব স্কুলেই চারু ও কারুকলা প্রান্তিক জায়গায় চলে যাচ্ছে। এ জন্য আমাদের বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তা না হলে একটা বড়সংখ্যক শিক্ষার্থী স্বপ্ন তৈরির জায়গা থেকে পিছিয়ে পড়বে। সমাজের নৈতিক অবক্ষয় রুখতে প্রয়োজন টেকসই চারু ও কারুকলা শিক্ষা। এটি রাষ্ট্রীয় দূরদর্শিতার দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনায় আনতে হবে।

 

শিক্ষাব্যবস্থায় সহশিক্ষাকে কম গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে

অধ্যাপক আবুল বার্ক আল্ভী

চিত্রশিল্পী

একটা তিন বছরের শিশুর চিন্তাভাবনার সঙ্গে আট বছরের শিশুর চিন্তাভাবনা মিলবে না। বয়সের সঙ্গে চিন্তাভাবনার পার্থক্য তৈরি হয়। এ ক্ষেত্রে যিনি শিক্ষকতা করবেন, তাঁকে এসব বিষয় মনে রাখতে হবে।  কাকে কী ধরনের কথা বলতে হবে, তাঁকে তা জানতে হবে।

একটা শিশু যদি ছবি আঁকায় মজা পায়, তাকে তা করতে দিতে হবে। এটা তার মেধা ও মননকে বিকশিত করতে পারে। শিশুদের প্রতিভার বিকাশের সুযোগ দিতে হবে। সে আজ না হয় পারবে না, তবে কাল তো পারবে। আর শিশুদের প্রতিভা বিকাশের জন্য কিছু কিছু প্রতিযোগিতার আয়োজন করা যেতে পারে। যেকোনো শিশুর হাতে একটা পেনসিল দিলে সে আঁকিবুঁকি শুরু করে। এভাবে তার হাতে একটা ভারসাম্য তৈরি হয়। একটা সময় সে মানুষের ছবিও এঁকে ফেলে। এটা তার সহজাত কাজ। এভাবে শিশুরা শিখে থাকে। তাদের সেই শেখার সুযোগ দিতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা হলো, শিশুরা যা করে মজা পায়, তাকে তা করতে দেওয়া উচিত। এতে তার প্রতিভার বিকাশ ঘটা সহজ হয়। শিশুদের তাদের মতো করে চিন্তা করতে দিতে হবে। যত ওপরের শ্রেণিতে উঠবে, ততই তার প্রতি মনোযোগ দিতে হবে। এ সময় তার ভুলগুলো ধরিয়ে দিতে হবে।

আমার মনে হয়, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় সহশিক্ষাকে গুরুত্ব কম দেওয়া হচ্ছে। চারুকলাটা মাত্র অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত রয়েছে। অথচ দেশের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিষয়টি রয়েছে। এটাকে গুরুত্ব দিলে শিশুদের মানসিক বিকাশ আরো বেশি ঘটতে পারে।

 

শুধু পড়ালেখা শিশুকে পরিপূর্ণ মানুষ করে না

অধ্যাপক কাজী আফরোজ জাহানারা

শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সরকার ইনক্লুসিভ শিক্ষার ওপর জোর দিয়েছে। দেশের ধনী-দরিদ্র, প্রতিবন্ধী শিশু—কেউই শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে না। আমরা শিশুদের বিদ্যালয়ে নিয়ে আসতে পারি, তাদের ধরে রাখতে পারি না কেন—এ বিষয়ে জোর দিতে হবে।

শুধু বই, খাতা, কলম দিয়ে শিক্ষাকে চার দেয়ালের মধ্যে বন্দি না রেখে যদি সহশিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে পারি, তাহলে একটি শিশু পূর্ণাঙ্গভাবে বিকশিত হতে পারে। শুধু পড়ালেখা দিয়ে একটি শিশু মানুষ হতে পারে না। এতে সেই সর্বোচ্চ মানের একজন নির্বোধ হতে পারে। সারা বিশ্বে আজ আমরা কী দেখছি। সন্ত্রাস আর অপরাধে বিশ্ব ছেয়ে গেছে। এর পেছনে মূলত কাজ করছে কী? এসব অপরাধে আমাদের যুবকরা ঝুঁকে পড়ছে। শিশুরা এক্সট্রা কারিকুলাম কার্যক্রমে অংশ নিলে তারা অপরাধমূলক কাজে জড়িত হবে না। তাদের সময়গুলো খেলাধুলার মতো কাজে লাগাতে পারবে। শিশুদের শিক্ষার সঙ্গে সহশিক্ষা কার্যক্রম জোরদার করতে পারে। বিদ্যালয়গুলোকে উদ্ভাবনী পন্থাগুলো বেছে নিতে হবে। এতে শিশুদের নৈতিক, শারীরিকসহ যাবতীয় বিকাশ ঘটবে। তাদের মধ্যে দক্ষতা বাড়বে। এসব দক্ষতা যোগাযোগের দক্ষতা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা, জীবনকে উপলব্ধি করার দক্ষতা বাড়াবে। এতে তাদের সত্যিকারে বিকাশ ঘটবে। তারা সত্যিকারের মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে।

 

আগের আন্তরিকতা এখন শিক্ষকদের মধ্যে নেই

নাসির আহমেদ

পরিচালক (নিউজ), বাংলাদেশ টেলিভিশন

আমি ১৯৫৮ সালে প্রাইমারিতে ভর্তি হই। আমাদের সময় প্রাইমারির শিক্ষকরা যা শিখিয়েছেন, আজকের এমএ বা এমএইডি শিক্ষকরা তা শেখাতে পারছেন না। যে কারণেই হোক এ ধরনের একটি অধঃপতন হয়ে গেছে।

আর শিক্ষা বাণিজ্যিকীকরণের কারণেও অনেক সমস্যা তৈরি হয়েছে। আমাদের সময় ছিল টেবিল। আমরা কোনো সোফা দেখিনি। এখনকার অনেক শিক্ষার্থী সোফা ছাড়া পড়তে পারে না। শিক্ষায় তারা আরাম-আয়েশের বিষয়টি নিয়ে এসেছে। পাকিস্তানি আমলে অনেক সীমাবদ্ধতা থাকার পরও আমরা শিক্ষা-দীক্ষায় অনেক এগিয়ে গেছি। অথচ আজকের শিশুরা তা পারছে না। এটা শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের ফল।

অজপাড়াগাঁর শিক্ষকরা যেমন আন্তরিক ছিলেন, আজকের শিক্ষকদের মধ্যে তা নেই। আমি ১৯৬২ সালে প্রাথমিক বৃত্তি পেয়েছি। ৩৮ বছর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় মাস্টার্স করেছি।

আমার শিক্ষার সেই ভিত্তি গড়ে দিয়েছেন প্রাথমিকের শিক্ষকরা। আমাদের সময় গান গাওয়া পাপ ছিল। অথচ অজপাড়াগাঁ থেকে এসে আমি গীতিকার হয়েছি। হাজারখানেক গান লিখেছি। আমরা অনেক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে শিল্প-সাহিত্যের এই জায়গায় এসেছি। প্রাথমিক শিক্ষা হচ্ছে শিক্ষার জননী। দেশের শিক্ষার মান উন্নয়নে প্রাথমিক শিক্ষাকেই ঢেলে সাজাতে হবে।

 

প্রয়োজন ভারসাম্যপূর্ণ কারিকুলাম

শহীদুল আলম সাচ্চু

অভিনেতা ও ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (প্রোগ্রাম)চ্যানেল আই

আমরা প্রাইভেটাইজেশনের মধ্য দিয়ে পার হচ্ছি। এটার ফল ভালো ও মন্দ দুটিই আছে। বর্তমান অবস্থা হলো, শিশুদের মা-বাবা হত্যা করছে, আবার শিশুরাও মা-বাবাকে হত্যা করছে। এটার ফলাফল কী। আসলে শিশুদের মানসিক অবস্থা বিকাশের জন্য আমরা কি করছি? সংস্কৃতিচর্চার মাধ্যমে একজন সঠিক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এটার জন্য ভারসাম্যপূর্ণ একটি কারিকুলাম দরকার। দেশের অনেক জায়গায় আমরা উন্নতি করেছি। আমার মনে হয়, এ জায়গায় আমাদের আরো উন্নতি করার প্রয়োজন আছে।

 

 

 

শিশুর বিকাশে বীজ বোনে তার পরিবার

ফাতেমা-তুজ-জোহরা

সংগীতশিল্পী

ব্র্যাককে চেনার একটি সুযোগ হয়েছে একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। ‘তারায় তারায় দীপ শিখা’র মাধ্যমে তাদের জানতে পেরেছি। ব্র্যাক শিশুদের আন্তরিকভাবে শেখাচ্ছে, বিষয়টি দেখে খুব ভালো লেগেছে। প্রতিটি শিশুর পরিবার থেকে শিক্ষা নিয়ে আসলে তার বিকশিত হওয়ার সুযোগ থাকে বেশি। মা-বাবা প্রাথমিক শিক্ষার বীজ না বুনতে পারলে স্কুল-কলেজ তেমন কিছু করতে পারে না। আমার বাবা শেখানোর সময় খুব খুঁত ধরতেন। এর ফলে অনেক জিনিস আমাদের মাথায় ঢুকে গেছে শৈশবেই। আমি মনে করি, শিশুর বিকাশের বীজ বোনে তার পরিবার। এখন দেখি শিশুদের মধ্যে ছোট বয়স থেকে বিভাজন সৃষ্টি করা হয়। এটা পরিবার থেকে অনেক সময় শুরু হয়। বিষয়টা শিশুর বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। তবে ললিতকলা শিক্ষা শিশুর বিকাশে সাহায্য করে। এ ক্ষেত্রে আন্তরিক প্রচেষ্টা খুব দরকার।

 

 

শিল্পচর্চার মাধ্যমে বাড়াতে হবে সৃজনশীলতা

লুবনা মরিয়ম

নৃত্যশিল্পী

নাচ একটি বহুমাত্রিক শিল্পচর্চা। এখানে শরীরের চর্চা হচ্ছে, মস্তিষ্কের চর্চা হচ্ছে। আমাদের মাথার যে নিউরোসেন্সগুলো অকেজো হয়ে থাকে, নাচের মাধ্যমে সেগুলো আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে। সেগুলো শিশুদের অঙ্কে ও বিজ্ঞানে মন দিতে সহায়তা করে।

এটাকে বলা হয় নিউরো জেনেসিস থ্রু দ্য আর্টস। এটা বাচ্চার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার। বাচ্চা নাচার পর তার শারীরিকশক্তি ও স্মৃতিশক্তি বাড়ছে। এক ঘণ্টা নাচ করলে মস্তিষ্কের কোথাও তার একটা কিছু সক্রিয় হয়ে উঠছে। সেই সক্রিয় অংশগুলো অন্য বিষয়গুলোকে সক্রিয় করতে সহায়তা করে। এসব চর্চা আবার নৈতিক চর্চাকে সহায়তা করছে।

আমাদের ভাষার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ভাষা প্রকাশ করার মতো খুব বেশি শব্দ নেই। অথচ আমাদের অনেক কিছু করতে হয়। এ ক্ষেত্রে আমরা সৃজনশক্তির ব্যবহার করি। যেমন—চাঁদের মতো মুখ। কোথায় চাঁদ, আর কোথায় মুখ। এটাকে আমরা সৃজন করে সৃষ্টি করছি। শিল্পচর্চার মাধ্যমে নৈতিকতা বিকশিত করা হয়। তাই আজ শিক্ষাব্যবস্থায় শিল্পচর্চাকে পাঠ্যসূচির মধ্যে আনার কথা বলছেন অনেকেই। আমি মনে করি, এটাকে শিক্ষার মূলধারায় নিয়ে আসতে হবে। সরকার এটা নিয়ে চিন্তা করলে শিশুদের জন্য অনেক ভালো হবে বলে আমার বিশ্বাস।

 

প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার পাশাপাশি সংস্কৃতিচর্চা শিশুর মনোযোগ বাড়ায়

হাবিবা ইসলাম

শিক্ষক, ব্র্যাক স্কুল

খুব কম বয়স থেকে আমি ব্র্যাকের সঙ্গে আছি। স্কুলটির দায়িত্ব নেওয়ার সময় বাচ্চাদের উপস্থিতি কম ছিল। আমি ক্লাস নেওয়া শুরু করার পর দেখলাম, স্কুলে বাচ্চার সংখ্যা আস্তে আস্তে বেড়ে চলেছে। আমার বয়স কম হওয়ায় ওদের সঙ্গে খুব ভালোভাবে মিশে যেতে পেরেছি। ওদের খুব সহজে অঙ্ক ও ইংরেজির মতো বিষয়গুলো বোঝাতে সক্ষম হয়েছি। আমি দেখেছি, আমার কথা ওরা মনোযোগ দিয়ে শুনছে। তবে মাঝে মাঝে বিরক্ত হলে ওদের নিয়ে নাচ ও গান করতাম। দেখতাম ওরা হৈ-হুল্লোড় করে তাতে যোগ দিয়েছে। কিছুক্ষণ পর তারা একেবারে ফ্রেশ হয়ে যেত। আবার অঙ্কের মতো কঠিন বিষয়ও খুব সহজে আত্মস্থ করতে পারত। ওদের মধ্যে বোরিং ব্যাপারটা কখনো লক্ষ করিনি। ওদের পরিবারে মা-বাবার ঝগড়া, অভাবের মতো বিষয় উপেক্ষা করে খুব ভালো পড়াশোনা করতে পারছে। এটা আমাকে খুব আনন্দ দেয়। আর জাতীয় সংগীত, শারীরিক অনুশীলনের মতো বিষয়ের প্রতি ওদের আগ্রহ দেখে খুব ভালো লাগে। আসলে পড়াশোনার পাশাপাশি গান, নাচ, ছবি আঁকার মতো বিষয়গুলো থাকলে শিশুদের জন্য শিক্ষা উপভোগ্য হয়ে ওঠে।

 

 

 


মন্তব্য