kalerkantho


প্রচার শেষ, রইল অনেক শঙ্কা

শরীফুল আলম সুমন, রফিকুল ইসলাম ও হাসান মেহেদী   

১০ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০



প্রচার শেষ, রইল অনেক শঙ্কা

রাত পোহালেই ভোট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনের। ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে গতকাল শনিবার নির্বাচনী প্রচার শেষ হয়েছে। তবে নানা শঙ্কা রয়ে গেছে ছাত্রলীগ ছাড়া অন্যান্য সংগঠন ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের। শেষ দিনে ছিল প্রার্থী ও ভোটারদের শেষ মুহূর্তের হিসাব-নিকাশ। শঙ্কা থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সরব ছিল সবাই। উৎসবমুখর ও সুষ্ঠু ভোটের প্রত্যাশা তাদের।

প্রার্থী ও ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে বেশ কিছু শঙ্কা ও উদ্বেগের কথা জানা গেছে। তাদের ওই উদ্বেগের বড় কারণ হলগুলোতে সহাবস্থানের বদলে ছাত্রলীগের একচ্ছত্র আধিপত্য বহাল থাকা। প্রশাসনের বেঁধে দেওয়া ছয় ঘণ্টা সময়ের মধ্যে সবাই ভোট দিতে পারবে কি না তা নিয়েও শঙ্কা আছে। যদিও প্রশাসন বলছে, দুপুর ২টার মধ্যে যারা হলে প্রবেশ করবে তারা সবাই ভোট দিতে পারবে। এ ছাড়া ভোটের দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসগুলো ঠিকমতো চলবে কি না সেটাও অনাবাসিক ভোটারদের উদ্বেগের বড় বিষয় হয়ে আছে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সর্বশেষ নির্দেশনা নিয়েও শঙ্কা কাজ করছে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ভোট কক্ষের অভ্যন্তরে কোনো প্রার্থীর পোলিং এজেন্ট থাকতে পারবে না। ২২৯ জন প্রার্থীর পোলিং এজেন্ট থাকলে ভোটগ্রহণ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হবে না। তবে গণনার সময় পোলিং এজেন্টরা থাকতে পারবে। সাংবাদিকরা প্রতিটি হলের নির্ধারিত জায়গায় অবস্থান নিতে পারবেন। তাঁরা ভোটকেন্দ্রের ছবি নিতে পারবেন তবে সরাসরি সম্প্রচার করতে পারবেন না।

ক্যাম্পাস ঘুরে সব শঙ্কার মধ্যেও গতকাল জমজমাট প্রচার লক্ষ করা গেছে। কিন্তু সাধারণ শিক্ষার্থীর উপস্থিতি ছিল কম। গতকাল প্রচারে সব প্রার্থীর সক্রিয়তা লক্ষ্য করা গেছে। সকাল থেকে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে মধুর ক্যান্টিনে জড়ো হয় ছাত্রলীগ। দুপুর ১টায় ছাত্রদলের বড় একটি মিছিল ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে। এ ছাড়া কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী, বাম সংগঠনগুলোর জোট, ছাত্রসমাজ ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ছিল প্রচারে।

হলে প্রচারও ছাত্রলীগের কবজায় : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮টি আবাসিক হলেই ছাত্রলীগের একচ্ছত্র আধিপত্য। বাম ঘরানার ছাত্রসংগঠনগুলোর প্রতিটি হলেই স্বল্প পরিসরে অবস্থান থাকলেও প্রচার নেই তেমন। ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন ঘিরে প্রতিটি হলেই সরব প্রার্থীরা। কারণ সংসদে ভোট দেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা আলাদা ব্যালটে কেন্দ্রীয় সংসদেও ভোট দিতে পারবে। এ জন্য হল সংসদ ও কেন্দ্রীয় সংসদের প্রার্থীর পক্ষে রাত পর্যন্ত চলে জোর প্রচার। কোনো কোনো কক্ষে ভোটারদের না পেয়ে রুমের সামনে লিফলেট বা প্রচারপত্র রেখে আসা হয়েছে।

হলের শিক্ষার্থী ও প্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিটি হলেই প্রচারে একক আধিপত্য ধরে রেখেছে ছাত্রলীগ। অন্যান্য সংগঠন হলগুলোতে প্রচার চালালেও তা জোরালো ছিল না।

দেখা গেছে, প্রতিটি হলে কক্ষে কক্ষে গিয়ে শিক্ষার্থীদের কাছে ভোট চাইছিলেন প্রার্থীরা। কুশল বিনিময়ের পর লিফলেট ধরিয়ে ভোট চাওয়ার পাশাপাশি পাশে থাকার অঙ্গীকারও করেছেন।

ছাত্রী হলেই ভয় ছাত্রলীগের : বিশ্ববিদ্যালয়ের সব হলেই ছাত্রলীগের একচ্ছত্র আধিপত্য থাকলেও ভোটের ক্ষেত্রে ছাত্রী হলের হিসাব একটু ভিন্ন। প্রশাসনিকভাবে সিট বণ্টন হওয়ায় সেখানে ছাত্রসংগঠনের প্রভাব কিছুটা কম। অভিযোগ আছে, ছাত্রলীগ হলে দখলদারি রাখলেও প্রায়ই সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন সংগঠনের নেত্রীরা। এতে ছাত্রীদের বড় অংশই ছাত্রলীগ বিমুখ। এতে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সম্ভাবনা বেশি বলে মনে করছে ছাত্রীরা। যদিও ভুলত্রুটি ভুলে গিয়ে বন্ধু হয়ে থাকার আশ্বাস দিচ্ছেন ছাত্রলীগের প্রার্থীরা।

জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এক-তৃতীয়াংশ ছাত্রী। কাজেই ছাত্রীদের ভোট ডাকসু ভোটের হিসাব পাল্টে দিতে পারে।

রোকেয়া হলের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের এক শিক্ষার্থী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অতীতে হল ছাত্রলীগের নেত্রীরা চরম দুর্ব্যবহার করেছেন। কাউকে কাউকে দিয়ে কাপড় ধোয়ানো, ক্যান্টিন থেকে খাবার আনানো ছাড়াও মিটিং-মিছিলে যেতে চড়াও হয়েছেন তাঁরা। কিন্তু এখন এই চিত্র পাল্টে গেছে, দেখা হলে হাসিমুখে কথা বলেন।’

কারুশিল্প বিভাগের চতুর্থ বর্ষের আবাসিক শিক্ষার্থী মিফতু মনি হক মৌ বলেন, ‘নির্বাচন খুব বেশি ভালো হবে না বলেই মনে হচ্ছে। কারণ হলের ভেতরে ভোটকেন্দ্র, যেকোনো দলেরই নিয়ন্ত্রণের সুযোগ থাকবে। এ জন্য শঙ্কা কাজ করছে।’ 

বাড়ছে না ভোট প্রদানের সময় : এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার ৪২ হাজার ৯২৩ জন। আগামীকাল সোমবার ভোট হবে সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত। ছাত্রলীগ ছাড়া সব সংগঠন ও প্রার্থীরা সময় বাড়ানোর দাবিতে একাট্টা হলেও প্রশাসন রাজি নয়। তারা বলছে, দুপুর ২টার মধ্যে যারা ভোটকেন্দ্রে আসতে পারবে তারাই ভোট দিতে পারবে। প্রতি ১০০ জন ভোটারের জন্য একটি বুথ স্থাপন করা হবে।

নাম প্রকাশ না করে একজন অনাবাসিক শিক্ষার্থী বলেন, ‘যদি আগে থেকে ভোট প্রদানের লাইন পূর্ণ থাকে তাহলে অনাবাসিক শিক্ষার্থীরা কিভাবে ২টার মধ্যে লাইনে দাঁড়াবে। একজন ভোটারের ৩৮টি করে ভোট দিতে হবে, যা দু-চার মিনিটে দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ফলে জট বেঁধে গেলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা কিভাবে ভোট দেবে?’

ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতির মাস্টার্সের অনাবাসিক শিক্ষার্থী জুবায়ের আহমেদ বলেন, ‘উৎসবের সঙ্গে শঙ্কাও রয়েছে—আমরা সুষ্ঠুভাবে ভোট দিতে পারব কি না! যদি সুষ্ঠুভাবে ভোট দিতে পারি তাহলে বাংলাদেশের নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে মানুষের মনে আশা জাগবে।’

যাতায়াত বড় সমস্যা : বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট শিক্ষার্থীর ৪০ শতাংশই অনাবাসিক। ফলে ভোটের দিন সব রুটে নিয়ম অনুযায়ী বাস চলবে কি না তা নিয়ে শঙ্কায় আছে তারা। বাস চলাচলে দেরি হলে অনাবাসিক ভোটারদের সঠিক সময়ে কেন্দ্রে পৌঁছানো সম্ভব হবে না। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, যথানিয়মেই পরিবহন চলবে।

ইসলামিক স্টাডিজের তৃতীয় বর্ষের অনাবাসিক শিক্ষার্থী শাহ জালাল বলেন, ‘আমরা এখনো দ্বিধান্বিত বাস চলবে কি না বা কোন সময় কোন রুটে বাস থাকবে! একটা বাস যদি ১২টায় টঙ্গী থেকে ছাড়ে তাহলে কিভাবে সে যথাসময়ে ভোটকেন্দ্রে পৌঁছবে?’

প্রার্থীদের বক্তব্য : সহসভাপতি (ভিপি) পদে প্রগতিশীল ছাত্র ঐক্যের প্রার্থী লিটন নন্দী বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ভোটের যে পরিবেশ তা নিরপেক্ষ নয়। এটা সুষ্ঠু ভোটের অন্তরায় হিসেবে কাজ করবে। প্রশাসন মিডিয়ার ওপর অবরোধ আরোপ করেছে, যেটা শিক্ষার্থীদের মাঝে সংশয়ের উদ্রেক করেছে। আমরা প্রতিটি রুটে ১০টি করে বাস চালু রাখার দাবি জানিয়েছি।’

সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে ছাত্রদলের প্রার্থী আনিসুর রহমান খন্দকার অনিক বলেন, ‘ভোটকেন্দ্রে সংবাদমাধ্যমের প্রবেশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের মাঝে সুষ্ঠু ভোট নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।’

সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে কোটা সংস্কারপন্থীদের প্রার্থী ফারুক হোসেন বলেন, ‘নির্বাচনের পরিবেশ ভালো। তবে শঙ্কা হলো, প্রশাসন সদিচ্ছার পরিচয় দিচ্ছে না।’

জিএস পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী এ আর এম আসিফুর রহমান বলেন, ‘গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করাই শিক্ষার্থীদের মাঝে ভোট কারচুপির শঙ্কা তৈরি করছে। তবে আমরা আস্থা রাখতে চাই। প্রশাসন শিক্ষার্থীদের ওপর একক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিচ্ছে, যা সুষ্ঠু নির্বাচনের অন্তরায়।’

এজিএস পদে ছাত্রলীগের প্রার্থী সাদ্দাম হোসেন বলেন, ১১ মার্চ ছাত্রলীগের পুরো প্যানেল নিরঙ্কুশ বিজয় পেতে যাচ্ছে। ডাকসু নির্বাচন ঘিরে একটা গোষ্ঠী জল ঘোলা করার চেষ্টা করছে।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য : সহকারী রিটার্নিং অফিসার অধ্যাপক আবদুল বাছির কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা যাতে সুষ্ঠুভাবে ভোট দিতে পারে সে জন্য সব ব্যবস্থাই আমরা নিয়েছি। আশা করছি, একটি ভালো নির্বাচন আমরা উপহার দিতে পারব। এবারের নির্বাচনে ২২৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। সব প্রার্থীর পোলিং এজেন্ট থাকলে ভোটগ্রহণ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হবে না। তবে ভোট গণনার সময় পোলিং এজেন্টরা থাকতে পারবে। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সব কটি রুটে স্বাভাবিক সময়ের মতো বাস সার্ভিস চালু থাকবে।’

 



মন্তব্য