kalerkantho

২৮ বছর পর আশা-প্রত্যাশার ডাকসুর যাত্রা শুরু আজ

অনেক চ্যালেঞ্জ ‘স্বল্প’ সময়ে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৩ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



অনেক চ্যালেঞ্জ ‘স্বল্প’ সময়ে

অচলায়তন ভেঙে ২৮ বছরের বেশি সময় পর সচল হতে চলেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ। অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগে শিক্ষার্থীদের একটি পক্ষের আন্দোলনের মধ্যেই আজ শনিবার ডাকসু কার্যনির্বাহী কমিটির অভিষেক। নির্বাচন বর্জন করে নতুন নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা আজ মুখে কালো কাপড় বেঁধে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করবে।

আজ সকাল ১১টায় ডাকসু ভবনে নবনির্বাচিত ডাকসু নেতাদের অভিষেক হবে আর হল সংসদের অভিষেক হবে প্রতিটি হলে।

ডাকসু ও হল সংসদের নবনির্বাচিত কার্যকর পরিষদের সদস্যদের পরিচিতি ও শুভেচ্ছাবিনিময় এবং দায়িত্বভার গ্রহণসহ পরবর্তী কার্যক্রম বিষয়ে আলোচনা হবে।

গঠণতন্ত্র অনুযায়ী, ডাকসুর প্রেসিডেন্ট বর্তমান উপাচার্য ড. আখতারুজ্জামান আর কোষাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন ড. শিবলী রুবাইয়াতুল ইসলাম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সমস্যা ব্যাপক। শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, বিদ্যমান সমস্যা সমাধানে কার্যকর ভূমিকা পালন করবেন নির্বাচিত ছাত্র নেতারা। সংশ্লিষ্টদের মতে, শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশার চাপ মোকাবেলা করতে হবে নির্বাচিতদের। আবাসন সংকট থেকে শুরু করে বাইরের শিক্ষার্থীদের আনা-নেওয়ায় পরিবহন সংকট, হলগুলোয় খাবারের মানোন্নয়ন, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার ও হল পাঠাগারে পড়ালেখার সুষ্ঠু পরিবেশ, শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা, ছাত্রীদের নিরাপত্তা, সাংস্কৃতিক চর্চায় গতি ফেরানো, কেন্দ্রীয় ও হল খেলাধুলা নিয়মিতকরণ, শিক্ষা-গবেষণার মান বৃদ্ধি, স্বজনপ্রীতি ও রাজনীতিকরণের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ ঠেকানো, সান্ধ্য কোর্স বন্ধ এবং নতুন নতুন বিভাগ খোলায় ক্লাসরুম সংকটের মতো সমস্যা সমাধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে থাকবে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হল ও হলের বাইরে ক্যাম্পাসেও শিক্ষার্থীদের বহু সমস্যা রয়েছে। হলে আবাসন সংকট, খাবারের মান ও অভ্যন্তরীণ খেলাধুলা এবং সাংস্কৃতিক চর্চায় সমস্যা রয়েছে। আর ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থী নিরাপত্তা, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাংস্কৃতিক চর্চায় বন্ধ্যাত্ব, ছাত্রীদের অনিরাপত্তা, ক্যাম্পাসে যানজট, রিকশা নৈরাজ্য রয়েছে। রয়েছে বহিরাগত সমস্যাও। হলগুলোয় তীব্র আবাসন সংকট বিরাজ করছে। ছাত্রত্ব শেষ হওয়ার পরও সিট না ছাড়া আর বহিরাগতদের দখলে থাকায় আবাসন সংকট কাটছে না। সিট বণ্টনে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ না থাকায় ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠন খবরদারি করে। দলীয় কর্মসূচিতে গেলে সিট মেলে আর না গেলে সিট মেলে না। দু-একটি হল ছাড়া বেশির ভাগ হল ক্যান্টিনে খাবারের মান অনুন্নত। হল ক্যান্টিনে প্রশাসনের কোনো ভর্তুকি দেওয়া হয় না। কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে আসন সংকট প্রকট। সকাল ৮টায় লাইব্রেরি খোলা হয়, কিন্তু ৭টার আগে লাইনে না দাঁড়ালে সিট পাওয়া যায় না। এসব সমস্যার সমাধানকে নির্বাচিত ছাত্রসংসদ নেতাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে বলে মনে করছেন শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে, ছাত্র রাজনীতির শান্তিপূর্ণ পরিবেশ সহাবস্থান বজায় রাখা।

ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী শোভন রেজা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ডাকসুর নেতারা শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে কাজ করুক, ডাকসু হোক ছাত্রদের অধিকার আদায়ে সত্যিকারের প্লাটফর্ম। আবাসন সংকট, ক্যান্টিনের খাবারের মান উন্নয়ন, লাইব্রেরি ও পাঠাগারের সমস্যা সমাধান এবং শিক্ষার্থীদের ন্যায্য অধিকার আদায়ে পাশে থাকুক ডাকসু।’

চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থী মিফতু মনি হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘২৮ বছর পর অচলায়ন ভেঙে শিক্ষার্থীরা নতুন নেতৃত্ব পেয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান বাড়ানো, শিক্ষা-গবেষণা বৃদ্ধি ও সত্যিকারের বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলতে প্রশাসনের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করুক। শিক্ষার্থীদের নানা সমস্যা সমাধানে সর্বাগ্রে এগিয়ে আসুক নেতারা।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল বলেন, ‘শিক্ষা কার্যক্রমে কোনো বিঘ্নতা না ঘটিয়ে শিক্ষকদের সঙ্গে এক হয়ে শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধানে কাজ করুক ডাকসু নেতারা। শিক্ষার্থী আর শিক্ষকদের যে পারস্পরিক সম্পর্ক হওয়া দরকার ডাকসুর মাধ্যমে সেটা নিশ্চিত হোক।’

তিনি বলেন, ‘ডাকসু নেতাদের কাছে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা ও শিক্ষার্থী সমস্যা সমাধানে পরামর্শ প্রত্যাশা করব। হলের আবাসন সংকট দূর, খাবারের মান উন্নয়ন ও বিদ্যমান সমস্যা সমাধানে শিক্ষকদের পাশে থাকুক তারা, সহায়তাও করুক। আমরা শিক্ষার্থীদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের গুণগত মানসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলতে একত্রে কাজ করব।’

এসব প্রসঙ্গে ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৩ হাজার শিক্ষার্থীর সমস্যার অন্ত নেই। ২৮ বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন দায়িত্ব পালন করেছে, কিন্তু শিক্ষার্থী অধিকারকে ভূলুণ্ঠিত করেছে। গুরুত্ব বিবেচনায় সব সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করব।’

ডাকসুর নবনির্বাচিত জিএস গোলাম রাব্বানী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এক বছর সময় খুব বেশি সময় না, কিন্তু ২৮ বছরের অচলায়তন ভেঙে ডাকসু যাত্রা শুরু হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় যেসব সমস্যা দ্রুত সমাধান করা সম্ভব তা করা হবে।’ তিনি বলেন, ‘২৮ বছরে শিক্ষার্থীদের অনেক সমস্যা জড়ো হয়েছে। আমরা দায়িত্ব নিয়ে সমাধানে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করব।’

দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার পর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ও সর্বশেষ উচ্চ আদালতের আদেশে গত ১১ মার্চ ডাকসু ও হল সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সুষ্ঠু ভোট আর শঙ্কার দোলাচলেও ক্যাম্পাসে সব ছাত্রসংগঠনই ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে।

ডাকসুর ২৫টি পদের নির্বাচনে ২৩টিতে জিতেছে ছাত্রলীগ। ডাকসুর সর্বোচ্চ আসন সহসভাপতি (ভিপি) পদে জিতেছেন সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা নুরুল হক নুর, যিনি ছাত্রলীগের সাবেক নেতা। আর সমাজসেবা পদে জিতেছেন আখতার হোসেন, যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশ্ন ফাঁসের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে অনশনে বসেছিলেন।

ভিপির দায়িত্ব নিচ্ছেন নুর : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ও হল সংসদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা আনুষ্ঠানিকভাবে আজ শনিবার দায়িত্ব নেবেন। সব জল্পনাকল্পনার অবসান ঘটিয়ে ভিপি হিসেবে দায়িত্ব নিচ্ছেন নূরুল হক নূর। একই সঙ্গে দায়িত্ব নেবেন সমাজসেবা সম্পাদক আখতার হোসেন।

গতকাল শুক্রবার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে এক সংবাদ সম্মেলনে দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়টি জানান কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের আহ্বায়ক হাসান আল মামুন। এ সময় ডাকসু ভিপি নূরুল হক নূর, সাধারণ সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী রাশেদ খান, সহসাধারণ সম্পাদক প্র্রার্থী ফারুক হোসেন, সমাজসেবা সম্পাদক আখতার হোসেন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

নূরুল হক নুর বলেন, ‘গত ১১ মার্চ ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। যা সারা বাংলাদেশের মানুষের কাছে যেমনটি প্রত্যাশা ছিল, সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ উপহার দিতে পারেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ডাকসুর যে অভিষেক অনুষ্ঠান হতে যাচ্ছে সেখানে শিক্ষার্থীদের চাওয়া-পাওয়াকে প্রাধান্য দিয়েই আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করব। একই সঙ্গে পুনর্নির্বাচনসহ বিশ্ববিদ্যালয়ে সব সমস্যার সমাধানে কাজ করব।’

 

মন্তব্য