kalerkantho


ধানরক্ষা বাঁধ ভাঙে দুর্নীতির তোড়ে

নাসরুল আনোয়ার ও হাফিজুর রহমান চয়ন,হাওরাঞ্চল শামস শামীম, সুনামগঞ্জ   

৫ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০



ধানরক্ষা বাঁধ ভাঙে দুর্নীতির তোড়ে

হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারকাজ শেষ করার কথা ছিল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি। নির্ধারিত সময়সীমা পার হওয়ার চার দিন পরও বেশির ভাগ প্রকল্পেই কাজ শেষ হয়নি। গতকাল সোমবার পর্যন্ত সুনামগঞ্জ জেলায় ৯০ শতাংশ, নেত্রকোনায় ৯০ শতাংশ এবং কিশোরগঞ্জে ৭০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ দাবি করলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন রকম। স্থানীয় কৃষক ও সংগঠকদের মতে, কিশোরগঞ্জে কাজ হয়েছে ৫০ শতাংশের মতো। জেলার কোথাও কোথাও কাজ শুরুই হয়েছে নির্ধারিত সময়ের দেড় মাস পরে। সুনামগঞ্জে কাজ এগিয়েছে ৬০ শতাংশের মতো। ওই দুই জেলায় প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠন থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন পর্যায়ে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ আছে। সুনামগঞ্জের কেবল ধর্মপাশা উপজেলায় ছয়টি পিআইসির সভাপতিদের সামান্য পরিমাণ জরিমানা করা ছাড়া অনিয়মের বিষয়ে সামগ্রিকভাবে পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

এদিকে নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ ও খালিয়াজুরী উপজেলার সব প্রকল্পেই মাটি কাটার কাজ শেষ হয়েছে। এখন কমপ্যাকশন (দুরমুজ দিয়ে মাটি শক্ত করা) ও ঘাস লাগানোর কাজ চলছে।

অকাল বর্ষণ-বন্যা আর পাহাড়ি ঢলে ২০১৭ সালে সাত জেলার হাওরে ব্যাপক ফসলহানির কারণে সারা দেশে চালের দাম চড়ে গিয়েছিল। বেসরকারি খাতে শুল্ক পুরোপুরি তুলে দিয়ে বিদেশ থেকে চাল আমদানি করতে হয়েছিল সরকারকে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর এবং চলতি বছরেও হাওরে ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারকাজে সরকার বরাদ্দ বাড়িয়ে দেয় উল্লেখযোগ্য হারে। কিন্তু অনিয়ম ও গাফিলতির

কারণে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি। কাজের মান নিয়েও আছে বিস্তর অভিযোগ। কোথাও কোথাও বাঁধের গোড়া থেকে মাটি তুলে বাঁধ আরো দুর্বল করে দেওয়া হচ্ছে। এ অবস্থায় ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে দুই দফায় বৃষ্টি ঝড় আর গতকাল থেকে আবার আকাশ কালো করা মেঘ দেখে কয়েক লাখ কৃষকসহ কোটি মানুষের মনে দেখা দিয়েছে আতঙ্ক।

ধর্মপাশায় বিস্তর অনিয়ম : গত শুক্র ও শনিবার সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার চন্দ্র সোনারথাল হাওরে ফসলরক্ষা বাঁধ মেরামত কাজের ২, ৩, ৪, ৩৩, ৩৪, ৩৫, ৩৬, ৩৭, ৩৮ নম্বর প্রকল্প; একই উপজেলার কাইলানী হাওর রক্ষা বাঁধ প্রকল্পের ৫৩, ৫৪, ৫৫, ৫৬ নম্বর প্রকল্প; ঘুরাডোবা হাওরে ৪৫ ও ৪৭ নম্বর প্রকল্প এবং গুরমা হাওরে ৬০, ৬১ ও ৬২ নম্বর প্রকল্প এলাকা ঘুরে বাঁধ মেরামতকাজে এক্সকাভেটরের (মাটি কাটার যন্ত্র) চালক ছাড়া পিআইসির কোনো সদস্যকে পাওয়া যায়নি। চন্দ্র সোনারথাল হাওরে ২ নম্বর প্রকল্পসহ বেশ কয়েকটি স্থানে এক্সকাভেটর দিয়ে বাঁধের গোড়া থেকে মাটি কেটে বাঁধে ফেলা হচ্ছিল। আবার কোনো কোনো বাঁধে এবড়ো-খেবড়োভাবে মাটি কেটে ফেলে রাখা হলেও সেখানে কমপ্যাকশন কাজের কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। প্রকল্পগুলো কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা) কর্মসূচির আওতায় থাকায় শ্রমিক দিয়ে কাজ করানোর কথা।

ওই সময় উপজেলার মামুদনগর গ্রামের কৃষক শমসের আলী, আনিছ মিয়াসহ বেশ কয়েকজন ক্ষোভ প্রকাশ করেন। শমসের আলী বলেন, ‘বাঁধ মেরামত কাজে গাফিলতির কারণে পর পর দুইবার চৈত্র মাসের শুরুতেই পাহাড়ি ঢলে আগাম বন্যায় আমাদের হাওরে বছরের একমাত্র বোরো ফসল তলিয়ে যাওয়ার ক্ষতি আমরা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারিনি। এ বছরও এখনো বাঁধের অর্ধেক কাজ শেষ করতে পারেনি পিআইসি। এ ছাড়া বাঁধের গুঁড়ি (গোড়া) কেটে যেনতেনভাবে বাঁধ মেরামত করা হচ্ছে। এবারও চৈত্র মাসের শুরুতেই পাহাড়ি ঢলে হাওরের যে কী অবস্থা হয় তা একমাত্র আল্লাহই জানেন।’ তাঁর কথার সঙ্গে সুর মেলান অন্যরাও।

বাঁধ মেরামতকাজে অনিয়ম ও গাফিলতির অভিযোগে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি চন্দ্র সোনারথাল হাওরের ছয়টি পিআইসির সভাপতিকে মোট ৪৪ হাজার টাকা জরিমানা করা হয় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে। ওই ছয়জন হলেন রুবেল মিয়া, মো. শাহ আলম, তাজউদ্দিন, আতাউর রহমান, আবুল খায়ের ও এনামুল হক। এ ছাড়া কৃষক না হওয়া এবং বাঁধ এলাকায় কোনো জমি না থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক প্রভাবে হাবিবুর রহমানকে গুরমা হাওরের একটি পিআইসির সভাপতি করা হয় বলে স্থানীয় এক কৃষক সম্প্রতি লিখিতভাবে অভিযোগ করেন।

চন্দ্র সোনারথাল হাওরের ২ নম্বর পিআইসির সভাপতি ও সুখাইড়-রাজাপুর দক্ষিণ ইউপির সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্য শামীমা আক্তার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাটি কাটার মেশিনটা নষ্ট হয়ে এক সপ্তাহ বসে থাকায় বাঁধের কাজে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। তবে শিগগিরই বাঁধ মেরামত শেষ করার জন্য দ্রুত কাজ চলছে।’

বাঁধ মেরামতকাজ তদারকির দায়িত্বে থাকা সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উপসহকারী প্রকৌশলী ও উপজেলা কাবিটা প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য সচিব মাহমুদুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা ঠিকমতোই বাঁধ মেরামতকাজের তদারকি করে যাচ্ছি এবং এ পর্যন্ত প্রায় ৮৩ শতাংশ কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। তবে ১৩টি প্রকল্প গঠনে বিলম্ব হওয়ায় সেগুলোর কাজ শেষ হতে কিছুটা সময় লাগবে। এ ছাড়া এক্সকাভেটর নষ্ট হওয়ার কারণেও পাঁচ-ছয়টি প্রকল্পের কাজ শেষ হতে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে।’ দ্রুতই সব কটি প্রকল্পের কাজই সম্পন্ন করা হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

ধর্মপাশা উপজেলা কাবিটা প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ ওবায়দুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাঁধ মেরামতকাজে অনিয়ম ও গাফিলতির কারণে এরই মধ্যে পিআইসির ছয়জনের কাছ থেকে জরিমানা আদায়সহ মুচলেকা রাখা হয়েছে। দ্রুতই বাঁধের কাজ শেষ করার জন্য আমরা দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছি।’ তিনি আরো বলেন, ‘বাঁধ মেরামতকাজে কোনো ধরনের গফিলতি করা হলে আমরা কাউকেই ছাড় দেব না।’

সুনামগঞ্জে অনিয়ম, ৬০% কাজও হয়নি, প্রতিবাদে মানববন্ধন : নির্ধারিত সময়ের শেষ দিনে অগ্রগতি প্রতিবেদনে জেলায় গড়ে ৮৬ শতাংশ কাজ হয়েছে বলে জানায় সুনামগঞ্জ জেলা কাবিটা বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটি। চার দিন পর গতকাল পর্যন্ত গড়ে ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে বলে দাবি স্থানীয় পাউবোর। তবে কৃষক ও হাওর বাঁচাও আন্দোলনের নেতাদের পর্যবেক্ষণে এ পর্যন্ত কাজ হয়েছে গড়ে ৬০ শতাংশ। তাহিরপুর, শাল্লা ও দিরাই উপজেলার কয়েকটি স্থানে ৩০-৪০ শতাংশ হয়েছে বলে জানান তাঁরা।

তবে ২৮ ফেব্রুয়ারি কাজ শেষ না হওয়ায় পুরো কাজ শেষ করতে আরো ১৫ দিন সময় বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে জেলা কাবিটা মনিটরিং ও বাস্তবায়ন কমিটি। নির্ধারিত সময়ে প্রাক্কলন অনুযায়ী কাজ না হওয়ায় গত ২ মার্চ সুনামগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলা ও ইউনিয়নে মানববন্ধন করেছে হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলন। মানববন্ধনে নেতারা দাবি করেন, এ পর্যন্ত ৫০-৬০ শতাংশ কাজ হয়েছে।

দেরিতে কাজ শুরু করা আর গাফিলতি ও অনিয়মের কারণে এখনো ৬০ শতাংশ কাজও না হওয়ার জন্য পাউবোর কর্মকর্তাদের দায়ী করছে স্থানীয় কৃষকরা। তাদের অভিযোগ, হাওরে জমি নেই এমন লোকদের দিয়ে পিআইসি গঠন করায় কাজে এমন গাফিলতি করা হচ্ছে।

কিশোরগঞ্জে এ মাসেও শেষ হবে কি না সংশয় : কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন হাওরে বাঁধ এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ বাঁধের কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ হয়নি। বরং বেশ কিছু বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরুই হয়েছে দেড়-দুই মাস পরে। ওই সব বাঁধের কাজ মার্চের শেষ সপ্তাহের মধ্যে শেষ হবে কি না সে নিয়ে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কৃষকদের মধ্যে তাই আবারও ফসল হারানোর ভয় কাজ করছে।

এ ছাড়া কাজের ক্ষেত্রে সংশোধিত নীতিমালায় স্পষ্ট ‘কাবিটা’ বলা হলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শ্রমিকের বদলে এক্সকাভেটর ব্যবহার করছে পিআইসি।

চলতি বোরো মৌসুমে কিশোরগঞ্জের চার উপজেলা অষ্টগ্রাম, মিঠামইন, ইটনা ও ভৈরবে ২৫টি পিআইসির মাধ্যমে ৩২ কিলোমিটার বাঁধ সংস্কারের কাজ চলছে। এর জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে চার কোটি টাকা।

পিআইসিতে ক্ষমতাসীনরা : গতকাল সকালেও অষ্টগ্রামের আব্দুল্লাহপুর গ্রামের পাশে চরের বাঁধে কাজ চলছিল। জানা যায়, ৬ নম্বর পিআইসির কাজ শুরু হয় নির্ধারিত সময়ের প্রায় দেড় মাস পর। অষ্টগ্রামের ১নং পিআইসির কাজে এক্সকাভেটর চালাচ্ছিলেন মো. রাজু মিয়া। তিনি জানান, তাঁর সঙ্গে ১২ লাখ টাকায় চুক্তি হয়েছে। ১নং পিআইসির সভাপতি মো. শাহাজ উদ্দিনের দাবি, তাঁর কাজ শেষ পর্যায়ে।

৪নং পিআইসির সভাপতি মো. আ. রশিদ খয়েরপুর-আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি। তিনি জানান, তাঁকে ১২০০ মিটার বাঁধ সংস্কারের জন্য দেওয়া হয়েছে ১০ লাখ টাকা। তিনি পৌনে পাঁচ লাখ টাকায় এক্সকাভেটর ভাড়া করেছেন। কাজও শেষ পর্যায়ে।

অষ্টগ্রামের ইউএনও মো. সালাহ উদ্দিন গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, উপজেলার ৯টি বাঁধের মধ্যে দুটির কাজ শেষ হয়েছে। ওই দুটিতে কমপ্যাকশন ও ঘাস রোপণ চলছে। বাকি সাতটিতেও কাজের অগ্রগতি ৭০ শতাংশ। বাঁধ সংস্কারে দেরির কারণ সম্পর্কে ইউএনওর ভাষ্য, ‘বৃষ্টির জন্য একটু দেরি হয়েছে। আবার এ বৃষ্টি কমপ্যাকশনেও ভূমিকা রেখেছে।’

স্থানীয় কৃষকদের মতে, কাজ হয়েছে ৫০ শতাংশের মতো। তাদের অভিযোগ, পিআইসির অবহেলার কারণেই এ অবস্থা। ওই সব পিআইসির নেতৃত্বে আছেন ক্ষমতাসীন দলের একশ্রেণির নেতা। তাই কাজের মান যাচ্ছেতাই হলেও কেউ কিছু বলছে না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কৃষক বলে, ‘এ কাজে যারা যুক্ত তারাই লাল হচ্ছে। স্থানীয় এমপির ঘনিষ্ঠরাই বরাবর এ সুবিধা পেয়ে আসছে।’

কিশোরগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী এবং জেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটির সদস্য সচিব মো. শফিকুল ইসলাম দাবি করেন, এখন পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি প্রায় ৭০ শতাংশ। নির্ধারিত সময় পার হয়ে যাওয়ার পরও কাজ বাকি থাকার কারণ সম্পর্কে তাঁর ভাষ্য, ‘এ ডিসেম্বর থেকে প্রকল্পের কাজ শুরুর কথা থাকলেও করা যায়নি। তাই দুই সপ্তাহ সময় বাড়ানোর চিন্তা চলছে। গেলবারও সময় বাড়ানো হয়েছিল।’ 

কাবিটা প্রকল্পের কাজ ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক বা উপকারভোগীদের দিয়ে করানোর কথা। তা না করিয়ে যন্ত্র দিয়ে করার কারণ জানতে চাইলে নির্বাহী প্রকৌশলী গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখন আর হাওরে গরিব নেই। ফলে কাজের মানুষ পাওয়া যায় না। তাই এক্সকাভেটরে বাঁধ সংস্কার করা হচ্ছে।’

কৃষি বিভাগের হিসাব মতে, ২০১৭ সালে অকাল বন্যায় হাওরাঞ্চলের সাত জেলায় তিন লাখ ৫৪ হাজার ৫৮০ হেক্টর জমির বোরো ফসল সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সীমাহীন ক্ষতির শিকার হয়েছিল আট লাখ ৩৬ হাজার ৫৩৩টি পরিবার।



মন্তব্য