kalerkantho


রয়েল বেঙ্গল বিউটি পার্লার

মো. সাখাওয়াত হোসেন

৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০




রয়েল বেঙ্গল বিউটি পার্লার

গ্রামের নাম শান্তিপুর। নামের সঙ্গে এর মানুষজনের কর্মকাণ্ডেরও মিল ছিল। সবখানেই একটা শান্তিপূর্ণ ভাব বিরাজ করত। গ্রামের মানুষজন যখন ঝগড়াঝাটি করত, সেখানেও একটা শান্তিপূর্ণ ভাব বজায় রাখার চেষ্টা করত। খালি মাঝেসাঝে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যেসব কথা-কাটাকাটি বা ঝগড়া হতো, সেসব খানিকটা শান্তির সীমানা পার করে ফেলত। তবে সে সবের স্থানকাল নিজ নিজ শয়নকক্ষ থাকত বলে তা নিয়ে খুব একটা ঝামেলা হতো না।

সেই শান্তিপুরের বাজারে একদিন বিশাল এক তাঁবু খাটানো হলো। অনেকটা সার্কাস পার্টিরা যেমন খাটায়। সাইনবোর্ডে লেখা হচ্ছিল ‘রয়েল বেঙ্গল বিউটি...’ গ্রামের মানুষরা মোটামুটি ধরেই নিল আরেকটা সার্কাস পার্টি এসে গেছে। গতবারও এই নামেরই একটা সার্কাস পার্টি এসেছিল, যার আগে শুধু ছিল নিউ। মানে ‘দ্য নিউ রয়েল বেঙ্গল বিউটি সার্কাস’। কিন্তু শান্তিপুরের মানুষজনের সব ধ্যান-ধারণা আর শান্তি ভেঙে দিয়ে সাইনবোর্ডে লেখা হলো, ‘রয়েল বেঙ্গল বিউটি পার্লার’। খুব সুন্দর দুজন নারীর ছবির পাশাপাশি লেখা ছিল, ‘শুধু মহিলাদের জন্য, পুরুষদের প্রবেশ নিষেধ।’

পুরুষদের প্রবেশ নিষেধ—এই নোটিশ দেখার সঙ্গে সঙ্গেই গ্রামের সব পুরুষ পার্লারের আশপাশে ভিড় জমাল। চারপাশে খবর ছড়িয়ে পড়ল এটা আসলে একটা বিউটি পার্লার। যেখানে মেয়েদের মুখ, চুল এসব আরো বেশি সুন্দর রাখার জন্য নানা ধরনের ব্যবস্থা আছে। এককথায় মাইয়াগো সেলুন। সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে সেই পার্লারে প্রথমবারের মতো ঢুকে পড়ল গ্রামের অবস্থাপন্ন পরিবার নজু শেখের বউ রাহেলা। রাহেলা বের হলো চুলে শ্যাম্পু আর মুখে কি যেন করে। গ্রামে ফিসফিস ছড়িয়ে পড়ল, ‘নজু শেখের বউ রাহেলা সুন্দর হইয়া গেসে।’

এই কথা রাহেলার কানে যেতেই সে বলল, ‘মুখপোড়া হনুমানের দল, আমি কোনো দিন সুন্দর আছিলাম না?’

এই বলে সে তার সদ্য স্ট্রেইট করা চুল বাতাসে ঝাঁকি মারল। বেশি দিন লাগল না, গ্রামের মহিলারা ধীরে ধীরে বিউটি পার্লারের দিকে যেতে লাগল। কেউ ফেসিয়াল করে, কেউ চুল রিবন্ডিং করে। গ্রামের পুরুষরা বিরক্ত হয়ে পড়ল। প্রথম থেকেই তারা বিরক্ত ছিল, প্রধানত পার্লারের ভেতরে ঢুকতে না দেওয়ার কারণে। এবার তারা বিরক্ত হলো টাকা-পয়সা যেতে শুরু করেছে বলে। বিরক্তির শেষ সীমায় পৌঁছাল সেদিন, যেদিন করিম উল্লাহর বউ বলল, সে আজ থেকে আর ঘরের কাজ করতে পারবে না, কেননা তার হাত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পার্লার থেকে তাকে হাতের কাজ কম করতে বলেছে। এই ঝামেলার মধ্যেই একদিন জামাল মিয়ার মেয়ে আর নওয়াব মিয়ার বউ এর কপালে আর মুখে দেখা গেল ব্রণ। তারা দুজনেই পার্লারের নিয়মিত খদ্দের। দুজনেই খুব চিন্তায় পড়ে গেল। পার্লারে যেতেই তাদের বলা হলো, কোনো একজন চর্মরোগ ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলতে। কিন্তু এখন গ্রামে এই ধরনের ডাক্তার পাবে কই?

তার এক সপ্তাহ পর সকালেই দেখা গেল শান্তিপুর গ্রামে একটা ভ্যান গাড়িতে এক কবিরাজ হাজির। সাইনবোর্ডে লেখা, ‘চর্মরোগ চিকিত্সক রাজা মিয়া’।

তত দিনে ব্রণ, চুল পড়া, খুশকি এ ধরনের অনেক রোগী গজিয়ে গেছে। সকাল থেকে লাইন পড়ে গেল সেই কবিরাজের সামনে। কবিরাজ থেকে চিকিত্সা নিয়ে কিছুদিন পর সুস্থ হয়ে তারা আবার পার্লারে যায়। আবার কিছুদিন পর নানা ধরনের চর্মরোগ দেখা দেয়। আবার তারা কবিরাজের কাছে যায়। পার্লার-কবিরাজ-পার্লার এই এক অদ্ভুত চক্র সৃষ্টি হলো শান্তিপুর গ্রামের মহিলাদের জন্য। ম্যালেরিয়া মশার জীবন চক্রের মতো। পার্লার আর চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের টাকা জোগাতে জোগাতে খেপে গেল গ্রামের লোকজন। এক বৈঠকে গ্রামের প্রায় সব পুরুষ এক হলো। তাদের স্ত্রীরা আগে কী সুন্দর কাঁচা মেহেদি বেটে চুলে লাগাত, মাথায় সরিষার তেল দিত, কত সুন্দর লাগত তাদের—সেই সব নিয়ে আলোচনা হতে লাগল। নজু শেখকে প্রধান করে একটা কমিটি করা হলো। নাম দেওয়া হলো, ‘পাদক’, মানে পার্লার দমন কমিটি।

‘পাদক নামটা কেমন অশ্লীল হইয়া গেল না?’ একজন আপত্তি করল।

‘কিয়ের অশ্লীল? নামটা অশ্লীল সেটা চোখে পড়তেসে, এই পার্লার আর কবিরাজ বেডা মিইলা কামডা কি করতেসে হেইডা চোখে পড়ে না?’

পাদকের তদন্তে উঠে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য। পাদকের প্রধান খোদ নজু শেখই হলো এই পার্লারের প্রকৃত মালিক। আর সেই কবিরাজ হলো তার বন্ধু। পার্লারে নিম্নমানের জিনিস গ্রামের মহিলাদের রূপচর্চায় ব্যবহার করা হতো। আবার এদিকে কবিরাজ চিকিত্সার মাধ্যমে হাতিয়ে নিত মোটা টাকা, যার একটা অংশ যেত নজু শেখের পকেটে। গ্রামের লোকজনের প্রবল প্রতিরোধের মুখে পালাল পার্লারের লোকজন। নজু শেখ তার বউকে নিয়ে অন্য গ্রামে পাড়ি জমাল। আর চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের চর্ম প্রায় খুলেই নিল গ্রামের লোক। শান্তি ফিরে এলো আবার শান্তিপুরে। অনেক দিন পর গ্রামের মেয়েরা মাথায় ঘানি ভাঙা সরিষার তেল দিয়ে বিকেলে ঘুরতে বের হলো।



মন্তব্য