kalerkantho


ডাকসুর ভোট কোটা আন্দোলনে!

কোন্দলে ভিপি হারাল ছাত্রলীগ ►সুষ্ঠু নির্বাচন হলে ব্যবধান আরো কমত

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৩ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০



ডাকসুর ভোট কোটা আন্দোলনে!

১০ বছর ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলছে ছাত্রলীগের আধিপত্য। মিছিল-মিটিংয়েও তাদের নেতাকর্মীদের জমজমাট উপস্থিতি চোখে পড়ে। কিন্তু দীর্ঘ ২৮ বছর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে সহসভাপতি (ভিপি) পদে নির্বাচিত হয়েছেন কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের নেতা নুরুল হক নুর। অন্যান্য পদেও প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীরাই। দেশের অন্যতম ছাত্রসংগঠন ছাত্রদল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দাঁড়াতেই পারেনি। প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিল না বাম দলসহ অন্য সংগঠনগুলোও।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নানা কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীরা বেছে নিয়েছে নুরকে। এমনকি ছাত্রলীগের একাংশের ভোটও পেয়েছেন তিনি।

ডাকসু নির্বাচনে ভিপি ও সমাজসেবা সম্পাদক পদ ছাড়া ২৫ পদের মধ্যে ২৩টিতেই নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে ছাত্রলীগ। ভিপি পদে জিতে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের প্যানেলের নুরুল হক নুর। সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে ছাত্রলীগের গোলাম রাব্বানী এবং সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে সাদ্দাম হোসেন নির্বাচিত হন।

নুরুল হক নুর কোটা সংস্কার আন্দোলন করে জনপ্রিয়তা পান। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী অন্যান্য সংগঠনও শেষ পর্যায়ে এসে নুরকে সমর্থন দেয় বলে জানা যায়। এ ছাড়া ছাত্রলীগের ভিপি পদপ্রার্থী রেজওয়ানুল হক শোভনের জনপ্রিয়তার ঘাটতিও নুরকে এগিয়ে দিয়েছে। যেসব হলে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন সেখানে বেশি ভোট পেয়েছেন নুর। বিশেষ করে ছাত্রী হলগুলোতে নুরের ভোট ছিল একচেটিয়া।

ভিপি পদে ছাত্রলীগের প্রার্থীর পরাজয়ের পেছনে রয়েছে সংগঠনটির অভ্যন্তরীণ কোন্দলও। জানা যায়, আধিপত্যের দ্বন্দ্বের কারণে ভিপি পদে ছাত্রলীগের ভিপি পদপ্রার্থী রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনের পক্ষে কাজ করেননি একই প্যানেল থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন নেতা। দীর্ঘদিন ছাত্রলীগকে নিয়ন্ত্রণ করে আসা সাবেক ছাত্রনেতাদের একটি অংশও চায়নি শোভন নির্বাচিত হন। ছাত্রলীগের ডাকসু নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কয়েকজন নেতা, কেন্দ্রীয় কমিটির পদপ্রত্যাশী ও হল কমিটির অন্তত ১২ জন নেতার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে মানুষ বিভক্ত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও তাই হচ্ছে। মেয়র নির্বাচনে ভোট দিতে কম লোক এসেছে। উপজেলা নির্বাচনেও আগ্রহ বোধ করছে তা না। অর্থাৎ ভোটে আস্থা হারিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়র  ছাত্রসংখ্যার তুলনায় অর্ধেকের চেয়ে কম ভোট দিতে এসেছে।’

ঘোষিত ফল অনুসারে ২৫ হাজারের কিছু বেশি ভোট প্রয়োগ হয়েছে, যা মোট ভোটের ৫৯ শতাংশ। অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশই ভোট দেয়নি বা দিতে পারেনি নির্বাচনের দিনে তৈরি কৃত্রিম কিছু বাধায়। নুরুল হক নুর এক হাজার ৯৩৩ ভোটে পরাজিত করেছেন ছাত্রলীগের ভিপি পদপ্রার্থী শোভনকে। নুর ১১ হাজার ৬২ এবং শোভন ৯ হাজার ১২৯ ভোট পেয়েছেন। ছাত্রলীগের গোলাম রাব্বানী জিএস পদে ১০ হাজার ৪৮৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী মো. রাশেদ খান (কোটা আন্দোলনের নেতা) পেয়েছেন ছয় হাজার ৬৩ ভোট। আর এজিএস পদে সাদ্দাম হোসেন সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ৩০১ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ফারুক হোসেন (কোটা) পেয়েছেন আট হাজার ৮৯৬ ভোট।

দেশের অন্যতম রাজনৈতিক দল বিএনপির সহযোগী সংগঠন ছাত্রদলের ডাকসু নির্বাচনে কোনো রকম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে না পারার কারণও খুঁজছে কেউ কেউ। অনেকেই বলছে, জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির যেসব ভুল পদক্ষেপ ছিল ডাকসু নির্বাচনেও তেমনটিই ছিল। নির্বাচনের দুই দিন আগে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রদল বিশাল মিছিল করে শোডাউন করলেও সেখানো তারা খালেদা জিয়াকে নিয়েই স্লোগান দিয়েছিল। এমনকি তারা ভোট চাইতেও সাধারণ শিক্ষার্থীদের দ্বারে দ্বারে পৌঁছায়নি। আর ছাত্রদল ডাকসু নির্বাচনে আগে থেকেই পিছিয়ে পড়ায় তাদের সমর্থকরা শেষ পর্যন্ত কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদেরই অলিখিতভাবে সমর্থন জুগিয়েছিল।

সোমবার ভোটের শুরু থেকেই নানা অসংলগ্নতা ধরা পড়ে। ভোট শুরুর আগেই কুয়েত মৈত্রী হলে বস্তাভর্তি ব্যালট উদ্ধার হয়। বেগম রোকেয়া হলেও দুই দফা বন্ধ থাকে ভোট। এ ছাড়া অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের ভোট প্রদানে বাধা দেওয়ারও অভিযোগ পাওয়া যায়। এ ছাড়া প্রত্যেক হলেই ভোটের লাইন নিয়ন্ত্রণ করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের আইডি কার্ড ও পরিচয়পত্র চেক করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এ ছাড়া অনেক হলেই দুটি লাইন চোখে পড়ে। এর একটি লাইন কৃত্রিম বলে জানা যায়। আর আরেকটি লাইনে বিশেষ ভোটারদের দাঁড়ানোর সুযোগ দেওয়া হয়। কৃত্রিম লাইন খুবই ধীরগতিতে এগোলেও অন্য লাইনে মূলত ছাত্রলীগ সমর্থনকারীরা দ্রুতই ভোট দিয়ে বের হয়ে যায়।

সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তিরা জানান, যদি অনাবাসিক শিক্ষার্থীরা ঠিকমতো তাদের ভোট দিতে পারত আর ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে ভোটের লাইন না থাকত তাহলে নির্বাচনের ফল কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের পক্ষে আরো বেশি পদ যেত। কারণ এত কিছুর পরেও প্রায় সব পদেই ছাত্রলীগের প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীরা।

মেয়েদের হলসহ বেশ কয়েকটি হলে ভিপি, জিএস নির্বাচিত হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী। মনে করা হচ্ছে, ওই সব হলে যেসব ভোটার স্বতন্ত্র প্রার্থীকে ভোট দিয়েছে তারা নিঃসন্দেহে কেন্দ্রীয় পদেও নুরকেই ভোট দিয়েছে। আর ৪৩ হাজার ভোটারের মধ্যে মেয়ে ভোটার ১৬ হাজার ১৪১ জন, যাদের বেশির ভাগ ভোট কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীরা পেয়েছেন। এ ছাড়া অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের যারাই ভোট দিতে পেরেছে তারাও হিসাব বদলাতে ভূমিকা রেখেছে।

ডাকসুর নবনির্বাচিত ভিপি নুরুল হক নুর বলেন, ‘নির্বাচনে অনিয়ম হয়েছে, সব পদ নেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু সাধারণ ছাত্ররা একচেটিয়া ভোট দিয়েছে ভিপি ও সমাজসেবা পদে। যে কারণে তারা ইঞ্জিনিয়ারিং করেও ওই দুই পদ নিতে পারেনি।’

হল সংসদগুলোতেও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পান ক্ষমতাসীন ছাত্রলীগের প্যানেল সম্মিলিত শিক্ষার্থী সংসদের প্রার্থীরা, সোমবার গভীর রাতেই জানা গিয়েছিল। তবে ডাকসু তথা কেন্দ্রীয় সংসদের ফল জানার জন্য রাত ৩টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।

ছাত্রলীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির তিন সদস্য কালের কণ্ঠকে জানান, ছাত্রলীগ প্যানেল হিসেবে যৌথভাবে নির্বাচনী কর্মকাণ্ড চালাতে পারেনি। একটি অংশ শোভনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে শুধু নিজেদের জয়ের লক্ষ্যে কাজ করেছে। ছাত্রলীগের ওই অংশকে পেছনে থেকে সহায়তা করেছে সংগঠনের সাবেক নেতাদের একটি সিন্ডিকেট। বর্তমানে ছাত্রলীগের যেসব হল কমিটি আছে সেগুলো গঠন করা হয়েছিল ওই সিন্ডিকেটের আধিপত্য থাকার সময়। ফলে তাঁরা হল কমিটির নেতাদের শোভনের পক্ষে ভূমিকা রাখা থেকে নিবৃত্ত করতে সক্ষম হন। ছাত্রলীগের ওই নেতাদের মতে, শোভনের বাড়ি উত্তরবঙ্গে। তিনি ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর বরিশাল, সিলেট, খুলনা বিভাগের অনেক নেতা কোণঠাসা হয়ে পড়েন। ফলে ছাত্রলীগের ওই তিন বিভাগের নেতারা শোভনকে জয়ী করতে মাঠে নামেননি। উল্টো তাঁরা গোপনে বরিশাল বিভাগের সন্তান নুরুল হক নুরের পক্ষে কাজ করেন। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ভোট না পেলে নুর কোনোভাবেই জয়ী হতে পারতেন না।

রেজওয়ানুল হক শোভনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা হাসানুল হক বান্না কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কী কারণে ভিপি পদে ছাত্রলীগের পরাজয় হয়েছে এটা বিশ্ববিদ্যালয় এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সবাই জানে। এটা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। ছাত্রলীগের প্যানেলের সবাই একসঙ্গে কাজ করলে শুধু ভিপি পদে কিভাবে পরাজিত হয়! এর পেছনে সম্মিলিত ষড়যন্ত্র কাজ করেছে। ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী এবং বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ও তাঁদের অনুসারীরা শোভনের পক্ষে কাজ করেননি। এটা আমরা পাঁচ-সাত দিন আগেই টের পেয়েছিলাম।’ বান্না আরো বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দীর্ঘদিনের সিন্ডিকেট ভেঙে নিজের পছন্দে শোভনকে ছাত্রলীগের সভাপতি বানিয়েছেন। এটা অনেকেই মানতে পারেনি। তাদের প্ররোচনায় ছাত্রলীগের অনেক নেতাকর্মী বেঈমানি ও ষড়যন্ত্রে যুক্ত হয়। ডাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে শোভন অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি সক্রিয় ছিলেন। কিন্তু ছাত্রলীগের অন্য প্রার্থীরা গ্রুপিংয়ের কারণে সংগঠনের অনেককেই ভোট দিতে নিষেধ করেছেন। নিজেদের এমন দ্বন্দ্বের কারণেই ছাত্রলীগের সহসভাপতি প্রার্থী পরাজিত হয়েছেন।’

নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য আবু সালমান প্রধান শাওন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নির্বাচনের পরাজয়ের কারণ এখনো আমরা পুরোপুরি বের করিনি। পরে বসে আমরা এগুলো বিশ্লেষণ করব।

ছাত্রলীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ছেলেদের হলগুলোতে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ভোটারদের সারি নিয়ন্ত্রণ করেছে। সেখানে ছাত্রলীগের সব প্রার্থী ভোট পেলেও ভিপি প্রার্থী পাবেন না এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। ছাত্রলীগের একটি অংশ ষড়যন্ত্রে জড়িয়েই শোভনকে পরাজিত করেছে।’

ছাত্রলীগের কয়েকটি সূত্রে জানা যায়, হলগুলোতে প্যানেল দেওয়ার ক্ষেত্রে ছাত্রলীগের হল কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মতামত নেওয়া হয়নি। ফলে ক্ষুব্ধ হয়ে কেউ কেউ বিদ্রোহী প্রার্থীও দিয়েছেন। তিনটি হলে ছাত্রলীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ভিপি পদে জয়ীও হন। নির্বাচনী কাজে হল শাখার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ করেননি ছাত্রলীগের প্যানেলের শীর্ষ দুই নেতা। তবে নির্বাচনের এক দিন আগে ডাকসু নির্বাচন সমন্বয়ের বিষয়ে আওয়ামী লীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা বুয়েটে বসে হল শাখার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের নিয়ে বৈঠক করেন। এতেও শেষ রক্ষা হয়নি।

নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সূত্রগুলো জানায়, নির্বাচন পরিচালনা নিয়েও অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির একটি বৈঠকও হয়নি। ফলে শেষ পর্যন্ত সেটি নামসর্বস্ব একটি কমিটি হয়েই থেকেছে। যে যার মতো করে নির্বাচনী কর্মকাণ্ড চালিয়েছেন।

 



মন্তব্য