kalerkantho


বাবার দরবারে ছামাদ আলী

মেহেদী আল মাহমুদ

২ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



বাবার দরবারে ছামাদ আলী

আঁকা : মাসুম

ছামাদ আলী দাঁড়িয়ে আছেন জটাধারী আয়না বাবার আখড়ায়। হাতে একটা দড়ি। সেই দড়ির অন্যপ্রান্তে একটা ছাগল বাঁধা। দেশি ব্ল্যাকবেঙ্গল ছাগল না, রাজস্থানের ন্যাড়া মুণ্ডু জাতের ছাগল। এ ধরনের ছাগলের মাথায় শিং নেই বলে নাম ন্যাড়া মুণ্ডু। ছামাদ এসেছেন আয়না বাবার খেদমতে ন্যাড়া মুণ্ডুকে পেশ করতে। লোকমুখে শুনেছেন, আয়না বাবাকে ছাগল দিলে বিনিময়ে বাবা মন্ত্র পাঠ করে স্পেশাল আমিত্তি দেন। সেই আমিত্তি ব্যবহার করলে দিলের পেরেশানি দূর হয়। ছামাদ আলী কয়েক দিন ধরে ব্যাপক পেরেশানির মধ্যে আছেন। আয়না বাবার কাছে এসেছেন পেরেশানি থেকে মুক্তি পেতে।

বাবার চেম্বারের সামনে দীর্ঘ লাইন। ন্যাড়া মুণ্ডুকে নিয়ে এক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়ানোর পর চেম্বারে ঢোকার সুযোগ পেলেন। এক কোনায় মাদুর পাতা। তার ওপর চোখ বন্ধ করে ধ্যানে মগ্ন বাবা। ছামাদ আলী হাতের ছাগলটা বাবার কদম মোবারকে পেশ করে বললেন, ‘কয়েক দিন যাবৎ দিলছে পেরেশান আছি বাবা...।’

কথা শেষ করার আগেই হাত তুলে ছামাদ আলীকে থামিয়ে দিলেন বাবা। তারপর ছাগলের দিকে ইশারা করে বললেন, ‘...আগে তোর ছাগল সামলা। দেখোস না, আমার পরনের লুঙ্গি চাবানি শুরু করছে?’

আয়না বাবার কথায় ব্যাপারটা নজরে পড়ল ছামাদের। রাজস্থানি ন্যাড়া মুণ্ডু বাবার লুঙ্গি খাওয়া শুরু করেছে। হেঁচকা টানে ছাগলের মুখ থেকে লুঙ্গির কোনাটা ছাড়িয়ে বাবার হাতে তুলে দিতে দিতে ছামাদ বললেন, ‘গুস্তাখি মাফ হয় আয়না বাবা। আপনার ধ্যানের ব্যাপারটা নাদান ছাগল মালুম করবার পারে নাই।’

আয়না বাবা বিরক্তির সুরে বললেন, ‘ভুখা ছাগলের এই এক সমস্যা। খাওনের আইটেম নিয়া বাছবিচার করে না। যা সামনে পায়, তা-ই খায়। যাক সেসব, তোর পেরেশানি কী নিয়া?’

ছামাদ আলী এবার মনের তকলিফ খুলে বলার সুযোগ পেলেন, ‘বাবা অন্তর্যামী। তার পরও যখন জানতে চেয়েছেন তখন বলি, আমাদের মহল্লার সুনাম আলীর কন্যা বেলী বেগমকে আমার অনেক দিন থেকেই পছন্দ। বেশ কয়েকবার গোলাপকলি পাঠিয়েও কন্যার কাছ থেকে পজিটিভ রেজাল্ট পাই নাই, বাবা। তাই বলছিলাম কি, একটা ‘বশীকরণ আমিত্তি’ যদি দিতেন, তাহলে বেলী বেগমকে খাইয়ে তার মনটা বশ করতাম।’

বেলী বেগমের নাম শুনে আয়না বাবার মনটা কেমন যেন আনচান করে উঠল। আখড়ায় বসে আশেকানদের সমস্যার সমাধান করতে করতে কখন যে জীবনের ৩৮টা বছর পেরিয়ে গেছে, টেরই পাননি। মনে মনে ভাবলেন, ‘এই যে এত সুনাম, এত টাকা-পয়সা, আশেকানদের দেওয়া শত শত গরু-ছাগল—এসব কে খাবে? বিয়ে একটা না করলে আর চলছেই না।’

জটাধারী আয়না বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ছামাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ঘটনা কিলিয়ার বুঝতে পারছি। এই সব তদ্বিরে কন্যার ছবি লাগে। সঙ্গে বেলী বেগমের ছবি আছে?’

ছবির কথা শুনে ছামাদ মিয়া লজ্জা পেলেন। তাঁর কাছে বেলী বেগমের ছবি আছে। এলাকায় যে স্টুডিওতে বেলী বেগম ছবি তোলে, সেই স্টুডিওর ম্যানেজারকে ১০০ টাকা ঘুষ দিয়ে এক কপি ছবি জোগাড় করেছেন। দেরি না করে বুকপকেট থেকে সেই ছবি বের করে বাবার হাতে দিয়ে বললেন, ‘ছবি আছে, বাবা...এই নেন।’

বেলী বেগমের ছবি দেখে জটাধারী আয়না বাবার বুকটা সত্যি সত্যি হাহাকার করে উঠল। কী দারুণ দেখতে! চোখ দুটো টানা টানা! দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে ভাবলেন, ‘এমন একটা বিবি তো আমার ঘরেও থাকতে পারত। দুনিয়াবি ধনদৌলত কালেকশন করতে গিয়ে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ অবহেলাই করে ফেললাম।’

আয়না বাবা ছামাদ আলীর দিকে তাকালেন, ‘বালিকার বাহ্যিক সৌন্দর্য বড়ই মনোহর। এমন সুশ্রী বালিকা বশীকরণ সহজ বিষয় না। এ ধরনের তদ্বির করতে হলে আগে বালিকার মোবাইল নম্বর লাগবে।’

বেলী বেগমের মোবাইল নম্বর চাইতে দেখে ছামাদ মিয়া একটু অবাকই হলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘বাবা, গুস্তাখি মাফ হয়, মোবাইল নম্বর দিয়ে কী করবেন?’

আয়না বাবা চোখ বন্ধ করে বললেন, ‘আধুনিক যুগে বশীকরণ তদ্বিরের জন্য নানা জিনিস লাগে। এত সব তোর না জানলেও চলবে। তুই নম্বর দে।’

ছামাদ আলী ঝামেলায় জড়ালেন না। বেলী বেগমের নম্বর দিলেন। নম্বর পেয়ে আয়না বাবা ছামাদ মিয়াকে বললেন, ‘অনেক শক্ত তদ্বির। সময় বেশি লাগবে। তুই বাড়ি চলে যা। ঠিক দুই মাস পরে আবার দেখা করবি। কামিয়াবি দূরে না।’

আখড়ার খাদেমের হাতে ন্যাড়া মুণ্ডুকে দিয়ে ছামাদ আলী নিশ্চিন্ত মনে বাড়ি ফিরে এলেন।

দেড় মাস পরের কথা। ছামাদ আলী হঠাৎ একদিন জানতে পারলেন, বেলী বেগমের বিয়ে হয়ে গেছে। ভালোবাসায় ব্যর্থ হয়ে মনের দুঃখে তিন দিন ঘর থেকেই বেরোলেন না। একসময় তাঁর মনে পড়ল জটাধারী আয়না বাবার কথা। ভাবলেন, ‘আয়না বাবা আসলে ভুয়া। ১০ হাজার টাকা দামের ছাগলটা বৃথাই গেল।’ তাই বলে ছামাদ আলীও ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নন। ছাগল উদ্ধারে তৎক্ষণাৎ আয়না বাবার আখড়ায় হাজির হলেন।

আজ আখড়ার গেট বন্ধ। ছামাদ আলী ভেতরে উঁকি দিতেই এক খাদেম এসে বলল, ‘বাবা হানিমুনে ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপে গেছেন। সে জন্য আখড়া এক মাস বন্ধ। পরে আসেন।’

ছামাদ অবাক, ‘বাবা বিয়ে করেছেন! কবে? কোথায়?’

খাদেম বললেন, ‘গত সপ্তাহেই করেছেন। কন্যা মিরপুর মল্লিকা আবাসিকে থাকে।’

ছামাদ অবাক হলেন। বেলীদের বাসাও মল্লিকায়। ওর বিয়েও গত সপ্তাহে হয়েছে। তিনি ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কন্যার নাম কি বেলী?’

খাদেম হ্যাঁসূচক মাথা নাড়লেন। সেটি দেখে ছামাদ আলীর মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল।


মন্তব্য