kalerkantho

ভুল কৌশলে বিফল বিপুল বিনিয়োগ

পার্থ সারথি দাস   

৮ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ভুল কৌশলে বিফল বিপুল বিনিয়োগ

পরিকল্পনা অনুসারে প্রকল্প ও কর্মসূচি সময়মতো বাস্তবায়িত না হওয়া, ছোট গাড়ির নিয়ন্ত্রণহীন নিবন্ধন দেওয়া এবং সড়কে শৃঙ্খলার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা বাস্তবায়িত না হওয়ায় ঢাকা অচলপ্রায়। বিশ্বব্যাংকের এক সমীক্ষা মতে, ২০০৪ সালে ঢাকায় গাড়ি চলাচলের গড় গতি ছিল ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার; ২০১৮ সালে তা নেমে আসে সাত কিলোমিটারে।

স্বাভাবিকভাবে ২৫ মিনিটে অতিক্রম করা যায় এমন দূরত্বের কোনো গন্তব্যে পৌঁছাতে কোথায় কত সময় লাগে তার ভিত্তিতে সময় অপচয় উপসূচক নির্ধারণ করেছে আন্তর্জাতিক বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান নামবিও। এতে দেখা যায়, ঢাকায় কোনো গন্তব্যে পৌঁছাতে ২৫ মিনিটের দূরত্ব অতিক্রম করতে গড়ে লাগে ৬৩ মিনিট। ঢাকায় যানজটের প্রধান কারণ হিসেবে প্রাইভেট কার বা ব্যক্তিগত গাড়ির আধিক্যকে চিহ্নিত করেছে নামবিও। রাজধানীর ২৬ শতাংশ সড়ক ব্যবহার করছে ব্যক্তিগত গাড়ি। এগুলোয় গড়ে দেড়জন করে যাতায়াত করে। ৪৯ শতাংশ সড়ক ব্যবহার করে বাস, যেগুলোয় গড়ে ৫০ জন করে যাতায়াত করে।

গবেষকরা বলছেন, সময়মতো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হওয়া এবং অনেক ক্ষেত্রে উল্টো পরিকল্পনায় এমন দুরবস্থা হয়েছে ঢাকার। নামবিওর গত ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশ করা ট্রাফিক ইনডেক্স অনুযায়ী, বিশ্বের ২০৭টি শহরের মধ্যে যানজটে শীর্ষে আছে ঢাকা। একই সংস্থার হিসাবে, আগের দুই বছর শীর্ষ স্থানে ছিল ভারতের কলকাতা, দ্বিতীয় স্থানে ঢাকা। ২০১৬ ও ২০১৫ সালে ঢাকার অবস্থান ছিল যথাক্রমে তৃতীয় ও অষ্টম। অথচ সরকারি হিসাবে, গত ১০ বছরে ঢাকার যানজট নিরসনে বড় উদ্যোগের অংশ হিসেবে ৪৩ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। গবেষকরা বলছেন, বিপুল অর্থ ব্যয়ে চলমান মেগাপ্রকল্পগুলোর চেয়ে কম্পানিভিত্তিক বাস সার্ভিস চালু করতে পারলে যানজট নিরসনে অনেক বেশি সুফল মিলত।

বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেও সুফল না মেলার কারণ জানতে চাইলে ঢাকার কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (এসটিপি) প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত গবেষক ড. সালেহউদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এসটিপি প্রণয়ন করা হয়েছিল ২০০৪ সাল থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের জন্য। তাতে প্রাধিকার সুপারিশ ছিল—ঢাকার ফুটপাত যাত্রীবান্ধব করা, ৫০টি সংযোগ সড়ক তৈরি করা, কম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনা করা। এগুলো সময়মতো হয়নি। তবে কম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনার জন্য আমরা এখন কাজ করছি।’ তিনি আরো বলেন, বাস ব্যবহার করে ৬৫ শতাংশ যাত্রী। কিন্তু তারা পর্যাপ্ত বাহন না পেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মোটরসাইকেল ও লেগুনায় উঠতে বাধ্য হচ্ছে।

বুয়েটের অধ্যাপক ড. সামছুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঢাকায় বাসে চড়ে বেশির ভাগ যাত্রী। সড়কে যানজট নিরসনসহ শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য এসটিপিতে ১৪ বছর আগে কম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনার সুপারিশ করা হয়েছিল। এটি ছিল অগ্রাধিকার সুপারিশ। তা কার্যকর হয়নি। অথচ অনেক বড় বড় প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, অর্থের অপচয় হয়েছে; সুফল আসেনি। যখন যা করা উচিত তা না করে আমরা এমন পথে চলছি যাতে এ ঢাকাকে আর বাঁচানো যাবে না। কোনো রকমে শ্বাস নিচ্ছে এ মহানগরী। আমি বলব, ফ্লাইওভারের চেয়েও জরুরি ছিল বাস খাত সংস্কারের সুপারিশ বাস্তবায়ন করা।’

ড. সামছুল হক আরো বলেন, সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন না হলে ব্যয় বাড়ে। গাড়ি ও জনসংখ্যার সঙ্গে সংগতি রেখে যে বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থাপনা থাকতে হয়, ঢাকায় তা নেই। ঢাকায় পরিবহন ব্যবস্থাপনায় ৩২টি সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ও নেই। তিনি বলেন, যে তালে প্রকল্পের কাজ হয় তাতে ২০৩৫ সালেও যানজট পরিস্থিতির উন্নয়ন হবে না।

ঢাকা যানবাহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক খন্দকার রাকিবুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা সব সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের চেষ্টা করছি। কম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনা করলে বিশৃঙ্খলা কমবে। তাতে যানজটও কমবে। তা করতে মূল ও উপকমিটি কাজ করছে। এ জন্য প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করা হচ্ছে। বাস্তবায়নে দুই বছর লাগবে।’

এসটিপি প্রণয়নের জন্য সমীক্ষা প্রতিবেদন তৈরি করেছিল যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক লুইস বার্জার গ্রুপ। ২০২৪ সালের মধ্যে তিন কোটি ৬০ লাখ যাত্রীর পরিবহন চাহিদা পূরণ করার লক্ষ্যে যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নে সুপারিশ দেওয়া হয়েছিল তাতে। রাস্তার শতভাগ ব্যবহার নিশ্চিত করা, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, অযান্ত্রিক যান ব্যবস্থাপনা, বৃত্তাকার নৌপথ চালু করা, পথচারী চলাচল ও নিরাপত্তা, পার্কিং নীতিমালা প্রণয়ন, পূর্ব-পশ্চিমমুখী সড়ক সম্প্রসারণের বিষয়টি তাতে গুরুত্ব পেয়েছিল। দ্রুত জনপরিবহন ব্যবস্থা হিসেবে তিনটি মেট্রো রেল, তিনটি বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছিল। তিনটি মেট্রো রেলের মধ্যে এখন শুধু উত্তরা-মতিঝিল পথে একটি রুটে মেট্রো রেলপথ নির্মাণের কাজ চলছে। বিআরটির তিনটি রুটের মধ্যে শুধু গাজীপুর-বিমানবন্দর রুটের কাজ চলছে। শুধু তা-ই নয়, প্রকল্প ও কর্মসূচিগুলো সময়মতো বাস্তবায়ন না হওয়ায় এসটিপি সংশোধন করে আরএসটিপি প্রণয়ন করা হয়েছে ২০১৫ সালে। তাতে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সময়সীমা ১১ বছর বাড়িয়ে ধরা হয়েছে ২০৩৫ সাল। 

গবেষকদের মতে, যানজট বাড়ার প্রধান কারণ বাসের মতো গণপরিবহন না বাড়িয়ে ছোট গাড়ির নিবন্ধন বাড়ানো। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সর্বশেষ পরিসংখ্যান মতে, ঢাকায় বিভিন্ন ধরনের গাড়ির ৪৫ শতাংশই মোটরসাইকেল এবং ২০ শতাংশ প্রাইভেট কার। কিন্তু বাস আছে মাত্র ০.৭ শতাংশ।

ঢাকায় সড়কে যানজট বেড়ে যাওয়া ও বিশৃঙ্খলার বড় কারণ হিসেবে মোটরসাইকেল বেড়ে যাওয়াকে চিহ্নিত করেছে ট্রাফিক বিভাগ। এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগের যুগ্ম কমিশনার মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সড়ক নির্দিষ্ট, কিন্তু মোটরসাইকেলের চাপ প্রতিদিন বাড়ছে। এ জন্য ঢাকা মেট্রোর বাইরে অন্য জেলার মোটরসাইকেল ঢাকায় অ্যাপ ব্যবহার করে চলতে না দিতে আমরা বিআরটিএর কাছে প্রস্তাব করেছি।’

বিপুল বিনিয়োগ : ঢাকার যানজট নিরসনে সরকার ১০ বছরে বড় দাগে ৪২ হাজার ৯০৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। কিছু প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে, কিছু প্রকল্পের কাজ চলছে। এ তথ্য গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদেও উপস্থাপন করা হয়েছে। জানা গেছে, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রো রেল নির্মাণ করছে ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা ব্যয়ে। গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর সড়কে বিআরটি নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে দুই হাজার ৩৯ কোটি টাকা। রেলপথ মন্ত্রণালয় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ মিটার গেজ রেলপথের সমান্তরালে একটি ডুয়াল গেজ ডাবল লাইন নির্মাণ করছে ৩৭৮ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ে। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পগুলোর মধ্যে আছে ৪২১ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে মাদানী এভিনিউয়ের পূর্বমুখী সম্প্রসারণ। হাতিরঝিল সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্পে বিনিয়োগ হয়েছে দুই হাজার ২৩৬ কোটি টাকা। পূর্বাচল সংযোগ সড়কের উভয় পাশে ১০০ ফুট প্রশস্ত খাল খনন ও উন্নয়নে লাগছে ১০ হাজার ৩২৯ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। সড়ক প্রশস্তসহ গুলশান-বনানী-বারিধারা লেক উন্নয়নে ব্যয় হচ্ছে ৪১০ কোটি ২৬ লাখ টাকা। মাদানী এভিনিউ থেকে বালু নদ পর্যন্ত সড়ক প্রশস্তকরণ ও বালু নদ থেকে শীতলক্ষ্যা পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ (প্রথম পর্ব) প্রকল্পে বিনিয়োগ করা হয়েছে এক হাজার ২৫৯ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। এ ছাড়া উল্লেখযোগ্য প্রকল্পের মধ্যে আছে সাতরাস্তা থেকে উত্তরা পর্যন্ত ১১টি ইউ লুপ নির্মাণ, মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ থেকে বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত সংযোগ সড়ক নির্মাণ, মিরপুর-১০ থেকে কচুক্ষেত পর্যন্ত সড়ক প্রশস্ত ও উন্নয়ন, মিরপুর দারুস সালাম সড়ক নির্মাণ, ইসিবি চত্বর থেকে মিরপুর পর্যন্ত সড়ক উন্নয়ন ও কালশী মোড়ে ফ্লইওভার নির্মাণ ইত্যাদি।

 

মন্তব্য