kalerkantho


অক্ষত বাঁধ পুরো নষ্ট দেখিয়ে ২০০ প্রকল্প!

শামস শামীম, সুনামগঞ্জ   

৬ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০



অক্ষত বাঁধ পুরো নষ্ট দেখিয়ে ২০০ প্রকল্প!

সুনামগঞ্জের ৩৭টি হাওরে চলতি অর্থবছরে দুই শতাধিক ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প অপ্রয়োজনীয়। এতে সরকারের প্রায় ৩০ কোটি টাকার অপচয় হয়েছে বলে মনে করেন স্থানীয় কৃষক নেতারা। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ফোরামে ফসলরক্ষা বাঁধ তদারকির দায়িত্বে থাকা জেলা কাবিটা বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটিকে অবগত করা হলেও অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বাতিল করা হয়নি। অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পে তেমন কাজও হয়নি বলে মনে করেন স্থানীয় কৃষক নেতারা।

হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলনের কয়েকজন নেতা জানান, সম্প্রতি ১১ উপজেলা পরিদর্শন করে তাঁরা অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প দেখতে পান। তাঁরা জানান, গত বছর বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলোর মধ্যে দুই শতাধিক প্রকল্পের কাজ মোটামুটি অক্ষত ছিল। ওই বাঁধগুলোর সামান্য অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। কিন্তু পুরো বাঁধই ক্ষতিগ্রস্ত দেখিয়ে নতুন প্রকল্প বানিয়ে বাড়তি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি প্রকল্পে গড়ে ৮-২২ লাখ টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নকালে কমিটির লোকজন উপজেলা কমিটির সভাপতি ও সদস্য সচিবদের যোগসাজশে বাঁধগুলো নতুন দেখাতে ওপরের আবরণ সরিয়ে মাটির প্রলেপ দিয়েছে। কোদাল দিয়ে ওপরের আবরণ ঘষে কোথাও কোথাও সামান্য মাটি ফেলা হয়েছে।

ওই নেতাদের মতে, জেলায় বড় ৩৭টি হাওরে দুই শতাধিক অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পে অপচয় হয়েছে প্রায় ৩০ কোটি টাকা। এর প্রতিবাদে তাঁরা মানববন্ধন ও সমাবেশও করেছেন।

হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলনের সহসভাপতি মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি পাঁচ উপজেলায় অন্তত ৪০টি প্রকল্প ঘুরেছি। এর মধ্যে ২০টিকেই অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছে। এসব বাঁধে অধিক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের হিসাবে ৫৬৭ প্রকল্পের মধ্যে ২০০টিই অপ্রয়োজনীয়। এসব অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পে প্রয়োজনের চেয়ে ৩০ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ দেওয়ার প্রমাণ পেয়েছি। এ বিষয়ে আমরা মানববন্ধন, স্মারকলিপিসহ নানা কর্মসূচি দিয়েছিলাম।’

হাওরের কৃষি ও কৃষক রক্ষা পরিষদের সভাপতি, সাবেক কলেজশিক্ষক চিত্তরঞ্জন তালুকদার কালের কণ্ঠকে বলেন, নীতিমালা অনুযায়ী কোথাও কাজ হয়নি। অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে পিআইসি গঠনকালেই। অনেক বাঁধে প্রয়োজন ছাড়া অতিরিক্ত বরাদ্দ দিয়ে সরকারি টাকা অপচয় করা হয়েছে।

আবু সুফিয়ান জানান, তিনি সম্প্রতি দিরাই, তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, বিশ্বম্ভরপুর ও সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় অন্তত ৪০টি বাঁধ পরিদর্শন করে দেখতে পান, ওই ২০টির ৯০ শতাংশই অক্ষত। কিন্তু প্রাক্কলন করা হয়েছে পুরো বাঁধের। তাহিরপুর-জামালগঞ্জ নিয়ে বিস্তৃত মাটিয়ান হাওরে সাতটি প্রকল্পের চারটি বাঁধই অক্ষত। প্রতিটি বাঁধেই ১৫-২২ লাখ টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এখন বাঁধগুলোর ওপরের দূর্বা ঘাসের আবরণ সরিয়ে অল্প মাটির প্রলেপ দিয়ে নতুন দেখানোর চেষ্টা করছে পিআইসি। আবু সুফিয়ান বলেন, ‘সরকারের বিভিন্ন সংস্থার নেতৃত্বে পরিদর্শনে গিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উপসহকারী প্রকৌশলী মো. ইমরান হোসেনকে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি আমাকে জানান, প্রাক্কলনের সময় পানি থাকায় যথাযথভাবে ইস্টিমেট করা সম্ভব হয়নি। পানি সরে যাওয়ার পর পুনরায় কেন প্রাক্কলন করা হলো না জানতে চাইলে তিনি কোনো সদুত্তর দেননি।’

আবু সুফিয়ান আরো বলেন, দিরাই উপজেলার রফিনগর ইউনিয়নের আটটি, দক্ষিণ সুনামগঞ্জের পাথারিয়ায় দুটি, জামালগঞ্জের বেহেলি ইউনিয়নে দুটি, বিশ্বম্ভরপুর ও সদরে আরো চারটি বাঁধ অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছে। ওই বাঁধগুলো পুরনো আকৃতিতে থাকলেও এখন প্রলেপ দিয়ে নতুন দেখানো হচ্ছে। তা ছাড়া অধিকাংশ বাঁধেই উচ্চতা, প্রস্থ ও দৈর্ঘ্য অনুযায়ী মাটি ফেলা হয়নি। লাগানো হয়নি ঘাস। কমপ্যাকশন (মাটি পিটিয়ে শক্ত) করা হয়নি। ওই দুই খাতে আলাদা বরাদ্দ আছে।

সুুনামগঞ্জ পাউবো সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণের জন্য ৫৬৭টি প্রকল্প হাতে নেয় জেলা কাবিটা (কাজের বিনিময়ে টাকা) মনিটরিং ও বাস্তবায়ন কমিটি। এতে বরাদ্দ দেওয়া হয় ৯৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। নতুন নীতিমালায় কেবল কৃষক ও বাঁধ এলাকার জমির মালিকদের প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটিতে (পিআইসি) রাখার কথা। গত বছরের অক্টোবর-নভেম্বরে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নেতৃত্বে গণশুনানির মাধ্যমে পিআইসি করার কথা ছিল। কিন্তু হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলনের নেতাসহ স্থানীয় কৃষক ও সচেতন লোকজন জানান, নতুন কাবিটা নীতিমালা মানা হয়নি। ফলে পিআইসি গঠন থেকেই দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি শুরু হয়। রাজনৈতিক প্রভাবে জমির মালিক না হয়েও পিআইসিতে ঠাঁই পায় অনেকে।

সুনামগঞ্জ সদরের ৩নং প্রকল্প সরেজমিন ঘুরে অপ্রয়োজনীয় হিসেবে চিহ্নিত করেন হাওর বাঁচাও আন্দোলনের নেতারা। তাঁদের অভিযোগ, কানলার হাওর, জোয়ালভাঙ্গা ও খরচার হাওরেও কিছু অংশ মেরামতের প্রয়োজন থাকলেও চার গুণ বেশি অর্থ দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও উপজেলা কমিটির সভাপতি ইয়াসমিন নাহার রোমা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার উপজেলায় স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানরা ৬৫টি প্রকল্পের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। আমরা ৯টি প্রকল্প গ্রহণ করেছি। কোনো প্রকল্পই অপ্রয়োজনীয় নয়। পাউবোর টেকনিক্যাল কমিটি ও স্থানীয় সুবিধাভোগীদের মতামতের ভিত্তিতেই প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।’

পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী এবং জেলা কাবিটা মনিটরিং ও বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য সচিব মো. আবু বক্কর সিদ্দিক ভূইয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, স্থানীয় জনগণের চাহিদার ভিত্তিতে পিআইসি গঠন করেছে উপজেলা কমিটি। উপজেলা থেকেই প্রাক্কলন করে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অপ্রয়োজনীয় বাঁধের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘কিছু বাঁধের ব্যাপারে অভিযোগ এসেছে। আমরা এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করেছি।’

সদর উপজেলার গৌরারং ইউনিয়নের নল্লুয়া গ্রামের কৃষক গোলাম জিলানী বলেন, ‘সরকার আমাদের হাওরের জন্য বিপুল বরাদ্দ দিয়েছে। এই অর্থ দিয়ে ভালোভাবে কাজ করলে বাঁধগুলো ঠেকসই হতো। কিন্তু নকশা অনুযায়ী কাজ করে না পিআইসি। তা ছাড়া প্রয়োজন ছাড়াও প্রকল্প দেওয়ায় মোটা অঙ্কের অর্থ অপচয় হয়েছে। আমাদের এলাকার ৫নং ও ৩নং পিআইসি অপ্রয়োজনীয়। ৩নং প্রকল্পে কেবল মাটির প্রলেপ দিয়ে অর্থ লোপাটের প্রস্তুতি চলছে।’

শাল্লা উপজেলার ১৭নং পিআইসিকে ২২ লাখ ৮৪ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ওই বাঁধে গত অর্থবছরেও কাজ করায় এখনো অক্ষত। তাই ওই বাঁধে এত বরাদ্দ প্রয়োজন ছিল না বলে মনে করেন স্থানীয় কৃষক কবিন্দ্র চন্দ্র দাস ও নেপাল চন্দ্র দাস। ১০ ও ১২নং প্রকল্পে গত বছর কাজ হওয়ায় সেটি এখনো ভালো আছে। কিন্তু ওই দুটি প্রকল্পেও ২৫ লাখ টাকার মতো অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ৪২নং প্রকল্পটিও অক্ষত থাকা সত্ত্বেও বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৮ লাখ ৮৯ হাজার টাকা। ৩৯নং প্রকল্পে ২০ লাখ ৭২ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও এটি হাওরের ফসলরক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত নয় বলে জানায় স্থানীয় কৃষকরা। কালিকোটা হাওরের ৬৫নং প্রকল্পে ২৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই বাঁধটিতেও অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ছায়ার হাওরের ৭৫নং প্রকল্পের পশ্চিম দিকে মন্নানপুর গ্রামসংলগ্ন ১৬ লাখ ১৬ হাজার টাকা বরাদ্দের প্রয়োজন ছিল না বলে স্থানীয়রা জানায়। দিরাই উপজেলার চাপতির হাওরের ১১(ক) নং প্রকল্পে ২৩ লাখ টাকা, ৩৯নং প্রকল্পে ৮ লাখ ৯০ হাজার টাকা এবং ১০১নং প্রকল্পে ১৯ লাখ ৪৬ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ওই তিনটি প্রকল্প অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করছে স্থানীয় কৃষকরা। ভাটিপাড়ার ৭০নং প্রকল্পটিও স্থানীয়দের মতে অপ্রয়োজনীয়। বাঁধে কেবল মাটির প্রলেপ দেওয়া হয়েছে। কৃষকদের দাবি, সদরের রঙ্গারচর ইউনিয়নের কাংলার হাওরে ৬নং প্রকল্পে আট লাখ ৮০ হাজার টাকা অহেতুক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

শাল্লা উপজেলা পাউবোর উপসহকারী প্রকৌশলী মো. শমসের আলী বলেন, কৃষক, জনপ্রতিনিধিদের মতামতের ভিত্তিতে উপজেলা কমিটি প্রকল্প অনুমোদন করেছে। অনুমোদিত প্রতিটি প্রকল্পই প্রয়োজনীয়।



মন্তব্য