kalerkantho


মহব্বত খানের মহাসমস্যা

মোস্তাক শরীফ

২ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



মহব্বত খানের মহাসমস্যা

মহব্বত খানের সমস্যা হচ্ছে, কেউ তাঁকে সিরিয়াসলি নেয় না। অথচ লোক তিনি একেবারে হেঁজিপেঁজি নন। তাঁর দাদার বাবা খানসাহেব আলী রেজা খানের দাপটে বাঘে-ছাগলে তো ব্যাপারই না, পারলে নাকি বাঘ আর মুরগি একই ঘাটে পানি খেত। তাঁর দাদা নেজাফত খানও ছিলেন ডাকসাইটে দারোগা—রিটায়ারমেন্টের পরও নাকি খাকি পোশাক পরে ঘুরে বেড়াতেন; যদিও দুর্মুখরা বলে, মাথায় কিঞ্চিৎ সমস্যা দেখা দেওয়ার কারণেই এই হাল! তো এ ধরনের মারাত্মক ফ্যামিলি থেকে আসা সত্ত্বেও মহব্বত খানকে সিরিয়াসলি নেওয়া হয় না। এর কারণ যে কী, তা নিয়ে তিনি ছোটবেলা থেকেই গবেষণা করছেন, এখনো সন্তোষজনক কোনো উপসংহারে পৌঁছতে পারেননি। চেহারা-সুরতে বাপ-দাদার মতো না হলেও দৈর্ঘ্য-প্রস্থ আর চেহারায় একেবারে ফেলে দেওয়ার মতো নন মহব্বত খান। মোটামুটি ভালো চাকরি করেন, বিয়েও করেছেন বনেদি পরিবারে—তার পরও ঘরে-বাইরে কেউই তাঁকে গুরুত্ব দেয় না।

একবার সদরঘাটে গেছেন তিনি এক সহকর্মীর সঙ্গে। তো এক দোকানির সঙ্গে সেই সহকর্মীর নটঘট বেঁধে গেল। কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে মহব্বত খানের মনে হলো, তাঁর একটু হস্তক্ষেপ করা দরকার। তিনি সহকর্মীকে একপাশে ডেকে নিচু গলায় বললেন, ‘অসুবিধা নেই, আমাকে সামলাতে দিন।’

‘আপনি সামলাবেন? কিভাবে?’

মহব্বত খান সমঝদারের হাসি দিলেন। ‘বেয়াদব লোকজনকে সোজা করতে আমার দু-চার মিনিটের মতো সময় লাগে। সাধারণত প্রথম মিনিটেই প্যান্ট নষ্ট করে ফেলে তারা।’

সহকর্মীটি একটু সহজ-সরল। বললেন, ‘প্যান্ট নষ্ট করে ফেলে মানে?’

‘মানে টয়লেট সেরে ফেলে। যা-ই হোক, পরবর্তী মিনিটে সাধারণত হাত-পা ধরে মাফ চায়।’

সহকর্মী পুরোপুুরি ইমপ্রেসড। মহব্বত খান দোকানদারের দিকে ফিরে যতটুকু সম্ভব রাশভারি চেহারা করে জলদগম্ভীর গলায় বললেন, ‘আপনি একজন স্কাউন্ড্রেল, এটা জানেন?’

দোকানি নির্বিকার গলায় তাঁকে বলল—‘ওই মিয়া, বাইরে যাইয়া কোঁতান গা।’

‘মানে?’

‘ওই রমজান, এই হালাগো গলায় গামছা দিয়া বাইর কইরা দে তো, বিজনেসে ঝামেলা হইতাছে।’

অত্যন্ত অপ্রীতিকর চেহারার একটি লোক দরজার পাশে টুলে বসে ঝিমাচ্ছিল, তাকে লাল লাল চোখে তাঁদের দিকে তাঁকাতে দেখেই বোঝা গেল, তারই নাম রমজান। সহকর্মী মহব্বত খানের হাত ধরে বললেন, ‘ভাই, চলেন আমরা যাই।’ মহব্বত খান সিরিয়াসনেস বোঝানোর জন্য বললেন, ‘আরেকটা মিনিট সময় দেন, দেখেন কী করি।’

‘ভাই, আর দেখার দরকার নেই।’ বলতে বলতে তাঁকে টেনে বাইরে নিয়ে এলেন। রমজানের ভাবগতি তাঁর তো বটেই, মহব্বত খানেরও খুব একটা পছন্দ হচ্ছিল না।

বাইরের লোকজন যা-ই করুক, ঘরের লোকও যদি একটু সিরিয়াসলি নিত, তাহলেও হতো। দুর্ভাগ্যক্রমে তা-ও হয় না। মাঝেমধ্যে নাশতার টেবিলে ভার্সিটিপড়ুয়া ছেলের সঙ্গে তাঁর স্ত্রী যখন এটা-সেটা আলাপ করেন, মহব্বত খানও তখন গুরুত্বপূর্ণ মতামত দেওয়ার চেষ্টা করেন। তাঁর স্ত্রী তখন চোখ গরম করে বলেন, ‘আমরা একটা সিরিয়াস ব্যাপারে আলাপ করছি।’

মহব্বত খান আহত গলায় বলেন, ‘আমি কি আনসিরিয়াস কথা বললাম নাকি?’

স্ত্রী তখন চোখ দুটি ঘুরিয়ে এমন একটি ভঙ্গি করেন যে আর কিছু বলার রুচি হয় না মহব্বত খানের। ছেলের চেহারা দেখেও মনে হয় না, সে বিশ্বাস করে তার বাবার পক্ষে সিরিয়াস কিছু বলা সম্ভব।

তিনি ভেবেছিলেন, বাকি জীবনটা বুঝি এ রকম আনসিরিয়াস ভাবমূর্তি নিয়েই কাটাতে হবে তাঁকে; কিন্তু দুটি ছোট ঘটনা সব কিছু ভোজবাজির মতো পাল্টে দিল। একদিন পাশের টেবিলের সহকর্মী মুশফিক সাহেব গদগদভাবে বললেন—‘মহব্বত ভাই, আপনি কিভাবে জানতেন বলেন তো?’

‘কী জানতাম?’ ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন মহব্বত খান।

‘এই যে আমার মেয়ের সঙ্গে ওই ছেলেটার বিয়ে দিতে নিষেধ করলেন। আজ সকালে পত্রিকায় দেখলাম, ছেলেটা স্মাগলার। পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে।’

মহব্বত খানের মনে পড়ল, মুশফিক সাহেবের মেয়ের হবু বরের ছবি দেখে তিনি বলেছিলেন, বিয়েটা না হলেই ভালো হয়। বিশেষ কিছু ভেবে নয়, ছেলেটার ইঁদুরের মতো কুঁতকুঁতে চোখ দেখেই কথাটা বলেছিলেন। মুশফিক সাহেব তখন বেশ রেগেছিলেন। বাঁকা বাঁকা কথাও শুনিয়েছিলেন। এখন দেখা যাচ্ছে, ঝড়ে বক মরেছে! চেহারা থেকে আত্মতৃপ্তির ভাবটা গোপন করার চেষ্টা করতে করতে মনে মনে হাসলেন মহব্বত খান। ঠিক তার পরদিন আরেক ঘটনা। ছেলে ভার্সিটি যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছিল, মহব্বত খান কিছু না ভেবেই বললেন, ‘প্রতিদিন বাইক নিয়ে ভার্সিটি যাওয়ার কী দরকার? আজকে রিকশায় যা।’ ছেলে যথারীতি চাঁছাছোলা ভাষায় কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, মহব্বত খানের স্ত্রী (জীবনে এই প্রথমবার) স্বামীর পক্ষ নিয়ে বললেন, ‘ঠিকই তো, কী হয় এক দিন রিকশায় গেলে?’

মায়ের কথার অবাধ্য হওয়ার সাহস ছেলের নেই। সে গোমড়া মুখ করে বাইক ছাড়াই বেরিয়ে গেল। বিকেলে অফিস থেকে ফিরে ব্যাগটাও রাখতে পারেননি, এমন সময় ছেলে এসে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে ফেলল। মহব্বত খান এতই অবাক হলেন যে তাঁর কথা বন্ধ হয়ে গেল। ছেলে উচ্ছ্বসিত গলায় বলল, ‘বাবা, তুমি কিভাবে জানতে আজ আমাদের ভার্সিটির সামনে থেকে বাইক চুরি হবে?’

‘হয়েছে নাকি?’ জিজ্ঞেস করলেন মহব্বত খান।

‘আরে হ্যাঁ। আমার বন্ধু সজল আর রক্সির বাইক দুটি চুরি করে নিয়ে গেছে, আমারটা থাকলে নির্ঘাত ওটাও যেত। আহারে, আমার কত শখের বাইক! কিভাবে জানতে তুমি, বলো! তোমার মধ্যে অবশ্যই কিছু একটা আছে...’

তার পর থেকে ঘরে-বাইরে মহব্বত খানের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়ে গেল। ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখল অবশ্য ভাগ্য। আরো দু-একবার ঝড়ে বক মরল, আর মহব্বত খানের কেরামতিও বাড়ল। ক্রমে লোকজন তাঁকে এত বেশি সিরিয়াসলি নেওয়া শুরু করল যে তিনি অস্বস্তি বোধ করতে শুরু করলেন। প্রতিদিন সকালে ছেলে, বউ থেকে শুরু করে অফিসের সহকর্মীরা নানা বিষয়ে পরামর্শ নেওয়া শুরু করল। পরামর্শ দিতে দিতে মহব্বত খানের অবস্থা কাহিল হয়ে গেল। তিতিবিরক্ত হয়ে তিনি ব্যাপক আনসিরিয়াস আচরণ শুরু করে দিলেন। তাতেও লাভ হলো না। তাঁর অতি হালকা কথাকেও প্রচুর গুরুত্ব দিয়ে মানতে শুরু করল মানুষজন। অবস্থা একেবারেই আয়ত্তের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে মানুষের হাতে-পায়ে ধরে মাফ চাইলেন তিনি, পাগলামির ভান করলেন। এতে হিতে বিপরীত হলো। সবাই ভাবল, তিনি আধ্যাত্মিক ক্ষমতার অধিকারী, ফলে পরামর্শপ্রার্থীদের ভক্তি আরো বাড়ল। শেষে একদিন এক গুরুর কাছে গিয়ে হাজির হলেন মহব্বত খান। গলায় মালা দিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে আছেন গুরুবাবা, এক চোখ খুলে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী চাস?’

‘বাবা আমি আনসিরিয়াস হতে চাই। কেউ যেন আমার কথাকে গুরুত্ব না দেয়।’

গুরুবাবা দুই চোখ খুলে ফেললেন। ‘কেন, গুরুত্ব দিলে সমস্যা কী?’

তাঁর সমস্যার কথা খুলে বললেন মহব্বত খান। গুরুবাবার চেহারা দেখে মনে হলো, তিনি ইমপ্রেসড। বললেন, ‘তোর কথা ফলে যায়?’

‘মাঝেমধ্যে ফলে, মাঝেমধ্যে ফলে না। তবু মানুষ বিশ্বাস করে।’ এই বলে গুরুর চাপাচাপিতে নিজের কথা মিলে যাওয়ার কয়েকটা নমুনা উল্লেখ করলেন মহব্বত খান। শুনেই খপ করে তাঁর হাত চেপে ধরলেন গুরু। ‘তোকেই তো খুঁজছিলাম রে পাগলা। আমার কোনো কথাই ফলে না। এ জন্য ব্যবসাটা খুবই খারাপ যাচ্ছে। মাসের খরচ তোলাই মুশকিল। আমাকে তুই উদ্ধার কর, বাবা।’ এই বলে মহব্বত খানের পা চেপে ধরলেন গুরু। গুরুর বজ্রমুষ্টি থেকে নিজেকে উদ্ধার করতে প্রচুর টানাহেঁচড়া করতে হলো মহব্বত খানকে। তারপর সেই রাতে জীবনের সবচেয়ে বড় পরামর্শটা তিনি দিলেন নিজেকে, আর সেটা হলো বোবা হয়ে যাওয়া। পরদিন থেকেই পুরোপুরি বোবা হয়ে গেলেন তিনি। মানুষের হাজার অনুরোধেও মুখ খুললেন না। তখন তাঁর নাম হয়ে গেল ‘বোবাবাবা’। ভক্তরা বলল, আপনি শুধু আঙুলের ইশারা দেন বাবা, তাতেই কাজ হয়ে যাবে। কিন্তু মহব্বত খান তা-ও করেন না। তবু প্রতিদিন তাঁর বাসায় ভিড় জমায় প্রচুর মানুষ, একটুখানি ইশারার আশায়।


মন্তব্য