kalerkantho


কৃষিপণ্যে ‘বিষ’পরীক্ষার ব্যবস্থা নেই কর্তৃপক্ষের

এমআরএল প্রস্তাব ঝুলছে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



কৃষিপণ্যে ‘বিষ’পরীক্ষার ব্যবস্থা নেই কর্তৃপক্ষের

‘সবাই বলছে সবজিতে নাকি বিষ আছে। সকাল থেকে আধাকেজি শিম আর একটা ফুলকপি নিয়া খামারবাড়িতে ঘুরলাম পরীক্ষা করার জন্য। কিন্তু পারলাম না। এইখানে নাকি কোনো কিছুর মধ্যে কীটনাশক বা বিষ আছে কি না, পরীক্ষার কোনো উপায় নাই। তাইলে এরা কীটনাশকের দেখভাল করে কেমনে? কীটনাশকের অনুমোদনই বা দেয় কেমনে?’ মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা স্কুলশিক্ষক আমিরুল ইসলাম অসহায়ের মতো ছুড়ে দেন এ প্রশ্ন।

আমিরুলের ওই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খামারবাড়িতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইংয়ে গেলে কথা হয় একাধিক গবেষকের সঙ্গে। তাঁরা জানান, দেশে কৃষি আর কীটনাশক যেন একই মুদ্রার দুই দিক। পোকা-জীবাণু থেকে ফসল রক্ষা করে ‘নিরাপদ’ উৎপাদন নিশ্চিত করতে চলে কীটনাশকের ব্যাপক প্রয়োগ। দীর্ঘদিন ধরেই দেশে খাদ্য বিষাক্তকরণের জন্য ফল-ফসলে রাসায়নিক কীটনাশককে দায়ী করা হচ্ছে, যা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনারও কমতি নেই। ফল-ফসল নিরাপদ করার নামে যথেচ্ছ কীটনাশক ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষের স্বাস্থ্যকে অনিরাপদ করার দায় চাপছে দেশের কৃষি খাতের ওপরে। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমেও কৃষকদের নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে কীটনাশক ব্যবহারের ক্ষেত্রে বরং ফল-ফসলকে পোকামুক্ত রাখতে বিকল্প প্রাকৃতিক পদ্ধতির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। তা সত্ত্বেও পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি ঘটছে না।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক উদ্বিগ্ন হলেও কৃষি খাতের বিশেষজ্ঞরা অনেকটা উদাসীন। কীটনাশক নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ আছে একরকম নিধিরাম সর্দারের মতো অবস্থায়। এই কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা কীটনাশকের মান পরীক্ষা পর্যন্তই সীমিত। কিন্তু কোনো কৃষিপণ্যে কীটনাশকের অস্তিত্ব আছে কি না, তা পরীক্ষা করার কোনো ব্যবস্থা নেই তাদের। পাশাপাশি বড় কিছু কীটনাশক প্রস্তুত ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে অনেকটা জিম্মি থাকে ওই কর্তৃপক্ষ।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইংয়ের প্রধান দায়িত্বগুলোর মধ্যে আছে সব ধরনের বালাইনাশকের রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট প্রদান, নবায়নসহ সব ধরনের লাইসেন্স (আমদানি, পাইকারি, রি-প্যাকিং, ফর্মুলেশন, বিজ্ঞাপনী ইত্যাদি) প্রদান ও নবায়ন করা; কীটনাশকের মান নিরূপণের প্রক্রিয়া দেখাশোনা এবং এর উৎপাদন, বিক্রয় ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা; কীটনাশক ব্যবহারের পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ ও পরিবীক্ষণ করা এবং পরিবেশ রক্ষার কাজ উন্নয়নের জন্য যথাযথ কার্যক্রম ও নীতিমালার সুপারিশ প্রদান করা ইত্যাদি।

উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইংয়ের সর্বশেষ হিসাব মতে, কৃষিকাজে ব্যবহৃত কীটনাশক-বালাইনাশকের চার হাজার ৮৬১টি আইটেমের অনুমোদন আছে দেশে। এ ছাড়া মশা নিয়ন্ত্রণের ওষুধ হিসেবেও কীটনাশকের অনুমোদন দেওয়া হয় ওই উইং থেকে।

কৃষিপণ্যে কীটনাশক বা বিষাক্ত উপাদান পরীক্ষার সামর্থ্য আছে কি না—জানতে চাইলে উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইংয়ের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক এ জেড এম ছাব্বির ইবনে জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা কীটনাশকের লাইসেন্স দিই, কম্পানির রেজিস্ট্রেশন দিই, কীটনাশকের মান পরীক্ষা-নিরীক্ষা করি; কীটনাশক উৎপাদন, বাজারজাতও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করি। তবে আমাদের আরেকটি বড় দায়িত্ব পালন করা উচিত হলেও সেটা পারছি না; তা হচ্ছে আমরা কোনো ফল-ফসলে বা কোনো কিছুতে কীটনাশক আছে কি নেই, তা পরীক্ষা করতে পারি না। কারণ এ ধরনের পরীক্ষা করার কোনো ল্যাবরেটরি আমাদের নেই। কেউ যখন আমাদের বলে যে আপনারা কীটনাশকের লাইসেন্স দিচ্ছেন, সেই কীটনাশকে ফল-ফসল বিষাক্ত হচ্ছে, তখন আমরা কোনো জবাব দিতে পারি না। কারণ আমরা পরীক্ষাই করতে পারছি না যে ওই ফল ফসলে আদৌ কীটনাশক আছে কি নেই। এমনকি এসংক্রান্ত আমাদের কোনো ডাটা বেইসও নেই।’

এ জেড এম ছাব্বির ইবনে জামান অবশ্য বলেন, ‘ফল-ফসলে কীটনাশক শনাক্তকরণের জন্য এরই মধ্যে একটি আন্তর্জাতিক মানের মেক্সিমাম রেসিডিউয়াল লিমিট (এমআরএল) ল্যাবরেটরি তৈরির প্রকল্প পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে। এটি বাস্তবায়ন হলে আমরা নিজেরাই যেকোনো ফল-ফসলের নমুনা সংগ্রহ করে তা পরীক্ষার মাধ্যমে কীটনাশকের উপস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারব। এখন নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ তাদের একটি ল্যাবে এসব টেস্ট করতে পারে। কিন্তু আমরাদের জন্য তো এটা অপরিহার্য।’

একই উইংয়ের সহকারী পরিচালক মোখলেসুর রহমান বলেন, ‘সারা দেশে আমাদের মাঠ কর্মকর্তারা কাজ করছেন। তাঁরা কীটনাশকের নমুনা সংগ্রহ করে তা ঢাকায় পাঠান। আমরা পরীক্ষা করে কোনো কীটনাশক ভেজাল, নকল বা নিম্নমানের বলে প্রমাণ পেলে তা জব্দ করার জন্য প্রশাসনকে জানাই। রেজিস্ট্রেশন দেওয়া বা বাতিল করা ছাড়া বাস্তবে আমাদের আর কোনো ক্ষমতা নেই। আমাদের নিজস্ব ক্ষমতা নেই। তবে ভেজাল, নকল বা নিম্নমানের কীটনাশক থাকলে তা আমাদের প্রতিনিধির উপস্থিতিতে ধংস করে ফেলি।’

ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘শুধু যে ছোট কম্পানির বিরুদ্ধেই নিম্নমানের কীটনাশক তৈরি করার অভিযোগ আছে তা নয়, অনেক বড় কম্পানিরও ভেজাল ও নিম্নমানের প্রডাক্ট আমরা ধরেছি।’

উইংয়ের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক বলেন, ‘আগে প্লান্ট প্রটেকশন উইং স্বতন্ত্র ছিল, কিন্তু এখন এটা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ফলে আমাদের জনবল এক ধরনের ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছে। শুধু যে কীটনাশক নিয়ে কাজ করবে তা নয়, তাদের এখন আরো অনেক কাজেই ব্যস্ত থাকতে হয়।’

বড় কিছু কম্পানির কাছে জিম্মি থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত পরিচালক কিছুটা এড়িয়ে গিয়েও বলেন, ‘সব সেক্টরেই এখন খারাপ অবস্থা। এমন কিছু চক্র থাকে, যাদের প্রভাব এত বিস্তৃত থাকে যেখানে কিছু বলা যায় না। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া তো দূরের কথা, তাদের ঘাঁটানোও কঠিন হয়ে পড়ে। তবে আমরা যখন অনলাইন রেজিস্ট্রেশন ও মনিটরিং সিস্টেম চালু করব, ফ্যাক্টরির মান নিয়ে কাজ করতে পারব তখন সবাই একটা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আসতে বাধ্য হবে।’

 



মন্তব্য