kalerkantho


বাড়িভাড়ায় সেই নৈরাজ্য আইন মানে না কেউ

রেজাউল করিম    

৯ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০



বাড়িভাড়ায় সেই নৈরাজ্য আইন মানে না কেউ

বছর ঘুরতে না ঘুরতেই বাড়িওয়ালারা ইচ্ছামতো ভাড়া বাড়িয়ে দিচ্ছেন। বছরে একাধিকবার ভাড়া বাড়ানোরও অভিযোগ রয়েছে। এ জন্য ১৯৯১ সালের ত্রুটিপূর্ণ আইন, উচ্চ আদালতের ২০১৫ সালের একটি আদেশ বাস্তবায়িত না হওয়া এবং ভাড়াটিয়ার অসচেতনতাকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।

রাজধানীর মগবাজার ওয়্যারলেসের গ্রিনওয়ে এলাকার ৪৭/১ নম্বর ভাড়া বাসা ছেড়ে গত মাসের প্রথম দিন পূর্ব রামপুরার তিতাস রোড এলাকায় নতুন করে বাসা ভাড়া নিয়েছেন ব্যাংক কর্মকর্তা তারেক আল মামুন। কারণ গত বছরের ডিসেম্বরে ১৭ হাজার টাকার ভাড়া বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা ঘোষণা করে বাড়িওয়ালা। তারেক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গত বছরের জানুয়ারি মাসেই দুই হাজার টাকা ভাড়া বাড়িয়েছিল। এক বছরের মাথায় তিন হাজার টাকা বাড়ায়।’

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তানজিম আল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৯১ অনুযায়ী, প্রতি দুই বছর পর বাড়িওয়ালা বাড়িভাড়া বাড়াতে পারবে। তবে তা-ও হতে হবে যুক্তিসংগত।

ব্যতিক্রমী প্রতিবাদ : প্রায় সব ভাড়াটিয়া হয় এই অন্যায় মেনে নেয় কিংবা বাসা পাল্টায়। তবে ব্যতিক্রম আছে। সিদ্ধেশ্বরী এলাকায় ১২১/৭-এর তৃতীয় তলায় একটি ফ্ল্যাটে পরিবারসহ ভাড়া থাকেন গার্মেন্ট অ্যাকসেসরিজ ব্যবসায়ী দেওয়ান মুরাদ হোসেন। তিনি গত বছরের জানুয়ারি মাস থেকে বাড়িওয়ালার হাতে ভাড়া দেন না, দিচ্ছেন আদালতের মাধ্যমে। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাড়িওয়ালা হঠাৎ চার হাজার টাকা ভাড়া চাপিয়ে দিলে আমি ঢাকার সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে মামলা (নম্বর ৮৬/২০১৮) করি। আমি অনেকটা জেদ করেই বাসাটি ছাড়ছি না।’

জানা যায়, বিরোধের ক্ষেত্রে ভাড়াটিয়াকে সরকারের ভাড়া নিয়ন্ত্রক অর্থাৎ সিনিয়র সহকারী জজের বরাবর দরখাস্ত এবং একই সঙ্গে ভাড়ার টাকাও জমা দিতে হবে। এ জন্য একজন আইনজীবীর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রক বরাবর আবেদন করতে হবে। ভাড়া নিয়ন্ত্রক শুনানির পর ভাড়া আদালতে জমা দেওয়ার পক্ষে রায় দিতে পারেন।

এক রিটে দশক পার : হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইচআরপিবি) ২০১০ সালে রিট আবেদন করলে হাইকোর্ট ওই বছরের ১৭ মে রুল জারি করেন বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত আইন ও বিধি-বিধান কার্যকর করতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে। শুনানি শেষ হয় ২০১৩ সালের মে মাসে। ২০১৫ সালের ১ জুলাই রায় আসে। তবে ২০১৯ সালে এসেও দেখা যায়, উচ্চ আদালতের আদেশটি বাস্তবায়িত হয়নি। রায়ে বলা হয়েছিল, মন্ত্রিপরিষদসচিব ছয় মাসের মধ্যে একটি কমিশন গঠন করবেন; যার নেতৃত্বে থাকবেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক, আইন মন্ত্রণালয়ের মনোনীত একজন আইন বিশেষজ্ঞ, একজন অর্থনীতিবিদ, নগর ও গৃহায়ণ বিশেষজ্ঞ, বাড়িভাড়া বিষয়ক এনজিওর একজন প্রতিনিধি ও পূর্ত মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিনিধি। এই কমিশন ভাড়াটিয়া ও বাড়ির মালিকদের মতামত শুনে, প্রয়োজনে গণশুনানির মাধ্যমে এলাকাভিত্তিক সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন ভাড়া নির্ধারণ করবে। পাশাপাশি দেশের ভাড়াটিয়া ও বাড়ির মালিকদের বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করে প্রতিকারের সুপারিশ করবে। রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, কমিশন যেসব সুপারিশ করবে, তা আইনি কাঠামোর রূপ না পাওয়া পর্যন্ত ১৯৯১ সালের বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের ৩ ধারা অনুযায়ী প্রতিটি ওয়ার্ডে বাড়িভাড়া সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য একজন করে নিয়ন্ত্রক, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রক ও উপনিয়ন্ত্রক নিয়োগের উদ্যোগ নিতে হবে। সাড়ে তিন বছরে এমন কোনো উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানা যায়নি।

আইন মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, রায়টি প্রকাশ হওয়ার আগেই হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের বিচারপতি বজলুর রহমান সানা মৃত্যুবরণ করেন। ফলে পূর্ণাঙ্গ রায় আর প্রকাশ হয়নি। মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, হাইকোর্ট বা আপিল বিভাগের কোনো রায়/আদেশ পূর্ণাঙ্গ আকারে প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত সেটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।

এইচআরপিবির চেয়ারম্যান আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। তিনি বলেন, রায়টি বাস্তবায়ন করা গেলে বাড়িভাড়া সংক্রান্ত সমস্যা অনেকটাই কমে আসত।

কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, ‘১৯৯১ সালের আইনটি ত্রুটিপূূর্ণ। আইনটি এখন পর্যন্ত কার্যকরও হয়নি। আইনের প্রয়োগ না থাকায় বাড়িওয়ালারা ইচ্ছামতো বাড়িভাড়া বাড়াচ্ছেন।’ আইনটির দুর্বল দিক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কোন কর্তৃপক্ষ বাড়িভাড়া ঠিক করবে, এটা পর্যন্ত ঠিক নেই। রেন্ট কন্ট্রোলের কথা বলা হয়েছে; কিন্তু কোথায় তারা, কার কাছে মামলা করতে হবে, এ ব্যাপারে সাধারণ মানুষের কোনো জ্ঞান নেই।’

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তানজিম আল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ১৯৯১ সালের আইনটির প্রয়োগে সরকার যথাযথ উদ্যোগ নিলে সমস্যা কমে আসবে। তিনি বলেন, বাড়িওয়ালা যদি ভাড়া বাড়ানোর অজুহাতে ভাড়াটিয়াকে উচ্ছেদের চেষ্টা করে, তাহলে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ এবং ভাড়া নিয়ন্ত্রকের কাছে অভিযোগ বা আরজি দায়ের করা যাবে।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরেও অভিযোগ করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগে দায়িত্বরত কর্মকর্তা আব্দুল জব্বার মণ্ডল বলেন, ‘আইন না মেনে কোনো গ্রাহককে বাড়িওয়ালারা বঞ্চিত করলে ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরে অভিযোগ করতে পারবেন যে কেউ। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনটি সংশোধন করা হলেই এই বিধান যোগ হবে। আইনের খসড়াটি এখন আইন মন্ত্রণালয়ে রয়েছে।’

জানা গেছে, সিটি করপোরেশন নির্ধারিত গুলশান এলাকার প্রতি বর্গফুট বাড়িভাড়া ১৫ থেকে ১৮ টাকা, বনানীতে ১৪ থেকে ১৬, মহাখালীতে ১১ থেকে ১২, নাখালপাড়ায় ছয় থেকে সাত, কল্যাণপুর-পল্লবীতে ছয়, উত্তরায় পাঁচ থেকে ৯, শান্তিবাগে পাঁচ থেকে ছয়, নয়াপল্টনে ৯, শান্তিনগরে আট থেকে ৯, জিগাতলায় আট ও ধানমণ্ডিতে আট থেকে ১৩ টাকা। ভাড়াটিয়াদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত ভাড়া সম্পর্কে তারা কিছু জানে না।

মগবাজার ওয়্যারলেসের গ্রিনওয়ে এলাকার ৪৭/১ নম্বর বাড়ির মালিক তপন হাবিব লিংকন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যার বাড়ি আছে সেই বোঝে। আপনারা তো কত আরামে থাকেন, সেই চিন্তা করেন না। মাসে একবার ভাড়া দিলেই বেঁচে যায় ভাড়াটিয়া।’ তিনি যুক্তি দেখান, ‘ভাড়ার ওপর আমাকে ট্যাক্স দিতে হয়। সিটি করপোরেশেনের হোল্ডিং ট্যাক্সও দিতে হয়। এলাকায় একটি সোসাইটি রয়েছে, সেখানেও প্রতি মাসে একটি অঙ্কের টাকা দিতে হয়। প্রতিবছর বাড়ির কাজ করাতে হয়। এভাবে ভাড়ার অনেকটাই চলে যায় অন্যদিকে। আবার বাড়ির জন্য একটি মেইনটেন্যান্স খরচ আছে প্রতি মাসে। ফলে আমরা ভাড়া বাড়াতে বাধ্য হই।’

এদিকে রাজধানীর বনানী ১৬ নম্বর সড়কের ৬২/গ বাড়ির মালিক জিয়াউল হাসান বলেন, ‘আমার বেশির ভাগ ভাড়াটিয়া পাঁচ বছরের অধিক সময় ধরে রয়েছে। গত পাঁচ বছরে মাত্র একবার ভাড়া বাড়িয়েছি।’ তাঁর ভাড়াটিয়াদের একজন নাজমুল হাসান রনি আন্তর্জাতিক একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘আমরা ভালো আছি; কিন্তু আমাদের পাশের একটি অ্যাপার্টমেন্ট থেকেই এ বছরের গোড়ার দিকে ছয়জন ভাড়াটিয়া চলে গেছেন ভাড়া বাড়ানোর যন্ত্রণায়।’

আইনজ্ঞরা বলেছেন, রাজধানীতে বসবাসকারীদের ৮০ শতাংশই ভাড়া বাড়িতে থাকে। এই ৮০ শতাংশ নাগরিকের ১৫ শতাংশ মানুষের কাছে জিম্মিদশায় থাকা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়।



মন্তব্য