kalerkantho

সেদিনের কথা

মো. সাখাওয়াত হোসেন

২ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



সেদিনের কথা

আঁকা : মানব

চুলগুলো স্পাইক করে নিয়েছি, ক্লিন শেভ। সবচেয়ে সুন্দর টি-শার্টটি খুঁজতেছি পরার জন্য। আজকে সম্পাদকের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি। পত্রিকার সম্পাদক। আমি একজন কন্ট্রিবিউটর। যে পত্রিকায় কাজ করি, সেই পত্রিকার সম্পাদকের সঙ্গে আজ দেখা হবে। কালেভদ্রে আসে এমন সুযোগ। তিনটি লেখা রেডি ছিল। সবচেয়ে সুন্দর লেখাটি নিয়েছি। নাম ‘জং বাহাদুর’। একটি বানরের গল্প। আবার নাকি তিনটি চেক হয়েছে, ওগুলোও নিয়ে আসব। আহ! কী এক দিন!

চে গুয়েভারার ছবিসহ একটি টি-শার্ট ছিল, ওটা পরেই রওনা দিলাম। বাসে উঠে সিট পেয়ে গেলাম। একটু পর সুপারভাইজার এসে জিজ্ঞাসা করল, স্টুডেন্ট কে কে? আমি হাত তুলতে গিয়েও তুললাম না। আজকে আমি স্টুডেন্ট না। আমি  একজন কন্ট্রিবিউটর, আজ কোনো ফাইজলামি না। সুপারভাইজারের চিৎকারের সঙ্গে সঙ্গে দেখলাম, বেশ কয়েকজন হাত তুলে ফেলল। আমার পাশের এক আংকলও। আংকলের আইডি চেক করতে এলে দেখলাম তিনি এমবিএ করছেন, এক্সিকিউটিভ এমবিএ। কবিতার লাইন মনে পড়ে গেল। ‘বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর, সবার আমি ছাত্র।’

একটু পর এক দাদু উঠলেন বাসে। কোনো সিট না পেয়ে তিনি এক ইয়াং ছেলেকে বললেন, ‘এই যে, আমাকে একটু বসতে দাও তো। পায়ের প্রতিটি গিরায় গিরায় ব্যথা।’

ছেলেটি বয়স্ক লোকটিকে বসতে দিয়ে প্রশ্ন করল, ‘দাদু, আমাদের বয়সে থাকতে আপনিও কি বাসে বয়স্কদের বসতে দিতেন?’

‘হ্যাঁ, দিতাম। অবশ্যই দিতাম! তাঁদের বসতে দিয়ে আমি নিজে দাঁড়িয়ে থাকতাম।’

‘সে জন্যই তো আজ আপনার গিরায় গিরায় ব্যথা!’

সবাই হেসে উঠল। নির্দিষ্ট জায়গায় আসতেই বাস থেকে নেমে গেলাম। একটি পত্রিকার স্ট্যান্ডে দাঁড়ালাম। হু হু করে নতুন বছরের রাশিফলের ম্যাগাজিন বিক্রি হচ্ছে। আমি একটি হাতে নিলাম, উল্টেপাল্টে দেখার জন্য। বৃশ্চিকে এসে থামলাম। সেই একই লেখা, একই ভাষা। মনে হয়, গত বছরের লেখায় জাস্ট মলাট পরিবর্তন করেছে।

‘বছর শুভ। ভাগ্য খুলবে।’

আমি আমার স্যান্ডেলের দিকে তাকালাম। তলা খুলে এসেছে প্রায়। পাশে দুটি মেয়ে, দেখি ফ্যাশন ম্যাগাজিন নিয়ে কথা বলছে।

‘এই দেখ দেখ, এখানে লিখেছে চুলে পেঁয়াজের রস দিতে।’

‘আর পেঁয়াজের রস! আম্মা পেঁয়াজ সিন্দুকে তালা দিয়ে রেখেছে!’

কী অবস্থা দেশের! আমি আর মাথা ঘামালাম না এসব ব্যাপারে। হাঁটা ধরলাম, উদ্দেশ্য পত্রিকা অফিস।

অফিসের সামনে এসে চুল ঠিক করলাম। আহ, কী সুন্দর বিল্ডিং। ওই যে আমাদের পত্রিকার নাম বড় বড় করে লেখা। গর্বে বুকটা ফুলে উঠল। গেট দিয়ে ঢুকতে যেতেই দারোয়ান আটকালো।

‘কই যান?’

‘ভেতরে।’

‘ভেতরে কী?’

‘আমি কাজ করি এই পত্রিকায়।’

‘কার্ড কই?’

‘না মানে আমি কন্ট্রিবিউটর।’

‘কার আন্ডারে কাজ করেন তাঁকে কল দেন।’

আমি একপাশে সরে দাঁড়ালাম। রাশিফলের কথা মনে এলো। ‘ভাগ্য খুলছে।’

আমার লাইন বস মেহেদী ভাইকে কল দিলাম। তাঁর ছেলে ধরে খুব সুন্দর করে বলল, ‘আব্বু বাথরুমে, গোসল করছে।’

আমি ঘড়ির দিকে তাকালাম, ৫টা বাজছে। বন্ধ ঘড়ি। এবার মোবাইলে দেখলাম। সকাল সাড়ে ১০টা। সকাল সাড়ে ১০টায় গোসল করছে একজন। এই শীতকালে কেউ গোসল করে?

একটু পর আবার কল দিলাম।

ম্যাডাম ধরলেন। মেহেদী ভাইয়ের স্ত্রী।

‘মেহেদী ভাই আছে?’

‘ও তো বাথরুমে।’

‘জি, মানে এখনো?’

‘না, ছেলেকে গোসল করাচ্ছে।’

এই শীতে একটা বাচ্চা ছেলেকেও গোসল করাচ্ছে। মানবতা আজ কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে আমি দাঁড়িয়ে আছি ষণ্ডামার্কা দারোয়ানের সামনে। সে আমাকে কোনা চোখে দেখছে। আমি তাকে কোনা চোখে দেখছি। পড়ে না চোখের পলক। তার পাশে আরেক সেন্ট্রি পেপারে কী একটা লেখা পড়ে হো হো করে হাসছে। উঁকি মেরে দেখি, আরে এ তো আমারই লেখা! গত সপ্তাহে ছাপা। একবার ভাবলাম—বলি, এটা আমার লেখা। পরে বললাম না। কন্ট্রিবিউটরদের বেশি কথা বলতে নেই।

কল এলো। অবশেষে মেহেদী ভাই।

দারোয়ানকে ধরিয়ে দিলাম। এরপর ঢোকার সময় সে আমার ফুলে থাকা পকেটের দিকে ইশারা করল।

‘কী এখানে?’

‘জং বাহাদুর!’

‘কী?’ খেঁকিয়ে উঠল গুঁফো দারোয়ান।

‘না, মানে লেখা।’

লিফট দিয়ে ওঠার সময় আয়নায় দেখে নিলাম চেহারা।

মূল অফিসে ঢুকে সম্পাদকের রুম কোনটা জিজ্ঞাসা করাতে দারোয়ান বলল, ‘কী কাজ?’

আরে এ দেখি সূর্যের চেয়ে বালি গরম।

‘কী কাজ মানে? লেখা নিয়ে এসেছি।’

‘কোন পাতা?’

আরে ভাবসাব। প্রশ্নের কী বাহার! 

‘ঘোড়ার ডিম!’ অনেক কষ্টে রাগ চেপে বললাম।

‘আরে ঘোড়ার ডিমের লেখা স্যার এখন দেখবে না। ব্যস্ত আছে। আপনি মেহেদী ভাইয়ের টেবিলে গিয়ে বসেন।’

হায়রে জীবন। একটু পরেই মেহেদী ভাই এলেন।

তাঁর টেবিলের সামনে বসে বললাম, ‘ভাই, এই যে লেখা। সম্পাদকের সঙ্গে দেখা করা যাবে না?’

‘না রে ভাই, তিনি ব্যস্ত আছেন। লেখা মজা করে দিছেন তো?’

‘জি, ভাই। মজা করেই দিছি। একটি বানর নিয়ে লিখেছি।’ সম্পাদকের দারোয়ান পাশেই দাঁড়ানো ছিল, ওই দিকে তাকিয়ে বললাম—‘ভাই, আমার চেক হইছে না?’

‘তিনটি চেক তো হইছে শুনলাম। যান অ্যাকাউন্টসে গিয়ে খবর নেন।’

তিনটি চেক। একটি এক হাজার করে হলেও তিন হাজার টাকা। সামনেই বইমেলা। টাকা রেখে দিতে হবে। অ্যাকাউন্টস ডিপার্টমেন্টে গিয়ে চেকের কথা জিজ্ঞাসা করতেই জানাল, ‘সবার চেক তিনটি করেই হইছে। কিন্তু শেষ মাসে আপনার লেখা ছিল না। দুটি চেক। একটি ৮০০ টাকা, আরেকটি ৬০০। মোট এক হাজার ৪০০ টাকা। ধরেন, সাইন করেন এখানে।’

এক হাজার ৪০০ টাকার চেক নিয়ে লিফট থেকে নামার সময় আয়নার দিকে তাকিয়ে নামতে নামতে হোঁচট খেয়ে স্যান্ডেলের পুরো তলা খুলে রাশিফল অক্ষরে অক্ষরে ফলে গেল।

‘বছর শুভ।

ভাগ্য খুলবে।’


মন্তব্য