kalerkantho


স্টুডেন্ট বিড়ম্বনা

আদিত্য রহিম

১৮ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০



স্টুডেন্ট বিড়ম্বনা

ছাত্রী : স্যার, আপনি শহীদ কাপুরকে খুব পছন্দ করেন?

‘শহীদ কাপুর কে?’ বলে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালাম সদ্য পড়ানো শুরু করা ছাত্রীর দিকে।

‘স্যার, বলিউডের শহীদ কাপুরকে চেনেন না?’ এলিয়েন দেখার মতো আমার দিকে তাকিয়ে বলল ছাত্রীটি।

: কেন, না চিনলে কি জীবনের ষোলো আনাই বৃথা?

— ইশ কী ভাব, চিনে না কাউরে! আবার মোবাইলে ওয়াল পেপার দিয়ে রাখে তার ছবি!

: ওয়াল পেপার মানে?

— না, কিছু না, স্যার। নগদে পণ্য ক্রয় বুঝলাম, এটা লেনদেন। এটার হিসাব সমীকরণের প্রভাবটা বলেন।

: ওয়েট ওয়েট! ওয়ান মিনিট! কার ছবি ওয়ালপেপার  দিয়েছি?

— না, মানে আপনি শহীদ কাপুরকে চেনেন না; কিন্তু তাঁর ফটো আপনার সেলফোনে ঠিকই ওয়ালপেপার দিয়ে রেখেছেন, সেটাই বলছিলাম।

: ফানি গার্ল! দেট ওয়াজ মাই পিক!

— স্যার, আই কান্ট বিলিভ দিস! আপনি ভেবেছেন আমি দেখিনি! আপনি কল রিসিভের পর ফোন লক করার সময়ই এক ঝলক দেখে ফেলেছি আপনার ওয়ালপেপার হিসেবে ওর ফটো। এখন বলতে লজ্জা পাচ্ছেন, তাই না? সাহস থাকলে বের করেন আপনার সেলফোন!

‘ওকে, দেখ ভালো করে, গাধা মেয়ে। ’ উপায় নাই দেখে মনে মনে কথাটা বলে সেলফোন বের করে দেখালাম।

— স্যার, সত্যি বলছি, ফটোতে আপনাকে শহীদ কাপুরের মতো লাগছে।

আমি তো খুশিতে গদগদ, কিন্তু মুখে উপহাসের ভাব নিয়ে বললাম, ‘ছি,  তুমি আমাকে বলিউডের নায়কের সঙ্গে তুলনা করো? তুমি জানো, তোমার চেয়ে এক বছরের সিনিয়র যে মেয়েটাকে পড়াই, সে আমার এ ফটো দেখে বলেছে যে আমাকে নাকি এনরিক ইগলিয়াসিসের মতো লাগছে!’

— স্যার, আমি তো এনরিক ইগলিয়াসিসকে চিনি না! আচ্ছা, স্যার, আমার চাচাতো বোনকে পড়াতে পারবেন?

: কিসে পড়ে?

— আমাদের সঙ্গেই ফার্স্ট ইয়ারে।

: হুম, পারব।

— স্যার, ওর একটা প্রবলেম আছে। ও আগের চারটা টিচার চেঞ্জ করেছে?

: কেন, কী প্রবলেম? টিচাররা লুল টাইপ ছিল নাকি?

— না, সেই টিচারদের চেহারা সুন্দর না। আমি শিওর, আপনাকে পছন্দ করবে।

: ও।

— স্যার, আপনার ফটোটা আমাকে শেয়ারইট করেন, ওকে দেখাব।

: সরি, আমি ফটো দেখাইয়া কোনো পোলাপাইন পড়াই না।

— দেন না স্যার! দেন না প্লিজ!

: ন্যাকামি করবা না আমার সঙ্গে। থাপড়ায়ে চেহারার ক্যাচিং চেঞ্জ করে দেব। এ জন্যই মেয়ে স্টুডেন্ট পড়াতে চাই না।

‘ওকে স্যার, আপনাকে চার-পাঁচ হাজার টাকার টিউশনি ম্যানেজ করে দিতাম, না নিলে আর কী করার আছে!’ ভাব মেরে স্টুডেন্টের প্রত্যুত্তর।

: আমার এসব টিউশনি লাগবে না।

পড়ানো শেষে যখন বের হব, তখন সে বলে—‘স্যার, একটু দাঁড়ান। ’

এর পরই ভেতরের রুমে গিয়ে তার বাবার উঝখজ নিয়ে এসে আমার অনুমতি ছাড়াই তিন-চারটি ফটো তুলে নেয়।

আর বলে—ওকে এগুলোই দেখাব।

আমি ভাব নিয়ে বললাম, ‘ফটো কাউকে দেখানোর দরকার নেই, দেখাইলে মাইর খাবা। ’

কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমি খুব খুশি। আরেকটা টিউশনি মানে আরো চার হাজার টাকা! এত টাকা দিয়ে আমি কী করব? হেহ হে—জীবনে তো প্রেম করতে পারলাম না, কী মজা! সরাসরি বিয়ে করে ফেলতে পারব! নিজে আলাদা বাসা না নিতে পারলেও সাবলেট বাসায় নতুন বউ নিয়ে ওঠা যাবে। অ্যাটলিস্ট হলের ডাইনিংয়ের ফালতু মানের রান্না খেতে হবে না। বউ রান্না করে আমার জন্য ওয়েট করবে। আমি স্টুডেন্ট পড়িয়ে আসব। তারপর একসঙ্গে খাব দুজন। ও একবার আমাকে খাওয়াবে, আমি একবার ওকে খাওয়াব। ওহ নো, আমি আর ভাবতে পারছি না। আরে, আমি যে চোখে দেখছি না। আরে দেখব কেমনে...আবেগে যে কাইন্দালছি!

এক দিন পর আবার পড়াতে গেলাম। পড়ানো শেষ কিন্তু তার সেই বান্ধবীকে পড়ানোর প্রসঙ্গে কিছু বলছে না। অগত্যা আমি স্টুডেন্টকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘তোমার বান্ধবী কী বলল?’

— কোন বান্ধবী?

: ওই যে তোমার যে বান্ধবী পড়তে চাইল আমার কাছে?

— ওহ ও! সে তো আমার চাচাতো বোন। স্যার, আপনাকে ওর পছন্দ হয়নি।

আমি তালগাছ থেকে পড়ার ভাব নিয়ে বললাম, ‘কেন?’

— আপনি নাকি বেশি ফর্সা। ওর আবার ফর্সা ছেলে পছন্দ না।

: সত্যি করে বলো তো—ওর টিচার দরকার না বয়ফ্রেন্ড?

— আমি জানি না। স্যার, ও পড়তেছে না, এইটাই ভালো হইছে। ওর রেকর্ড জানেন?

: না জানি না। কী রেকর্ড?

— স্যার, ও আগের এক টিচারকে বলেছে, ‘স্যার, আপনার চেহারা দেখলে আমার বমি আসে। কাল থেকে আপনি আর আইসেন না। ’

: বলো কী, এত রেসিস্ট মেয়ে!

- স্যার, জানেন না, ও আরেক টিচারের হাতে কলম ঢুকিয়ে দিয়েছে।

: নিশ্চয়ই ওই টিচার বেহায়াপনা করেছে।

— না, স্যার, ও পড়া পারেনি বলে স্কেল দিয়ে হালকা মাথায় মেরেছিল। তাই ও স্যারের হাতে কলম মেরে দিয়েছে।

: বাব্বা, এ তো ডেঞ্জারাস ও বেয়াদব মেয়ে! তুমি জেনেশুনে আমাকে বাঘের মুখে দিতে চেয়েছ! ছি, এটা ঠিক না।

আরো কিছুক্ষন পড়িয়ে নাশতা শেষে রাস্তায় বের হয়ে এলাম। কিন্তু আমার এখন কী হবে? আমার আর বিয়ে করে সাবলেট থাকা হলো না। আরে রাস্তাগুলো এত ঝাপসা হয়ে আসছে কেন? চোখে মনে হয় কিছু একটা পড়েছে। কেমন জানি জল জল ভাব করছে।


মন্তব্য