kalerkantho

লেডি ডাক্তার

ইমন চৌধুরী

২ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



লেডি ডাক্তার

আঁকা : মানব

রুমে প্রবেশ করতেই আমার চোখ পড়ে বিছানায় শুয়ে থাকা নিলু ভাইয়ের ওপর। বেচারা তিন দিনের জ্বরে শুকিয়ে বোম্বে সিনেমার নায়িকাদের মতো স্লিম হয়ে গেছেন। আমাকে দেখেই কাতর গলায় বললেন, ‘হ্যাঁ রে, জ্বর তো কিছুতেই ছাড়ছে না। অন্য কিছু না তো?’

‘হলেও হতে পারে!’ নির্বিকার কণ্ঠে জবাব দিই আমি।

‘মানে?’

‘মানে আর কী! টাইফয়েড, ডেঙ্গু বা ম্যালেরিয়াও হতে পারে।’

‘কী যা-তা বলছিস!’ আমার কথা শুনে ১০২ ডিগ্রি জ্বর নিয়েও লাফিয়ে ওঠেন নিলু ভাই।

‘এতে ঘাবড়ানোর কী আছে? এসব এমন কঠিন কোনো রোগ না। আজকাল এসব হলে কেউ মরে না।’

আমার কথা শুনে নিলু ভাই যে খুব আশ্বস্ত হলেন, সেটা জোর দিয়ে বলা মুশকিল। মুখ বেজার করে বললেন, ‘সামান্য রোগ থেকে অনেক সময় কত কিছু হয়ে যায়। চল, ডাক্তারের কাছেই যাই।’

অগত্যা চতুর্থ দিনও যখন নিলু ভাইয়ের জ্বর ছাড়ার নাম নেই, তখন ডাক্তারের কাছেই গেলাম। বাসা থেকে বড় কাকি হাজার দুয়েক টাকা আমার হাতে গুঁজে দিয়ে হুকুম করলেন যেন ভালো ডাক্তার দেখাই। বড় কাকি চোখের আড়াল হতেই টাকাটা আমার কাছে থেকে ছিনতাইকারীর মতো ছোঁ মেরে ছিনিয়ে নিলেন নিলু ভাই। সেটা দেখে তাঁকে নিয়ে আমার ভেতর যে দুশ্চিন্তাটুকু ছিল, মুহূর্তেই তা হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। রোগীর হুঁশ-জ্ঞান দেখছি সব ঠিকই আছে।

আমাদের রিকশা একটা লেডি ডাক্তারের সাইনবোর্ড অতিক্রম করতেই হৈহৈ করে রিকশা থামালেন নিলু ভাই।

‘কী ব্যাপার, এখানে থামালে কেন?’

‘চল, এই ডাক্তারকে দেখাই। মহিলা ডাক্তার—এঁরা খুব নরম স্বভাবের হয়। বেশ যত্ন করে রোগী দেখে।’

‘অ’। নিলু ভাইয়ের চেহারায় আমি একটুখানি আনন্দের ঝিলিক টের পেলাম। আমার ভেতরটাও যেন কেমন করে উঠল। সাদা ড্রেস পরা, গলায় স্টেথেস্কোপ ঝোলানো রূপবতী এক তরুণী ডাক্তারের ছবি মনে মনে আঁকতে শুরু করলাম। ডাক্তারের বয়স আশা করি একুশের বেশি হবে না। হওয়া উচিতও না। একুশের আগে একটা মেয়ের পক্ষে কী করে কমপ্লিট ডাক্তার হওয়া সম্ভব, এটাও একটা ভাবনার বিষয়।

সে যা-ই হোক, ডাক্তারের চেম্বারে ঢোকার আগে নিচের এক চায়ের দোকানে ডাক্তার সম্পর্কে জিজ্ঞাস করতেই লোকটা একগাল হেসে বললেন, ‘ডাক্তার ভালাই, তয় একটু পাগলা কিসিমের!’

হোক! মেয়েদের এক-আধটু পাগলামি, খুনসুটি—এসব ভালোই লাগে। অবশেষে ডাক্তারের চেম্বারে ঢুকতেই আমাদের দুজনের মুখটা তিতা করলার মতো কুঁচকে গেল। ভদ্রমহিলার বয়স চল্লিশ পেরিয়ে পঞ্চাশের ঘরে উঁকিঝুঁকি মারছে। চোখেমুখে রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে তিনি বসে আছেন তাঁর চেম্বারে।

আমাদের দেখেই বাজখাঁই গলায় প্রশ্ন হাঁকালেন, ‘রোগী কে?’

‘জি, মানে উনি।’ ঘাবড়ে গিয়ে নিলু ভাইকে দেখিয়ে দিই আমি।

‘উনি রোগী হলে আপনি কে?’

‘না, মানে আমি ওনার কাজিন। সঙ্গে এসেছি।’

‘উনি কি বিছানায় হিশু করেন?’

‘জি!’

‘এই বয়সেও বিছানায় হিশু করে! কী বলেন! তাহলে রোগী নিয়ে এখনই বেরিয়ে যান। আমি এ রোগী দেখব না।’

‘না, না। আমি তা বলিনি।’ সঙ্গে সঙ্গে জিবে কামড় দিই আমি। নিলু ভাই ভয়ানক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন আমার দিকে।

‘তাহলে কী বলেছেন?’ ফের ধমকে উঠে বললেন লেডি ডাক্তার।

‘না, মানে আমি আসলে আপনার প্রশ্ন শুনে কিছুই বুঝতে পারছি না! এত বড় রোগী বিছানায় হিশু করবেন কেন! তাই প্রশ্নটা শুনে কিছুটা অবাক হয়েছি।’

‘রোগী বিছানায় হিশু করে না। আশা করি, রোগী ফিডারও খায় না। তার মানে রোগী শিশু না। সুতরাং রোগীর সঙ্গে আপনার থাকার দরকার নেই। যান, রুম থেকে বেরিয়ে যান। রোগীর সঙ্গে বাড়তি লোকজন আমার পছন্দ না।’ এবার রীতিমতো হুংকার দিয়ে ওঠেন লেডি ডাক্তার।

আমি রুম থেকে বের হতে ঘুরে দাঁড়াই। বেচারা নিলু ভাই অসহায় দৃষ্টিতে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন আমার দিকে। ডাক্তার নয়, মনে হচ্ছে ভুল করে বাঘের খাঁচায় ঢুকে পড়েছি।

‘থাক, কোথাও যেতে হবে না—চুপচাপ এখানে বসেন।’ আমি রুম থেকে প্রায় বের হয়ে পড়েছি, ঠিক সেই মুহূর্তে ফের হুংকার ছাড়লেন লেডি ডাক্তার। তা শুনে আমার পা স্থির হয়ে যায়। বলা যায় না, লেডি ডাক্তারের যা মেজাজ-মর্জি দেখছি, তাতে তাঁর হুংকার শোনার পরও পা চালালে ভদ্রমহিলা গুলি চালিয়ে বসতে পারেন। এ ধরনের বদরাগী মহিলার কাছে পিস্তল থাকাও বিচিত্র কিছু না। আমি গুটি গুটি পায়ে নিলু ভাইয়ের পাশের চেয়ারে গিয়ে বসি।

‘আচ্ছা, বলুন তো আমি কয় দিক সামলাব। সংসার দেখব, না রোগী? মেয়ের একটা গাড়ি দরকার, সেটাও আমাকে দেখতে হবে। আপনাদের দুলাভাইয়ের কথা বলছি। একটা অমানুষ! আমার জীবনটা পুড়িয়ে খেল।’ বলতে বলতে খপ করে নিলু ভাইয়ের ডান হাতটা চেপে ধরলেন।

‘আমাদের দুলাভাই মানে?’ মুখ ফসকে কথাটা বেরিয়ে গেল আমার।

‘আমার হাজব্যান্ডের কথা বলছি।’ প্রশ্নের উত্তর দিলেন লেডি ডাক্তার। সেই সঙ্গে নিলু ভাইয়ের হাতটা ছেড়ে কাগজে কী যেন লিখলেন।

‘ওই চিজটা আবার আমাদের দুলাভাই হলো কবে?’ প্রশ্নটা এবার মনে মনেই করি।

‘কাজের মেয়েটার বিয়ের বয়স হয়েছে। প্রতিদিন বলছি, অথচ আজ পর্যন্ত একটা পাত্র খুঁজে বের করতে পারল না। বুঝুন, কেমন মানুষের সঙ্গে সংসার করছি। আপনাদের বলেই বা লাভ কী! আপনারাও তো পুরুষ মানুষ। সব কয়টাকে আমার চেনা আছে। সমস্যাটা কী?’

‘ওনার চার দিন ধরে জ্বর।’ আমি নিলু ভাইকে দেখিয়ে দিই।

‘আমি আপনার সমস্যার কথা জিজ্ঞাস করছি। খাওয়াদাওয়া ঠিকমতো হয় বলে তো মনে হচ্ছে না। দেখে তো মনে হচ্ছে একদম রুচি নেই মুখে।’

‘ম্যাডাম, রোগী আমি না—উনি। আমার কোনো সমস্যা নেই।’

‘ডাক্তার কে—আমি না আপনি?’ আবারও মুখ ঝামটা মেরে বললেন লেডি ডাক্তার।

‘জি, আপনি।’

‘তাহলে রোগী কে, সেটাও নিশ্চয়ই আমি ঠিক করব। দেখি, জিব বের করুন।’

কী মুশকিল! আমি জিব বের করব কেন? এ তো দেখছি ভালোই যন্ত্রণার মধ্যে পড়লাম।

‘কী হলো, জিব বের করতে বললাম না!’ আমাকে মুখ বেজার করে বসে থাকতে দেখে রীতিমতো অধৈর্য হয়ে ওঠেন ভদ্রমহিলা। ভদ্রমহিলাই বা বলছি কোন আক্কেলে! ভদ্রতার কোনো বালাই থাকলে তো! এমন জাঁদরেল মহিলা আমার দাদার জন্মেও দেখিনি।

অগত্যা জিব বের করলাম। অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে, তাতে আপসে বের না করলে ভদ্রমহিলা মনে হচ্ছে আমার জিবটা টেনেই বের করবেন। প্রায় মিনিট দশেক আমাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলেন।

সব শেষে লেডি ডাক্তারের চেম্বার থেকে যখন বের হলাম, তখন রোগী নিলু ভাই হয়ে গেলেন সম্পূর্ণ সুস্থ। লেডি ডাক্তার বলে দিয়েছেন, সামান্য ভাইরাস জ্বর তাঁর শরীরে আছে বৈকি, তবে সেটাও দু-এক দিনের মধ্যে সেরে যাবে। ওদিকে আমার হাতে তখন তিন-চার রকমের টেস্ট রিকোয়েস্ট স্লিপ আর ব্যবস্থাপত্র। আমি নাকি জন্ডিসের রোগী। লেডি ডাক্তারের অন্তত তা-ই ধারণা!

আঁকা : বিপ্লব



মন্তব্য