kalerkantho

লাইফ সাপোর্টে রাফি

►ফেনীতে গ্রেপ্তার আরো ৭ ►ভাইয়ের মামলায় বোরকা চশমা হাতমোজা-পা মোজা পরিহিত অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিরা আসামি

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফেনী ও সোনাগাজী প্রতিনিধি   

৯ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



লাইফ সাপোর্টে রাফি

প্রায় সারা শরীরে আগুনের ক্ষত নিয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের লাইফ সাপোর্টে থাকা ফেনীর মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে সিঙ্গাপুরে পাঠাতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দুর্বৃত্তের আগুনে জীবন সংকটে থাকা রাফির বিদেশে চিকিৎসার ব্যয়ভার সরকার বহন করবে।

এদিকে গতকাল সোমবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে নুসরাতকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়ার পর হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন সাংবাদিকদের জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ পাওয়ার পর সিঙ্গাপুরে তার চিকিৎসার কাগজপত্র পাঠানো হয়েছে। তারা রেসপন্স করলে দ্রুত তাকে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হবে।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট সূত্রে জানা গেছে, রাফির অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় তার ‘ডাইং ডিক্লারেশন’ (মৃত্যুশয্যায় দেওয়া বক্তব্য) নেওয়া হয়েছে। রাফি বলেছেন, নেকাব, বোরকা ও হাতমোজা পরা চারজন তার গায় আগুন ধরিয়ে দেয়। ওই চারজনের একজনের নাম ছিল শম্পা। প্রসঙ্গত, সংকটাপন্ন রোগীদের কাছ থেকে এ ধরনের বক্তব্য নেওয়া হয়ে থাকে, যা পরবর্তী সময়ে আদালতে সাক্ষ্য হিসেবে পেশ করা হয়। 

রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় তার ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বাদী হয়ে মামলা করেছেন। গতকাল তাঁর স্বাক্ষরিত এজাহার সোনাগাজী থানায় পাঠানো হয় এবং মামলাটি রেকর্ড করা হয়। পুলিশ জানায়, মামলায় চারজন বোরকা, চশমা, হাতমোজা-পা মোজা পরা অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি ও তাদের কিছু অজ্ঞাতনামা সহযোগীকে আসামি করা হয়। মামলার আসামি হিসেবে কারো নাম সরাসরি উল্লেখ না করা হলেও গত ২৭ মার্চ রাফির শ্লীলতাহানির ঘটনায় মামলা দায়েরের পর নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, জাভেদ ও মহিউদ্দিন শাকিল নামে চার যুবক নানাভাবে রাফির মা শিরিন আক্তারকে হুমকি দেয় বলে উল্লেখ করা হয়। 

ওই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ গত রবিবার গভীর রাতে ও গতকাল আরো পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে। এরা হলো মাদরাসার সাবেক ছাত্র ও অধ্যক্ষ মুক্তি আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া সাইফুল ইসলাম, আলাউদ্দিন, জসিম উদ্দিন, মাদরাসার অফিস সহকারী নুরুল আমিন ও দারোয়ান মো. মোস্তাফা। এদের মধ্যে মোস্তফাকে গত শনিবার আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দিয়েছিল পুলিশ। গতকাল তাকে দ্বিতীয়বারের মতো গ্রেপ্তার করা হয়। এ ছাড়া শনিবার আটক মাদরাসা শিক্ষক নুরুল আফসার ও আলীম পরীক্ষার্থী আরিফুর রহমানকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে গতকাল আদালতের মাধ্যমে জেলে পাঠানো হয় বলে জানান সোনাগাজী থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন।

গতকাল দুপুরে রাফির বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে করা যৌন হয়রানির মামলাটি তুলে নিতে চার মাদরাসা ছাত্র হুমকি দিয়ে আসছিল। এই ছাত্ররা অধ্যক্ষের কাছে থেকে নিয়মিত অর্থ নিয়ে মাদরাসায় নানা অপকর্ম করে বেড়ায়। এক কথায় এরা প্রিন্সিপালের পেটোয়া বাহিনী। পুলিশ তাদের ধরলেই তার বোনের শরীরে আগুন দেওয়ার আসল রহস্য বের হয়ে আসবে।’  তিনি আরো বলেন, ‘আমার বোনের শরীরে আগুন দেওয়ার ঘটনায় শাম্মী ওরফে চম্পা নামে এক শিক্ষার্থীও জড়িত থাকতে পারে। সে মাদরাসার আশপাশে কোনো একটি ছাত্রী হোস্টেলে থাকে।’ নোমান বলেন, ‘সকালে আমি আইসিইউতে গিয়ে বোনের সঙ্গে কথা বলেছি। সে বলেছে, আমি হয়তো বাঁচব না, তবে প্রিন্সিপাল যেন পার না পায়। আমার শরীরে যারা আগুন দিয়েছে তাদের যেন বিচার হয়।’

গতকাল বিকেলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক দগ্ধ ছাত্রীকে দেখতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে যান। এ সময়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী সব সময়ে নুসরাতের খোঁজখবর রাখছেন। তিনি তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।’

এর আগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিশেষ সহকারী ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়াও বার্ন ইউনিটে গিয়ে নুসরাতের চিকিৎসার ব্যাপারের প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার কথা চিকিৎসকদের জানান।

গতকাল নুসরাতের শরীরে এক দফা অস্ত্রোপচারের কথা থাকলেও তার শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়ায় তাকে অপারেশন থিয়েটারে না নিয়ে লাইফ সাপোর্ট দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, ‘নুসরাতের অবস্থার অবনতি ঘটেছে। এ জন্য সকাল সাড়ে ১১টার দিকে আমরা লাইফ সাপোর্টে দেই।’

চার মাদরাসাছাত্রকে সন্দেহ করছে নুসরাতের পরিবার

রাফির ভাই নোমান বলেন, ‘বোরকা পরে মেয়ে সেজে চার মাদরাসাছাত্র এই কাজ করেছে। আমার বোন ঘটনার পর মুখোশ ও বোরকা পরা চারজনের কথাই বারবার বলছে।’ তিনি বলেন, যৌন হয়রানির মামলা হওয়ার পর থেকে সোনাগাজী পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার মাকসুদ মেয়রের পক্ষে এই মাদরাসাছাত্রদের নিয়ে মানববন্দন মিছিল করেছিলেন। এই কমিশনারও প্রিন্সিপালের পক্ষ নিয়ে মামলা তুলে নিতে বারবার চাপ দিয়েছে। তবে ৭ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার শেখ মামুন অধ্যক্ষের বিচারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের নিয়ে মানববন্ধন করেছেন। এ নিয়ে দুই কমিশনারের মধ্যে ২৭ মার্চ হাতাহাতিও হয়।

বার্ন ইউনিটের সামনে মেয়ের জন্য দিন-রাত কান্নাকাটি করছেন নুসরাতের বাবা, কোম্পানীগঞ্জের একটি মাদরাসার শিক্ষক এ কে এম মানিক। গতকাল বিকেলে বার্ন ইউনিটের সামনে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার মেয়েকে যারা আগুন দিয়েছে আমি তাদের গ্রেপ্তার ও বিচার চাই।’

মাঠে পিবিআই-পুলিশের একাধিক টিম

এ জঘন্য ঘটনায় জড়িত সব ব্যক্তিকে ধরতে মাঠে তৎপর রয়েছে পিবিআইসহ (পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনস) পুলিশের একাধিক দল। গতকাল সোনাগাজী থানা পুলিশের একটি দল ও ফেনী পিবিআইয়ের একটি দল সোনাগাজীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালায়। সোনাগাজী থানার ওসি বলেন, ‘জড়িতদের ধরতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে।’ ফেনী পিবিআইয়ের একটি সূত্র জানায়, গোপনে পাওয়া খবরের ভিত্তিতে একজন অন্যতম প্রধান সন্দেহভাজনকে ধরতে অভিযান চালানো হচ্ছে।

ফেনীতে মানববন্ধন

নৃশংস ওই ঘটনার প্রতিবাদ ও জড়িতদের গ্রেপ্তার দাবিতে ফেনীতে মানববন্ধন করা হয়েছে। ‘সৃষ্টি হিউম্যান রাইটস সোসাইটি’ নামের একটি সংগঠন গতকাল বিকেলে ফেনী প্রেস ক্লাবের সামনে এ মানববন্ধন করে। এতে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আফজাল হোসেন রাসেল, সহসভাপতি আবুল কাশেম বক্তব্য দেন।

আরো তথ্য চেয়েছে সিঙ্গাপুর হাসপাতাল

শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, ‘অগ্নিদগ্ধ ছাত্রীর ব্যাপারে পাঠানো চিঠির উত্তরে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে আরো তথ্য চেয়েছে। এ ধরনের রোগীকে সাধারণত গ্রহণ করতে চান না সিঙ্গাপুর বার্নের চিকিৎসকরা। এর আগে প্রায় একই ধরনের দুজন দগ্ধ রোগীকে সিঙ্গাপুরে পাঠানো যায়নি।’

পুলিশের পর চিকিৎসকদের কাছে নুসরাতের জবানবন্দি

নুসরাত জাহান রাফি পুলিশের পর চিকিৎসকদের কাছেও ঘটনার বিষয়ে জবানবন্দি দিয়েছে। গতকাল সোমবার লাইফ সাপোর্টে যাওয়ার আগে চিকিৎসকদের কাছে দ্বিতীয় দফা জবানবন্দি দেয় এই শিক্ষার্থী। নুসরাত পুলিশ ও চিকিৎসকদের কাছে একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছে।

 

মন্তব্য