kalerkantho


ভিক্ষা ১০ ভ্যাট ১৫

ধ্রুব নীল

২০ জুন, ২০১৭ ০০:০০



ভিক্ষা ১০ ভ্যাট ১৫

সকাল সকাল মেজাজ তুঙ্গে বল্টু মিয়ার। এমনিতে বিশাল বপুর কারণে তাকে সহজে কেউ ভিক্ষা দিতে চায় না।

লোকজন মানিব্যাগে হাত দেয় ঠিকই। পরেই আবার বল্টু মিয়ার পেটের দিকে তাকিয়ে ব্যাগটা পকেটে ঢোকায়। অথচ তারা এটা বুঝল না যে তার বিশাল শরীরটার জন্য ভিক্ষার পরিমাণটাও লাগে বেশি। তার ওপর আবার সকালেই এমন একটা ঘটনা। মানুষ আজকাল বড় অবিবেচক! ভিক্ষার সরঞ্জাম নিয়ে পার্কের একটা জায়গায় বসে বল্টু মিয়া। কিন্তু আজ বেঞ্চের তলায় সযত্নে রাখা ইসিআর মেশিনখানা (ইলেকট্রনিক ক্যাশ রেজিস্টার) তুলে আনার পরই মেজাজ খারাপ হয় তার। বেঞ্চের ওপর এক সুন্দরী বসা। দেখেই বল্টু মিয়া গলা যথাসম্ভব সরু করে বলল, ‘কী গো সুন্দরী, অমন গোমরা মুখে বসে আছো কেন গো?’ ভিক্ষুকের মুখে এমন কথা শুনে মেয়ের চোখ মাথার তালুতে উঠে গেল। বলল, ‘তোর সাহস তো কম না, তুই আমাকে ওগো ওগো করে বলছিস! ব্যাটা ফকির!’ এক পা-ওয়ালা বল্টু মিয়া গলাটাকে যথাসম্ভব তারাসপ্তকে চড়িয়ে ভেংচি কেটে বলল, ‘অ্যাঁ..! আপনি আমার বিছানায় বসে পা দোলাবেন, আর আপনাকে একটু ওগো হ্যাঁগো বলতে পারব না? এখানে যে বসছেন, ভ্যাট দিসেন?’

দিনের শুরুটা তিক্ত হলেও ধীরে ধীরে মেজাজ মধু হতে থাকে বল্টু মিয়ার।

প্রথম কিছুদিন ঝামেলা হলেও লোকজন এখন ভ্যাটসহ ভিক্ষা দিচ্ছে। মনে মনে আবারও জাবর কাটে, ‘আহা সরকার! কী দারুণ সরকার!’ দাবিটা মেনে নেওয়া হয়েছিল গত সপ্তাহেই। ন্যূনতম ভিক্ষা ১০ টাকা। ভিক্ষুক ফেডারেশনের সাবেক সভাপতি হিসেবে বল্টু মিয়া নিজেই আগ বাড়িয়ে বলেছিলেন, ‘কুনু সমস্যা নাই, ভিক্ষা ১০ টেকা ধাইর্য কইরা দেন। বেশিও না কমও না। দরকার হয় আমরা ১৫ টেকা ভ্যাট দিমু। ’ আয়ের চেয়ে বেশি ভ্যাট দিতে রাজি হয়েছে দেখে বল্টু মিয়াকে নির্দিষ্ট দপ্তর থেকে ‘করের অতিবাহাদুর’ খেতাব দেওয়ার কথা চিন্তা করা হয়। পরে ফেডারেশনের মধ্যে দুয়েকজন পড়াশোনা জানা ভিক্ষুক ক্যালকুলেটর চেপে জানান দিল যে এতে করে তাদের লস হয়ে যাবে। পরে বল্টু মিয়ার ১৫ টেকা হয়ে যায় ১৫ পারসেন্ট। খেতাব না জুটলেও বিনা মূল্যে একটা ইসিআর মেশিন পায় সে। রিসিপ্ট কাটতে সুবিধা হবে। অবশ্য ভ্যাট চালানের রসিদ বইটা নিজের খরচেই ছাপতে হয়েছে তাকে।

 

সেই অর্জনের কথা মনে পড়লে এখনো তৃপ্তির ঢেকুর তোলে বল্টু মিয়া। এদিক-ওদিক তাকায়। পাশেই তার মতো আরেকজন বসেছে মেশিন নিয়ে। তবে চিকনাচাকনা লোকটা ভিক্ষুক নয়। মেশিনটা ওজন মাপার। বল্টু মিয়ার শখ হলো নিজের ওজন দেখবে। মেশিনের ওপর কোনোমতে বসতেই লোকটা বলল, আপনে তো ওজনদার ফকির দেখতেসি। ওজন আসছে একশত তিন কেজি পাঁচশ গ্রাম। চমকে উঠল বল্টু মিয়া, ‘কও কী! গত সপ্তাহে দেখলাম নব্বুই কেজি! এত বাড়ল কেমনে!’ চিকন লোকটা নিরাসক্ত ভাব নিয়ে বলল, ‘১৫% ভ্যাট যোগ কইরা কইসি। আপনার ওজনের একটা মূল্য আছে না! ওইটার ভ্যাট কেডা দিব!’

বল্টু মিয়া রাগ করতে গিয়েও পারল না। রাগ জল হয়ে গেল। পকেটে পয়সা থাকুক না থাকুক, ঘরে খাবার থাকুক না থাকুক, তার একটা ওজন আছে, সেই ওজনে ভ্যাট অবশ্যই প্রযোজ্য।

দুপুরের আগেই ভিক্ষার থালা কানায় কানায় ভর্তি। ভ্যাটসহ ভিক্ষা দিচ্ছে অনেকেই। রিসিপ্ট কাটতে কাটতে আঙুল ব্যথা। ভাগ্য ভালো যে ভিক্ষাদাতাদের সুবিধার কথা ভেবে আগেভাগেই ভাংতি পঞ্চাশ পয়সার বন্দোবস্ত করে রেখেছিল বল্টু মিয়া। কিন্তু খটকা তার কাটে না। লোকজন তাকে এত ভিক্ষা দিচ্ছে কেন? শেষে একজনের কাছে হাসিমুখে জানতে চাইল, ‘বাই... আমার এত মোডা শইল, তার পরও ভ্যাটসহ ভিক্ষা দিতেসেন, কারবারডা কী!’ বিরস মুখে দাঁতমুখ খিঁচিয়ে লোকটা জবাব দিল, ‘তোমার সমস্যাটা কি শুনি! আমি ভ্যাট দেওয়ার জন্য ভিক্ষা দিতেসি। তোমার সমস্যা আছে?’ আরেকজনকে জিজ্ঞেস করতেই সে কাঁচুমাচু করে বলল, ‘বউ আমাকে প্রায়ই ভিতু বলে। শুনলাম বেশি বেশি ভ্যাট আর কর দিলে বাহাদুর খেতাব পাওয়া যায়। বাহাদুরিত্বের জন্য একটা সরকারি সার্টিফিকেট পেলে বউকে দেখাতাম। ইয়ে মানে তুমি আবার ঘটনা ফাঁস করে দিও না। ’

বল্টু মিয়ার মেজাজ এখন ফুরফুরা। ১৫ পারসেন্ট ভ্যাট তার জন্য আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে মুখে পাতলা গোঁফওয়ালা ধুরন্ধর কিসিমের এক লোক এসে ১২ টাকা ভিক্ষা দিতে চায়। ভ্যাটসহ আসে তের টাকা আশি পয়সা। বিশ পয়সা ভাংতি নাই। তাই ১৩ টাকাই রাখে বল্টু মিয়া। রিসিপ্ট কাটার সময় খানিকটা খটকা লাগলেও বিশেষ পাত্তা দেয় না। লোকটা বোধ হয় একটু বেশিই দেশপ্রেমিক। সরকারের ইনকাম বাড়ানোর জন্য একটু বেশি ভ্যাট দিয়ে গেল।

কয়েক দিন পেরোতেই বিপদ টের পেল বল্টু। মহাবিপদ। সরকার নির্ধারিত ভিক্ষা ১০ টাকার বদলে ১২ টাকা নেওয়ায় তার বিরুদ্ধে দাতা অধিকার আইনে মামলা হয়েছে। শক্ত মামলা। ইসিআর—এর রিসিপ্টও আছে প্রমাণ হিসেবে। লোকটাকে আগেই ধুরন্ধর মনে হয়েছিল তার। জরিমানার অঙ্ক শুনে বল্টু মিয়ার বিশাল পেটে শক্ত মোচড় দিয়ে উঠল। নগদ দশ হাজার টাকা প্লাস ভ্যাট!


মন্তব্য