kalerkantho


এক নিরীহ ব্যাচেলর ছেলের গল্প

ফখরুল ইসলাম

২ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



এক নিরীহ ব্যাচেলর ছেলের গল্প

আঁকা : মানব

বিচারসভা বসেছে। বাড়িওয়ালা আংকল এলাকার কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তিকে ডেকে এনেছেন। তাঁরা এই বিচারসভার বিচারক। রুমের মধ্যে থমথমে নীরবতা। সেই নীরবতা ভেঙে একসময় বাড়িওয়ালা আংকল দাঁড়িয়ে সবার উদ্দেশে বললেন, ‘ভাই সব, আমি চিটিংবাজির শিকার। আমাকে আপনারা সবাই রক্ষা করুন। এই ছেলেকে এক্ষুনি আমার বাসা থেকে বের করে দিন। ঘরে আমার একটি না, দুটি না, তিনটি না...পাঁচ-পাঁচটি আবিয়াতো মাইয়া...।’

বাড়িওয়ালা আংকল তাঁর কথা শেষ করতে পারলেন না। তার আগেই মুরব্বিদের একজন তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘তোমার এসব কথা তো আগেই শুনেছি আক্কাস। এবার যার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ, সেই ছেলের কাছ থেকে ঘটনাটা শুনি। বাবা, তোমার কী বলার আছে, বলো।’

‘গত পড়শু দিনের ঘটনা। বাইরে টুলেট দেখে আক্কাস কাকার বাসায় বেল বাজাতেই কাকা বেরিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন, কী চাই? আমি বললাম, আমার দুটি রুম দরকার। বাইরে টুলেট দেখলাম, তাই বেল বাজিয়েছি। আক্কাস কাকা বললেন, তার আগে বলো তুমি ব্যাচেলর না ফ্যামিলি? আমরা আবার ব্যাচেলর ভাড়া দিই না। যা সত্যি আমি তা-ই বললাম, আমি ফ্যামিলি। শুনে তিনি খুশি হলেন। তারপর ভাড়ার পরিমাণ ঠিক করে এক বছরের ভাড়া চুক্তি করলাম। সব শেষে এক হাজার টাকা অ্যাডভান্স দিয়ে আমি চলে গেলাম। আজ এক তারিখ, তাই আমি মালপত্র নিয়ে আক্কাস কাকার বাড়িতে যেই এসেছি, তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমার বউ কই? তাঁর কথা শুনে আমি বললাম, বউ পাবো কোথায় আংকল, আমি তো বিয়েই করিনি। তিনি বললেন, বউ পাবো কই মানে? তুমি না বললে যে তুমি ফ্যামিলি। বিয়ে না করলে তুমি ফ্যামিলি হলে কিভাবে? সেই থেকে আক্কাস আংকল চেঁচিয়ে বলে যাচ্ছেন, আমি নাকি তাঁর সঙ্গে চিটিংবাজি করেছি। অথচ আমি তাঁকে কোনো মিথ্যা কথা বলিনি। আমার নাম ফ্যামিলি মিয়া। এই দেখেন, আমার ন্যাশনাল আইডি কার্ড। তাতে আমার নাম লেখা আছে।’

বিচারকরা এবার একটু নড়েচড়ে উঠলেন। তারপর ফ্যামিলি মিয়ার আইডি কার্ডটা নেড়েচেড়ে দেখে বললেন, ‘আক্কাস, আমার মনে হয় এই ছেলে নির্দোষ। তুমি ওকে যা জিজ্ঞেস করেছ, সে তার জবাব দিয়েছে। তুমি জানতে চেয়েছ, সে ব্যাচেলর না ফ্যামিলি। তার নাম ফ্যামিলি বলে সে ফ্যামিলি জবাব দিয়েছে। এমতাবস্থায় একটি নির্দোষ ছেলেকে বাসা থেকে তাড়িয়ে দেওয়াটা ঠিক হবে না। তুমি বরং ওকে চুক্তি মোতাবেক এক বছর থাকতে দাও। এক বছর পর সে চলে যাবে।’

বিচারকদের কথা শুনে আক্কাস আংকলের মাথায় যেন বাজ পড়ল। তিনি বললেন, ‘তার মানে আপনারা বলতে চাচ্ছেন, সে থাকবে?’

বিচারক বললেন, ‘জি, সেটাই আমাদের সিদ্ধান্ত।’

এই ঘটনার পর আমি সেই বাড়িতে থাকার অনুমতি পেয়ে গেলাম। এবার আমার নামের গোপন রহস্য বলি। আমার আগে নাম ছিল চিমশা খান। এসএসসি পাসের পর ভালো কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য যখন ঢাকায় এলাম, তখন থাকার জন্য কোনো জায়গা পাচ্ছিলাম না। কেউ আমাকে বাসা ভাড়া দিতে রাজি হচ্ছিল না। সবাই আক্কাস আংকলের মতো জিজ্ঞেস করে, আমি ব্যাচেলর না ফ্যামিলি। যখন বলি আমি ব্যাচেলর, তখন সবাই মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দেয়। একসময় সিদ্ধান্ত নিলাম, যা হওয়ার হবে, আর ব্যাচেলর থাকব না। এবার বাবার কাছে বিয়ে করার কথা তুলব।

সিদ্ধান্ত মোতাবেক বিয়ের আলাপ তুলতেই বাবা রেগে বাসা থেকে বের করে দিলেন। ভাড়া বাসা পেতে গিয়ে নিজের আসল বাসা হারালাম। উঠলাম এক বন্ধুর বাসায়। এক দিন-দুদিন করে টানা তিন মাস সে বাসায় থেকে নিজেই লজ্জায় পড়ে গেলাম। মনে মনে ভাবলাম, এভাবে বন্ধুর ঘাড়ে বোঝা হয়ে থাকাটা ঠিক নয়। চলে যাওয়াই ভালো। কিন্তু কোথায় যাব। আমার তো যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। কী করা যায়, তা নিয়ে ভাবলাম। ভেবে ভেবে একসময় বুদ্ধি পেয়ে গেলাম। নাম পাল্টাতে হবে। চিমশা খান দিয়ে চলবে না। এমন নাম রাখতে হবে, যা শুনে বাড়িওয়ালারা বাসা ভাড়া দিতে আপত্তি না করে। অগত্যা অ্যাফিডেভিট করে নামটাই বদল করে ফেললাম। চিমশা খান থেকে হয়ে গেলাম ফ্যামিলি মিয়া।

বিচারকদের কাছে নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার পরও আক্কাস আংকল আমাকে ক্ষমা করতে পারলেন না। তবে কিছুদিনের মধ্যে ভালো ব্যবহার করে আমি তাঁর মন জয় করে নিলাম। এখন তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক ভালো। তবে সম্পর্ক ভালো হলেও তিনি বাসায় আমাকে থাকতে দিতে রাজি না। নতুন বাসা খোঁজার জন্য সব সময় তাগিদ দিতে থাকেন। তিনি আমাকে বোঝান, ফ্যামিলি বাবা, আমার বাসা ছেড়ে দেওয়ার পর যেখানেই যাবে, তাকে তোমার নামের ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলবে। তা না হলে সবাই আমার মতো ভুল বুঝবে এবং তোমাকে ভর্ত্সনা করবে।

দেখতে দেখতে চুক্তির এক বছর শেষ হয়ে এলো। আক্কাস আংকলের কথামতো আমি সবাইকে আমার নামের মাহাত্ম্য বুঝিয়ে বলে বাসা ভাড়া চাইলাম। স্বাভাবিকভাবে ব্যাচেলর বলে কেউ বাসা ভাড়া দিল না। আক্কাস আংকলকে এই পরিস্থিতি জানিয়ে আরো এক মাস তাঁর বাসায় থাকার অনুমতি চাইলাম। তিনি অনুমতি দিলেন। একই অজুহাতে তার পরের মাস থাকলাম। তার পরের মাসও থাকলাম। এভাবে মাসের পর মাস যেতে লাগল।

ঠিক চার বছর তিন মাস পর একদিন আক্কাস আংকল আমার রুমে এসে বিরক্ত মুখে বললেন, তোর অত্যাচার আর ভালো লাগে না রে ফ্যামিলি। আমি এই সমস্যার একটা সমাধান চাই। যা, তোর বাবাকে ডাক দে। আমার ছোট কন্যা ছেতারা বেগমের সঙ্গে তোর নিকাহর ব্যবস্থা করে চিরতরে তোকে আসল ফ্যামিলির মালিক করে দিই।

তার পরেই আক্কাস আংকল আমার আব্বিজান হয়ে গেলেন। এখনো আমি সেই বাড়িতেই আছি। তবে আগের সেদিনের সঙ্গে এখনকার পার্থক্য হলো, এখন কেউ আমাকে আর বাসা ছেড়ে যেতে বলে না।


মন্তব্য