kalerkantho

রমজানে নিত্যপণ্যের দাম যেন না বাড়ে

৬৫ উন্নয়ন প্রকল্প উদ্বোধন ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে ব্যবসায়ীদের প্রধানমন্ত্রী

বিশেষ প্রতিনিধি   

৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



রমজানে নিত্যপণ্যের দাম যেন না বাড়ে

গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন শেষে মোনাজাতে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা (বাঁয়ে) এবং অন্যদের সঙ্গে বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান (ডানে)। ছবি : বাসস

আসন্ন রমজানে নিত্যপণ্যের দাম না বাড়াতে ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘সামনে রোজা। এই সময় তেল, ছোলা, চিনিসহ নিত্যপণ্যের দাম যাতে না বাড়ে, সে জন্য আমি আপনাদের প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত সরবরাহ যেন থাকে, সে বিষয়টিও আপনাদের দেখতে হবে।’

গতকাল বুধবার সকালে গণভবন থেকে কয়েকটি অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী এই আহ্বান জানান। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত শিল্প স্থাপনের উপযোগী ১১টি অর্থনৈতিক অঞ্চলের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন, নতুন ১৩টি অর্থনৈতিক অঞ্চলের উন্নয়নকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন, অর্থনৈতিক অঞ্চলে স্থাপিত ১৬টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক উৎপাদন উদ্বোধন এবং নতুন ২০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ভিত্তি স্থাপনসহ ৬৫টি উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন করেন।

এ সময় গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি খাত বিষয়ক উপদেষ্টা ও সংসদ সদস্য সালমান এফ রহমান উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক মো. আবুল কালাম আজাদ ভিডিও কনফারেন্সটি সঞ্চালনা করেন। বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান, ভাইস চেয়ারম্যান সাফিয়াত সোবহানসহ শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীরা এ সময় গণভবনের ব্যাংকুয়েট হলে এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান শেষে উপস্থিত অতিথিদের আপ্যায়ন করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্প নগরী, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে মেঘনা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইকোনমিক জোন, মৌলভীবাজারের শ্রীহট্ট অর্থনৈতিক অঞ্চল, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সিটি ইকোনমিক জোন, সিরাজগঞ্জ ইকোনমিক জোন এবং মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় আব্দুল মোনেম অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় প্রশাসন, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার জনগণ, উপকারভোগী ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।

অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে ফসলি জমি নষ্ট না করার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যাদের জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে তাদের ক্ষতিপূরণ সঙ্গে সঙ্গে দিতে হবে। একই সঙ্গে তাদের বিকল্প জায়গার ব্যবস্থাও করতে হবে সংশ্লিষ্টদের। তিনি বলেন, ‘আমরা ফসলি জমি নষ্ট করব না। মানুষের জন্য কাজ করি, সেই মানুষকে কষ্ট দেওয়ার জন্য নয়। এ ক্ষেত্রে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তাদের যেন কোনো কষ্ট না হয়। সে দিকে নজর দিতে হবে।’

শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধুই প্রথমে বিসিক শিল্প নগরী গড়ে তুলেছেন। এ জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করেন। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘বাঙালিদের কেউ দাবায়ে রাখতে পারবা না।’ আজ বাঙালিদের কেউ দাবিয়ে রাখতে পারে নাই। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের তরুণ সমাজ দেশে বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের উদ্যোগ গ্রহণ করে যেভাবে কাজ করে যাচ্ছে আমি তাদের উদ্যোগের প্রশংসা করি।’

সরকারের উন্নয়ন একেবারে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমার উৎপাদিত পণ্যের বাজার সৃষ্টির জন্য আমি কেবল রপ্তানির ওপর নির্ভর করতে পারি না, দেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা যেন বাড়ে এবং দেশে যেন আমাদের বাজার সৃষ্টি হয় সে পদক্ষেপও আমরা নিয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ করে আমরা সারা বাংলাদেশে ডিজিটাল সেন্টার করে দিয়েছি। এর ফলে এখন ক্রয়-বিক্রয় থেকে শুরু করে সব কিছু ঘরে বসেই মানুষ অনলাইনে সারতে পারছে।’

দেশের পোস্ট অফিসগুলোকেও তাঁর সরকার আধুনিকায়ন করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘অর্থাৎ সমগ্র বাংলাদেশটাকে নিয়ে আমরা আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্য স্থির করেছি। আপনারা যাঁরা আজ দেশের শিল্পায়নের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন তাঁরা এর সুফল পাচ্ছেন।’

এ সময় আঞ্চলিক কানেকটিভি জোরদারে তাঁর সরকারের বিবিআইএন (বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, নেপাল) এবং বিসিআইএন-ইসি (বাংলাদেশ, চীন, ভারত, মিয়ানমার) পদক্ষেপসমূহও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানটা এমন চমৎকার একটা জায়গায় যেখান থেকে প্রয়োজনে পূর্ব-পশ্চিম এবং উত্তর-দক্ষিণ সবখানেই যাওয়া যায়। এসব জায়গাতেই একটি ভালো বাজার পাওয়ার সুযোগ আমাদের রয়েছে। সে যোগাযোগটাও আমরা স্থাপন করেছি।’

পায়রায় নতুন সমুদ্রবন্দর তৈরিতে তাঁর সরকারের উদ্যোগও তুলে ধরেন সরকারপ্রধান। তিনি বেসরকারি খাতে বিনিয়োগে এগিয়ে আসা উদ্যোক্তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, বর্তমান সরকারের কাজ হচ্ছে অবকাঠামোগত যে সুযোগগুলো একান্ত প্রয়োজন সেই সুযোগটা সৃষ্টি করে দেওয়া। এসবের ফলে দেশের মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে, দারিদ্র্য বিমোচনের পাশাপাশি জনগণের জীবনমানের উন্নয়ন হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘এ দেশের কোনো তরুণ বেকার থাকবে না। তারা প্রশিক্ষণ পাবে, উপজেলা পর্যায়ে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মাধ্যমে যার ব্যবস্থা আমরা করে দিচ্ছি, পাশাপাশি শিক্ষার ব্যবস্থাও করে দিচ্ছি এবং তরুণদের জন্য বহুমুখী এবং বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় আমরা করে দিচ্ছি।’ প্রশিক্ষিত জনবল সৃষ্টি করাই তাঁর সরকারের লক্ষ্য উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এর পাশাপাশি উৎপাদন বৃদ্ধির কাজও সরকার করে যাচ্ছে।

ইতিমধ্যে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি লাভ করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এই মর্যাদাকে ধরে রেখে বাংলাদেশকে আমাদের উন্নত-সমৃদ্ধিশালী করে গড়ে তুলতে হবে। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ হবে একটি উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ, সেই লক্ষ্য আমরা স্থির করেছি।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘২০২০ সালে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী, ২০২১ সালে আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী আমরা উদ্যাপন করব। তখন বাংলাদেশ হবে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশ। আমরা ২০৪১ সালে বাংলাদেশকে উন্নত সমৃদ্ধ করে গড়ে তুলতে চাই।’ এ জন্য সরকার পঞ্চবার্ষিক এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রেক্ষিত পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে এবং ‘ডেল্টা পরিকল্পনা ২১০০’ প্রণয়ন করেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে অবস্থিত বঙ্গবন্ধু শিল্প নগরীতে বেজার অস্থায়ী কার্যালয়ে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ইলিয়াছ হোসেনের সঞ্চালনায় প্রধানমন্ত্রী সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে এ সময় উপস্থিত ছিলেন সাবেক গণপূর্তমন্ত্রী ও স্থানীয় সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, ফেনী-৩ আসনের সংসদ সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার আব্দুল মান্নান, চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি মাহবুবুল আলম, দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্প গ্রুপ বসুন্ধরা গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান ও বসুন্ধরা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইকোনমিক জোনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাফওয়ান সোবহান, বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহসভাপতি নাছির উদ্দিন চৌধুরী প্রমুখ।

মন্তব্য