kalerkantho

মোবাইল অপারেটরদের রাজস্ব ফাঁকির মচ্ছব

দিতেও টালবাহানা আদায়েও গাছাড়া

কাজী হাফিজ   

১৮ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



দিতেও টালবাহানা আদায়েও গাছাড়া

বেসরকারি মোবাইল ফোন অপারেটররা প্রায় ২২ বছর ধরে এ দেশে ব্যবসা চালিয়ে আসছে। কিন্তু ওই সব প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট সব আইন ও নীতিমালা মেনে সরকারের রাজস্ব সঠিকভাবে পরিশোধ করছে কি না, তা নিরীক্ষণের কাজই সবার ক্ষেত্রে শেষ করতে পারেনি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি। সর্বশেষ নিরীক্ষায় গ্রামীণফোনের কাছে ১১ হাজার ৫৩০ কোটি এবং রবি আজিয়াটা লিমিডেটের কাছে ৮৬৭ কোটি ২৩ লাখ ৯১ হাজার ৪৭৬ টাকা পাওনা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে কবে নাগাদ বিশাল অঙ্কের ওই টাকা আদায় হবে তার নিশ্চয়তা কোনো পক্ষের কাছ থেকেই পাওয়া যাচ্ছে না।

জানা যায়, ওই দুই অপারেটরের সিস্টেম নিরীক্ষায় অনেক অনিয়ম, গোপনীয়তা ও ফাঁকির বিষয়গুলো ধরা পড়ায় পাওনার পরিমাণ জানা গেছে।

রবিকে গত বছরের ৩১ জুলাই ১০ কার্যদিবসের মধ্যে পাওনা পরিশোধের জন্য চিঠি দেওয়া হয়; কিন্তু রবি এতে রাজি নয়। আর গত বছরের ১৯ জুলাই বিটিআরসির ২১৫তম সভায় সিদ্ধান্ত নিয়েও গ্রামীণফোনকে পাওনা পরিশোধের জন্য এখনো কোনো চিঠিই দিতে পারেনি সংস্থাটি। উভয় পক্ষের মধ্যে পাওনার পরিমাণ কমানো নিয়ে দর-কষাকষির মধ্যেই এখনো বিষয়টি সীমাবদ্ধ আছে। অন্যদিকে বাংলালিংক ও এয়ারটেল বাংলাদেশের সিস্টেম নিরীক্ষার জন্য এখনো অডিট ফার্ম নিয়োগের কাজই সম্পন্ন হয়নি। তবে পাওনা টাকা আদায় না হলেও নিরীক্ষার জন্য এরই মধ্যে সরকারের ব্যয় হয়েছে ১৫ কোটি টাকার ওপরে।

মোবাইল ফোন অপারেটরদের সিস্টেম নিরীক্ষার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকলেও এ বিষয়ে প্রথম উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০১১ সালে। ওই বছরের ১৭ এপ্রিল থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট (সিএ) ফার্ম এমএ ফজল অ্যান্ড কম্পানির মাধ্যমে গ্রামীণফোনের কার্যকলাপ তদন্ত ও আর্থিক হিসাব নিরীক্ষণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির কাছে ১৮ বছরের পাওনা নির্ধারণ করা হয় তিন হাজার ৩৪ কোটি ১১ লাখ আট হাজার ৫৮১ টাকা। বিটিআরসি ২১ দিনের মধ্যে ওই পাওনা পরিশোধের জন্য গ্রামীণফোনকে চিঠি দেয় সেই বছরের ৩ অক্টোবর।

সে সময় বিটিআরসির পক্ষ থেকে গণমাধ্যমকে জানানো হয়েছিল, গ্রামীণফোন অনেক ক্ষেত্রে অনিয়ম করেছে। সরকারের প্রাপ্য টাকা পরিশোধ না করে ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু গ্রামীণফোন ওই নিরীক্ষার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করলে পাওনা আদায়ের বিষয়টি ঝুলে যায়।

একই বছর বিটিআরসি বাংলালিংকের (ওরাসকম টেলিকম লিমিটেড) অডিটের জন্য দুটি ফার্মের সঙ্গে চুক্তি করলেও ফার্ম দুটির একটি অপারগতা প্রকাশ করে এবং অন্যটি অডিটকাজের অগ্রগতি জানাতে ব্যর্থ হয়। এরপর ২০১৫ সালের ১৮ নভেম্বর বিটিআরসির সভায় বাংলালিংকের অডিটের জন্য অডিট ফার্ম নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়। পরে রবির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আগে এয়ারটেল বাংলাদেশেরও অডিটের জন্য অডিট ফার্ম নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়; কিন্তু অডিট ফার্ম নিয়োগের কাজ বিটিআরসি এখনো শেষ করতে পারেনি।

জানা যায়, মোবাইল ফোন অপারেটরদের সিস্টেম অডিটের জন্য সরকার সর্বশেষ বিটিআরসিকে ৪০ কোটি ৮০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়। বিটিআরসি এর মধ্যে গ্রামীণফোনের দ্বিতীয়বারের অডিটের জন্য মেসার্স তোহা খান জামান অ্যান্ড কম্পানির সঙ্গে আট কোটি ৭৮ লাখ ৬১ হাজার ৫৯৭ টাকা এবং রবির অডিটের জন্য মেসার্স মুসিহ মুহিত হক অ্যান্ড কম্পানির সঙ্গে সাত কোটি ৮২ লাখ তিন হাজার ৯৯৩ টাকায় চুক্তিবদ্ধ হয়। অডিটে মেসার্স তোহা খান জামান অ্যান্ড কম্পানির সহযোগী দেশি ও বিদেশি ফার্ম ছিল যথাক্রমে এনকে অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস ও ভারতের এলএলপি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস। আর মেসার্স মুসিহ মুহিত হক অ্যান্ড কম্পানির সহযোগী ফার্ম ছিল ভারতের পিকেএফ শ্রীধর অ্যান্ড সান্থানাম ও এলএলপি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস।

২০১৬ সালের ১৯ জুলাই থেকে গ্রামীণফোনের অডিট শুরু হয় এবং ২০১৮ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বিটিআরসি এর চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করে। এ প্রতিবেদন অনুসারে গ্রামীণফোনের কাছে আদায়যোগ্য অর্থের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয় ভ্যাট ও ট্যাক্স বাবদ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রাপ্যসহ ১১ হাজার ৫৩০ কোটি ১৫ লাখ টাকা।

এর আগে ২০১৭ সালের ২৮ নভেম্বর বিটিআরসি রবির অডিটের চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করে। এতে রবির কাছে পাওনার পরিমাণ উল্লেখ করা হয় এক হাজার ২৫১ কোটি ৬৭ লাখ ৯৭ হাজার ৫৫১ টাকা। বিটিআরসি এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে রবির কাছে চিঠি পাঠায়। এ অডিট প্রতিবেদন সম্পর্কে রবির বেশি আপত্তি ছিল স্পেকট্রাম চার্জ বিষয়ে। পরে রবির যুক্তি ও দাবি মেনে পাওনার পরিমাণ ৩৮৪ কোটি ৪৪ লাখ ছয় হাজার ৭৫ টাকা কমিয়ে ৮৬৭ কোটি ২৩ লাখ ৯১ হাজার ৪৭৬ টাকা পুনর্নির্ধারণ করা হয়; কিন্তু তাতেও সম্মত নয় রবি।

এ বিষয়ে রবির মিডিয়া, কমিউনিকেশন অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ইকরাম কবীর কালের কণ্ঠকে পাঠানো এক লিখিত বক্তব্যে দাবি করেন, ‘বিটিআরসির নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে আসা প্রতিটি মূল্যায়নে এর কোনো যৌক্তিকতা এবং ভিত্তি নেই। আর গ্রামীণফোনের বক্তব্য, বিটিআরসি, অডিটর ও গ্রামীণফোনের উপস্থিতিতে ত্রিপক্ষীয় সভায় আমরা খসড়া অডিট রিপোর্টের নির্বাচিত অংশ নিয়ে আলোচনা করেছি। বাকি অংশের জন্য আমরা আবার একই রকম সভা আয়োজনের অনুরোধ জানিয়েছি। এখন আমরা তাদের প্রত্যুত্তরের অপেক্ষায় আছি।’

বিটিআরসির কমিশনার মো. রেজাউল কাদের (ই অ্যান্ড ও) এ সম্পর্কে গত মঙ্গলবার কালের কণ্ঠকে বলেন, গ্রামীণফোনের অডিট নিয়ে বিটিআরসির ইন্টারনাল রিভিউ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট অডিট ফার্মের কাছ থেকে মতামত পাওয়ার পর সিদ্ধান্ত হতে পারে। আর রবি যেহেতু প্রাপ্য টাকা দিতে রাজি নয়, সেহেতু এ অপারেটরের বিরুদ্ধে আগামী সপ্তাহেই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। এসংক্রান্ত ফাইলটি বিটিআরসির লিগ্যাল ও লাইসেন্সিং বিভাগ থেকে বিটিআরসির আগামী সভায় উপস্থাপন করা হবে এবং সভার সিদ্ধান্ত অনুসারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বাংলালিংক ও এয়ারটেলের অডিট সম্পর্কে রেজাউল কাদের বলেন, ‘এ বিষয়ে যেসব ফার্মের কাছে দরপত্র পাওয়া গেছে, তাদের সঙ্গে এ দুই অপারেটরের কোনো ব্যাবসায়িক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার কাজ চলছে। আশা করছি, এ মাসেই অডিট ফার্ম সিলেকশনের কাজ সম্পন্ন হয়ে যাবে।’

 

মন্তব্য