kalerkantho


১৪ই ফেব্রুয়ারির রামছাগল

মো. সাখাওয়াত হোসেন   

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



১৪ই ফেব্রুয়ারির রামছাগল

১৪ই ফেব্রুয়ারি। বিশেষ একটা দিন। অনেকের কাছেই। সুন্দরবনের বাঘ, হরিণ—এদের কাছেও। ওই দিন সুন্দরবন দিবস যে। অনেকেই জানেন না মনে হয়। এই হলো দেশের অবস্থা।

১৪ ফেব্রুয়ারি আমার কাছেও স্মরণীয়। খুলেই বলি পুরোটা।

তখন আমি ক্লাস এইটে পড়ি। শুকনো টিংটিঙে। মাথায় আবার কায়দা করা লম্বা লম্বা চুল। ১ নম্বর খাঁটি সরিষার তেল মেখে, মাঝখান দিয়ে সিঁথি করি। কিছু বন্ধু করিমুন নেসা বলে খ্যাপাতে চেষ্টা করে। সারা দিন এই পাড়া ওই পাড়া ফুটবল, ক্রিকেট খেলা, তিন গোয়েন্দা পড়ার পাশাপাশি পড়ালেখাটাও মাঝেমধ্যে করার চেষ্টা করি। আম্মার ধারণা, বাঁদরের মতো পেছনে একটা লেজ গজাচ্ছে। প্যান্টের কারণে দেখা যাচ্ছে না।

এভাবেই দিন চলছিল। সেদিন ছিল ১৪ই ফেব্রুয়ারি। অল্প অল্প ভ্যালেন্টাইনস ডে বুঝি। যেসব বন্ধু একটু বেশি পেকে গেছে, তারা ‘তুমি কি হবে আমার’ নামের সিনেমা দেখতে চলে গেছে তাদের গার্লফ্রেন্ড নিয়ে। স্কুল থেকে ফিরতেই দেখি বাসার অবস্থা থমথমে। আব্বা-আম্মা বসে আছেন ড্রইংরুমে। টেবিলের ওপর চমৎকার একটা ফুলের তোড়া।

‘কী ব্যাপার, কী এটা?’ আব্বাকে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম। এখন যেভাবে ছেলে-মেয়েরা বাবার সঙ্গে খুব ফ্রি, একসঙ্গে বসে লা লিগা নিয়ে আলোচনা করে, তখন সে রকম ছিল না। আব্বার রুমে আমাদের ডাক পড়ত চড়-থাপ্পড় খাওয়ার টাইম এলে।

‘কী ব্যাপার, তুমিই তো ভালো বলতে পারবে।’ আব্বা চিবিয়ে চিবিয়ে বলল।

‘আমি?’ আকাশ থেকে পড়লাম। একেবারে সোজা আকাশ থেকে। ‘আমি কিভাবে?’

‘ভ্যালেন্টাইনস উপলক্ষে ফুল পাঠিয়েছে!’ আম্মা বলল।

‘আমার জন্য?’ খুশি ভাবটা প্রায় বের হয়েই পড়েছিল। অনেক কষ্টে সামলিয়েছিলাম।

‘তুমি ছাড়া আর কে?’ আব্বা বলল।

আসলে আমি একাই ছিলাম। আমার কোনো ভাই-বোন ছিল না। এখন ভ্যালেন্টাইনস কার্ডসহ এক তোড়া ফুল এলে তর্জনীটা আমার দিকেই তাক হয়।

‘আমি কিছু জানি না, আব্বা!’ গোবেচারা ভাবটা ফুটিয়ে তোলার সেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলাম।

‘আচ্ছা, রুমে যা।’ আম্মা বলল।

সেই দিন প্রথম রুমে গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ালাম।

আমাকে? আমাকে কেউ ফুল পাঠিয়েছে? আয়নার সম্মুখে পানি ছিটিয়ে নিজের চুলগুলো নেড়েচেড়ে দিলাম। সেদিনই প্রথম চোখে পড়ল। আসলেই তো। আমার চেহারা অত খারাপ না। গালের বাঁ পাশে হনুর একটা হাড় উঁচু হয়ে আছে। কয়েক দিন ভালোমতো খাওয়াদাওয়া করে দুপুরে ঘুমোলেই ঠিক হয়ে যাবে। আর দাঁতগুলো একটু হলুদ। রতনের দোকানের শিঙাড়া আর খাওয়া যাবে না। ওই শিঙাড়া খেয়েই এই অবস্থা। আমি সেই দিন প্রথমবারের মতো বিকেলে দাঁত মেজে ফেললাম।

পড়ার টেবিলে বসেও মনে শুধু সেসবই আসছে।

কে হতে পারে?

আমাদের ক্লাসের সানজিদা? সেদিন সে ক্লাসে আমার পাশে বসতে চেয়েছিল। কিন্তু আমি যে ওকে বলছিলাম, ‘সানজিদা আকতার, মাথা ভরা টাক তার।’

নাকি তিনা? এই মেয়েটা গত সপ্তাহে আমাকে একটা চকোলেট দিয়েছিল। আচ্ছা, ওপরের তলার শায়লা আপু নাকি? যদিও আমার চেয়ে উনি দুই বছরের বড়। কিন্তু দেখলে প্রায়ই তো আমার গাল টেনে দেয়।

রাতে খাওয়ার টেবিলে আব্বা একগাদা উপদেশ দিলেন। সব কিছুর বয়স আছে। প্রেম করারও। এখন পড়ালেখায়ই মন দেওয়া উচিত। নইলে পিঠের চামড়া খুলে ছাদে টানিয়ে রাখব।

আমি রান্নাঘরে আমাদের কাজের মেয়ে শেফালি থেকে এক টুকরো শসা নিয়ে আসলাম। চোখের নিচে হালকা একটা কালি জমে গেছে, ওটা ঠিক করতে হবে।

চোখের ওপরে দুই টুকরা শসা দিয়ে শুয়ে আছি, হঠাৎ ড্রয়িংরুমে কান্নার আওয়াজ শুনে দৌড়ে গেলাম। গিয়ে দেখি, আমাদের পাশের এলাকার রতন ভাই আর আমাদের কাজের মেয়ে শেফালি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। হু হু করে শেফালিই কাঁদছে।

‘তোরা একজন আরেকজনকে পছন্দ করোস সমস্যা নাই। খোলাখুলি বললেই হয়। রতন, তুই যে এইভাবে ঘরের সামনে ফুল দিয়ে গেছিস, এটা তো উচিত হয় নাই।’

‘আমি আসলে শেফালিরে প্রাইজ দিতে চাইছিলাম।’

‘প্রাইজ না...সারপ্রাইজ!’ রতনের ভুল শুধরে দিল আব্বা।

পুরো ব্যাপারটা আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল। চোখের ওপর এতক্ষণ যে শসা দিয়েছিলাম, সেটি হাতেই ছিল। মুখে ঢুকিয়ে চিবিয়ে খেয়ে ফেললাম। নিজেকে ছাগলের মতো লাগছিল, রামছাগল!


মন্তব্য