kalerkantho


হাই স্কুলের দিনগুলোতে প্রেম

মো. হাসিবুর রশীদ   

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



হাই স্কুলের দিনগুলোতে প্রেম

তখন ক্লাস এইটে পড়ি। ভালো ছাত্র কোনোকালেই ছিলাম না। বাবার আর্থিক অবস্থার মতো আমার মেধার দৌড়ও ছিল মধ্যবিত্ত শ্রেণির। ছাত্রজীবনের শুরু থেকেই শুধু ক্লাসে স্যারের পিট্টি এড়ানোর জন্য পড়া মুখস্থ করতাম, কিন্তু মাঝেমধ্যে শেষ রক্ষা হতো না। পরিবারের প্রত্যাশার চাপ আর মেধার ঘাটতির মাঝে পড়ে আমার অবস্থা পুরাই রস বের করা আখের ছোবড়ার মতো। কিন্তু ক্লাসের অন্য সবাইকে দেখতাম বিন্দাস ঘুরে বেড়াতে।

তখন প্রাইমারি স্কুল বাদে সরকারি বই দেওয়া হতো না, বাইরে থেকে কিনতে হতো। তাই বইয়ের অভাবে বছরের শুরুর দিকে আমাদের ক্লাস খুব একটা জমে না উঠলেও সৌরভ ও রাবেয়ার প্রেম ঠিকই জমে উঠেছিল। তারা নিজ নিজ খাতায় একে অন্যের নাম লিখে ভালোবাসা প্রকাশ করত। তখন ‘লাভ মিটার’ নামক অ্যাপস না থাকায় আমরা খাতার প্রতি পৃষ্ঠায় নামের সংখ্যা গুনে গুনে তাদের মধ্যকার প্রেমের শতকরা হিসাব বের করতাম।

আমি নিজে অবশ্য এসব হিসাব খুব কম বুঝতাম। সাইজে অন্য সবার থেকে একটু খাটো বলে অ্যাসেম্বলিতে আমাকে ঠিকই লাইনের সামনে দাঁড়াতে হতো। ক্লাসেও ঠিক একই, একেবারে সামনের বেঞ্চে। ক্লাসে দেরি করে গেলেও স্যার ঠিকই আমাকে খুঁজে সামনে নিয়ে বসাতেন এবং শুরুতেই আমার পড়া ধরতেন। সে জন্য আমার মাথায় তখন ঘুরত—যদি ২৩ নম্বর উপপাদ্য বলতে না পারি, তাহলে...নাহ, আর ভাবতে পারি না!

তখন আমাদের স্কুলে ক্লাস এইটের আগে পরীক্ষায় ক্যালকুলেটর ব্যবহার করার অনুমতি ছিল না। কারণ ক্লাস এইটে দুইটা আজব কিসিমের অঙ্কের টপিক ছিল, যা ক্যালকুলেটর ছাড়া করা যেত না। টপিক দুটি হলো পৌনঃপুনিক সংখ্যা ও বর্গমূল। বছরের শুরুতেই আমি বাবার কাছ থেকে পকেট সাইজের একটা ক্যালকুলেটর পেয়েছিলাম। সারা দিন ক্যালকুলেটর আমার হাতেই থাকত। বিভিন্ন সংখ্যার বর্গমূল আগে থেকে দেখে নিয়ে বন্ধুদের জিজ্ঞেস করতাম। ওরা না পারলে বলে দিয়ে সবজান্তার মতো হাসি দিতে ভালো লাগত।

এভাবে করতে করতেই ফেব্রুয়ারির অর্ধেক পেরিয়ে গেল। আমার ক্যালকুলেটরের বর্গের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ক্লাসের সব প্রেমিক-প্রেমিকার অস্থিরতা বাড়তে লাগল। সরকারি ছুটির ক্যালেন্ডারে ১৪ ফেব্রুয়ারি লাল দাগে চিহ্নিত না করায় সবাই তখনকার সরকারের কড়া সমালোচনা করে জ্বালাময়ী বক্তব্য দিতে লাগল। ব্যাকবেঞ্চার শরীফ বলল, সে যদি কোনো দিন ক্ষমতাশালী মানুষ হতে পারে, তাহলে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেবে।

‘চল, আমরা একটা দরখাস্ত নিয়ে হেড স্যারের কাছে ছুটি চাই।’ ক্লাসের সবচেয়ে ভালো ছাত্র খালিদ পরামর্শ দিল। ওর কথা শুনে বুঝলাম, সে দিল্লির লাড্ডু না হলেও অন্তত দেশি নাড়ুর সন্ধান পেয়েছে। আমরা সর্বসম্মতিক্রমে ছাত্রদের প্রতিনিধি হিসেবে খালিদ এবং ছাত্রীদের প্রতিনিধি নাজনীনকে দরখাস্ত রেডি করার জন্য দায়িত্ব দিলাম।

১৩ ফেব্রুয়ারি সবাই চুলে ডানসিঁথি কেটে পরিপাটি হয়ে হেড স্যারের রুমে চলে গেলাম। দরখাস্ত দেখে স্যার আমাদের ওপর রেগে ভিসুভিয়াসের মতো অগ্নিবর্ষণ করতে লাগলেন। আমরা যে যে দরখাস্ত দিয়ে গেছি, তাদের নামের তালিকা করার জন্য স্যার যখন পিয়ন রতন দাকে ডাকলেন, তখন আমরা পালিয়ে বাঁচলাম। কারণ আমরা বুঝতে পেরেছিলাম যে আমাদের প্রত্যেকের বাড়িতে নোটিশ যাবে। হাতে টিসিও উঠতে পারে। আমরা সবাই এই ভেবে সান্ত্বনা পেলাম, মফস্বলের হাই স্কুলের ব্যাচেলর (শিক্ষাগত ও বৈবাহিক উভয় যোগ্যতায়) হেড মাস্টার ভ্যালেনটাইনসের মর্ম কিভাবে বুঝবে?

টিফিন পিরিয়ডের পর আমরা যখন দ্বিতীয় শিফটের প্রথম ক্লাস করার জন্য বিজ্ঞানের ম্যাডামের সঙ্গে ক্লাসরুমে ঢুকলাম, তখন দেখলাম ব্ল্যাকবোর্ডে অবিবাহিত হেড স্যার ও ম্যাডামের নামে খুব হাবিজাবি ভাষায় কিছু একটা লেখা। লেখাটা পড়েই ম্যাডাম টিচার্স লাউঞ্জে ফিরে গেলেন। তার কিছুক্ষণ পরই হেড স্যার তেড়ে আমাদের রুমে ঢুকেই আমাকে প্রথম বেঞ্চে পেয়ে গেইল যেভাবে বল পিটায় সেভাবে পিটাতে লাগলেন। স্যারের হাতে-পায়ে ধরে মাফ চেয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখি ক্লাসরুম একেবারে ফাঁকা। কখন যে সবাই পালিয়েছে, টেরই পাইনি। কারণ আমি আমার সাধের ক্যালকুলেটরে বিভিন্ন সংখ্যার বর্গমূল বের করতে ব্যস্ত ছিলাম।

পরদিন স্কুলে গিয়ে প্রথমেই নোটিশ পেলাম, আমাদের পড়ালেখার অগ্রগতি ও নৈতিকতার উন্নতির জন্য ছাত্র-ছাত্রীদের ক্লাসরুম আলাদা করে দেওয়া হয়েছে।



মন্তব্য