kalerkantho

মহান স্বাধীনতা দিবস উদ্‌যাপন

প্রগতির পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ও সাভার প্রতিনিধি   

২৭ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



প্রগতির পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়

শ্রদ্ধার ফুলে ভরে ওঠা জাতীয় স্মৃতিসৌধ। গতকাল সকাল সোয়া ৮টায় সাভার থেকে তোলা। ছবি : লুৎফর রহমান

মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ এবং জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে গতকাল মঙ্গলবার জাতি উদ্যাপন করেছে মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। লাখো শহীদের আত্মত্যাগের চেতনায় দেশকে প্রগতির পথে আরো এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দৃঢ প্রত্যয় উচ্চারিত হয়েছে দেশজুড়ে।

এ ছাড়া একাত্তরের গণহত্যার বৈশ্বিক স্বীকৃতি দাবির পাশাপাশি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও জঙ্গি নির্মূল করে দুর্নীতিমুক্ত সোনার বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ও উচ্চারিত হয়েছে।

গতকাল ভোরে ঢাকাসহ সারা দেশে ৩১ বার তোপধ্বনির মধ্য দিয়ে দিবসের সূচনা হয়। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর নেতৃত্বে বীরশ্রেষ্ঠ পরিবার, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও বীর মুক্তিযোদ্ধারা স্মৃতিসৌধে ফুল দেন। বাংলাদেশে নিযুক্ত বিদেশি কূটনীতিক, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনসহ সর্বস্তরের মানুষ ফুল দিয়ে শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানায়।

গতকাল ছিল সরকারি ছুটির দিন। সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি ভবনে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় পতাকা এবং ঢাকা মহানগরীতে দৃশ্যমান উঁচু ভবনগুলোয় জাতীয় পতাকা ওড়ানো হয়। গুরুত্বপূর্ণ ভবন ও স্থাপনাগুলোতে আলোকসজ্জা করা হয়েছে। ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন শহরের প্রধান সড়ক ও সড়কদ্বীপ জাতীয় পতাকায় সাজানো হয়।

মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে। দেশের সব হাসপাতাল, জেলখানা, শিশু পরিবার, বৃদ্ধাশ্রম, ভবঘুরে প্রতিষ্ঠান ও শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রে উন্নত মানের খাবার পরিবেশন করা হয়। সরকারি ও বেসরকারি টেলিভিশন ও বেতারে বিশেষ অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হয়। বিশেষ ক্রোড়পত্র বের করে সংবাদপত্রগুলো। বিশেষ আয়োজন ছিল অনলাইন গণমাধ্যমে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে পালিত হয় নানা কর্মসূচি।

স্মৃতিসৌধে মানুষের ঢল : হাতে লাল সবুজের পতাকা আর ফুল, হৃদয়ে শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা নিয়ে সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে সমাগম ঘটে লাখো মানুষের। ফুলে ফুলে ভরে ওঠে স্মৃতিসৌধের মূল বেদি।

বাবার কোলে চড়ে ছোট্ট শিশু থেকে শুরু করে বয়স্ক ব্যক্তি, বিদেশি আর হুইলচেয়ারে বসে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তি উপস্থিত হয়েছিল একাত্তরের শহীদদের স্মরণ করার জন্য। ছিলেন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবার, সাত বীরশ্রেষ্ঠের পরিবারের সদস্যরাও।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভোর ৬টার কয়েক মিনিট আগে যান জাতীয় স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণে। প্রায় একই সময়ে যান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে অভ্যর্থনা জানান। প্রথমে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী স্মৃতিসৌধের বেদিমূলে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন। এ সময় তিন বাহিনীর সুসজ্জিত একটি চৌকস দল গার্ড অব অনার প্রদান করে। বিউগলে বাজানো হয় করুণ সুর। এরপর রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী নীরবে কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে থাকেন। পরে রাষ্ট্রপতি স্মৃতিসৌধের পরিদর্শন বইতে স্বাক্ষর করেন।

এর পরপরই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে শেখ হাসিনা শহীদ বেদিতে পুষ্পমাল্য অর্পণ করেন। প্রায় ১৫ মিনিট সময় প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণে অবস্থান করেন।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পর মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, জাতীয় সংসদের স্পিকার, মন্ত্রিসভার সদস্যবর্গ, সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা রওশন এরশাদ, তিন বাহিনীর প্রধান, কূটনীতিক, মুক্তিযোদ্ধা এবং পদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও সাত বীরশ্রেষ্ঠ পরিবারের সদস্যরা।

রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদের সদস্য এবং কূটনীতিকরা স্মৃতিসৌধ এলাকা ত্যাগ করার পর স্মৃতিসৌধ অন্যান্য দল ও সর্বসাধারণের শ্রদ্ধাঞ্জলি দেওয়ার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।

শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন গণফোরাম সভাপতি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতা ড. কামাল হোসেন, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে দলটির নেতাকর্মীরা। এ ছাড়া বিকল্পধারা বাংলাদেশ, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), সেক্টর্স কমান্ডারস ফোরাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসন কেন্দ্র সিআরপি, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন, প্রতিষ্ঠান শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে।

ভোর থেকে স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণজুড়ে দেশাত্মবোধক গানের সুর বাজতে থাকে। ঢাকা জেলা পুলিশের উদ্যোগে স্মৃতিসৌধ চত্বরে ‘গৌরবময় স্বাধীনতা ২০১৯’ শীর্ষক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। পাশাপাশি ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে বড় পর্দায় দেখানো হয় মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে স্বাধীনতাবিরোধীদের নানা ধরনের নির্যাতনসহ নানা দৃশ্য। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক আলোকচিত্র প্রদর্শনের ব্যবস্থাও রাখা হয় স্মৃতিসৌধের মুক্ত মঞ্চ এলাকায়। চলে স্বাধীনতাযুদ্ধকালীন গান নিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

রাজধানীতে কর্মসূচি : রাজধানীর ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর সড়কে ভোর ৬টার পর থেকেই বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করে আওয়ামী লীগ, এর সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন, বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠন ছাড়াও সাধারণ মানুষ। হাজারো জনতার ‘জয় বাংলা’ ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানে পুরো এলাকা মুখর হয়ে ওঠে। সকাল ৭টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতির সামনে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর প্রাঙ্গণে আলোচনাসভার আয়োজন করা হয়।

সকাল ১০টার দিকে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যরা শেরেবাংলানগরে দলের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরে পুষ্পমাল্য অর্পণ করেন।

এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও ঢাকা জেলা প্রশাসন সকালে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে শিশু-কিশোর সমাবেশ আয়োজন করে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এতে প্রধান অতিথি ছিলেন। এ ছাড়া একই সময় সারা দেশে শুদ্ধ সুরে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। ভোরে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সহযোগিতায় হয়েছে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ পর্যন্ত ‘অভিযাত্রা’। মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ স্মরণে ‘অভিযাত্রা’র শুরুতে ২৫ মার্চের হত্যাযজ্ঞের স্মৃতি জড়ানো বধ্যভূমি ও স্মৃতিপীঠ পরিদর্শন করে অভিযাত্রীরা। দুপুরে কাকরাইলে তথ্য মন্ত্রণালয়ের চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর আয়োজন করে প্রামাণ্যচিত্র, আলোকচিত্র প্রদর্শন ও আলোচনাসভা।

সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গণযোগাযোগ অধিদপ্তরের উদ্যোগে ট্রাকে করে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিশিষ্ট শিল্পীরা দেশাত্মবোধক সংগীত পরিবেশন করেন।

সকাল ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত পথশিশুদের অংশগ্রহণে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্বাধীনতা জাদুঘরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত সাত কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের ‘পলিটিক্যাল সায়েন্স ক্লাব’ এ প্রতিযোগিতার আয়োজন করে।

এ ছাড়া বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট মিলাদ মাহফিল, বিশেষ মোনাজাত ও আলোচনাসভার আয়োজন করে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বাংলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, বাংলাদেশ শিশু একাডেমিসহ বিভিন্ন সংগঠন মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শিশুদের চিত্রাঙ্কন, রচনা ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করে। দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধান কার্যালয়েও আলোচনাসভার আয়োজন করা হয়।

রাজারবাগে পুলিশের শ্রদ্ধা : মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে গতকাল রাজারবাগে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী ও ডিএমপি কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া। বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন ও বাংলাদেশ পুলিশ উইমেন নেটওয়ার্কের পক্ষ থেকেও শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয়।

পিলখানায় বিজিবির শ্রদ্ধা : বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. সাফিনুল ইসলাম গতকাল সকালে পিলখানার স্মৃতিসৌধ ‘সীমান্ত গৌরব’ বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে বীর শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এ সময় বিজিবির একটি চৌকস দল ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করে।

নৌবাহিনীর জাহাজ উন্মুক্ত : দেশের বিভিন্ন ঘাটে দুপুর ২টা থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নৌবাহিনীর জাহাজ সর্বসাধারণের পরিদর্শনের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়।

 

মন্তব্য