kalerkantho


মাছ মাংসে যথেচ্ছ অ্যান্টিবায়োটিক

তৌফিক মারুফ   

২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



মাছ মাংসে যথেচ্ছ অ্যান্টিবায়োটিক

গরুর দুধের নমুনায় টেট্রাসাইক্লিন, সিপ্রোফ্লোক্সাসিন, সিপ্রোসিনজাতীয় অ্যান্টিবায়োটিকের অস্তিত্ব ধরা পড়েছে সরকারের জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরীক্ষায়ই। মাছ ও মাংসেও মিলেছে একই ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক, যার বেশির ভাগই মানুষের জন্য সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি। দুধ ও মাছ-মাংসে অ্যান্টিবায়োটিক থাকার কারণ সম্পর্কে বিশেষজ্ঞদের অভিমত, মানুষের যথেচ্ছ অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের প্রবণতা যেমন ঠেকানো যায় না, তেমনি গবাদি পশু, হাঁস-মুরগি বা মাছের ক্ষেত্রেও অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার আরো প্রবল। হাত বাড়ালেই মিলছে গবাদি পশুর অ্যান্টিবায়োটিক।

গবাদি পশু বা হাঁস-মুরগির জন্য ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ আসলেই কতটা সহজলভ্য তার প্রমাণ মেলে রাজধানীর বঙ্গবাজারের পাশে প্রাণীর ওষুধের সারি সারি দোকানে গিয়ে। কোনো প্রেসক্রিপশন বা ব্যবস্থাপত্রের প্রয়োজন হয় না, চাইলেই মিলে যায় যেকোনো অ্যান্টিবায়োটিক।

মুরগির ঝিমুনির ওষুধ আছে কি না জানতে চাইলে পরিচয় না জেনেই হামিদা  ফার্মার বিক্রেতা চটজলদি জবাব দেন, ‘অ্যান্টিবায়োটিক নিতে হবে। অ্যান্টিবায়োটিক ছাড়া কাজ হবে না। তবে দেশি ওষুধ না বিদেশি ওষুধ নিবেন?’ যেটা ভালো হয় সেটা দিতে বললে কয়েকটি কাগজের বাক্স সরিয়ে বের করে আনলেন ‘এ-কোলিস’ নাম লেখা দৃষ্টিনন্দন এক ফয়েল প্যাকেট। ভিয়েতনামের নাফাভেট নামের একটি কম্পানির ওই ওষুধের জেনেরিক উপাদান হলো অ্যামোক্সিসিলিন ট্রাইহাইড্রেট ও কলিস্টিন সালফেট। দুই ধরনের উপাদানের সমন্বিত একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ এটি। বিক্রেতা একটি প্যাকেট হাতে ধরে বলেন, ‘এটার দাম ৪৮০ টাকা। খুব ভালো কাজে দিব।’ বিদেশি এই ওষুধ কিভাবে পেলেন, জানতে চাইলে বিক্রেতা বলেন, ‘এখানে সবই পাওয়া যায়। কী লাগব আপনার?’ মাছের জন্য কোনো অ্যান্টিবায়োটিক চাইলে তিনি আরো উত্ফুল্ল হয়ে ওঠেন। বলেন, ‘পারব না কেন? বলছি না সবই দিতে পারি। এই নেন, একটা দেশি কম্পানির অ্যান্টিবায়োটিক দিলাম। এক বক্স ওষুধের দাম মাত্র ৫০ টাকা। দেখবেন মাছের অসুখ ভালো হয়ে যাবে।’ দেশি কম্পানির ওই অ্যান্টিবায়োটিকের জেনেরিক নাম ‘অক্সিটেট্রাসাইক্লিন’। প্যাকেটের গায়ে স্পষ্ট ‘সতর্কবাণী’ হিসেবে লেখা ‘কেবল মাত্র রেজিস্টার্ড ভেটেরিনারিয়ানের ব্যবস্থাপত্র অনুসারে বিক্রয় ও বিতরণযোগ্য’।

প্রেসক্রিপশন লাগবে কি না জানতে চাইলে বিক্রেতা আরো অবাক হয়ে বলেন, ‘কী যে বলেন, আমি নিজেই তো প্রেসক্রিপশন! আপনে ওষুধ চাইলেন, আমি দিলাম। আর কিসের কি! ওষুধে কাজ না হইলে আমারে আইস্যা বলবেন। আমার নাম হারিসুল। এইখানে সবাই আমারে চিনে। আমার দোকান চেনে।’ তিনি ভেটেরিনারি চিকিৎসক কি না জানতে চাইলে কিছুটা ইতস্তত করে জবাব দেন, ‘তাতে অসুবিধা নাই।’ এরপর তিনি র‌্যাক থেকে একটি মাল্টিভিটামিন পাউডার এনে বলেন, ‘এইটাও নিয়া যান। মুরগির জন্য ভালো হইব, তাগরা হইব। ভালো একটা ভিটামিন।’ ওই প্যাকেটে দেখা যায় এটি দেশি কম্পানির ওষুধ, দাম ২৫ টাকা।

ওই দোকানের পাশে একই সারিতে দেখা মেলে ওষুধ ও প্রাণিখাদ্যের আরো বেশ কিছু দোকান।

কলিস্টিনজাতীয় অ্যান্টিবায়োটিকের কথা শুনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সাইদুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেখছেন, কী সর্বনাশটাই না হচ্ছে! কলিস্টিন হচ্ছে সর্বশেষ জেনারেশনের অ্যান্টিবায়োটিক। যখন অন্য কোনো ওষুধে কাজ করবে না তখন এটা দেওয়া হয়। কিন্তু আমরা এখন খাদ্যচক্রের মাধ্যমে সেগুলো খেয়ে নিচ্ছি। কি বিপদের কথা!’ ওই বিশেষজ্ঞ বলেন, প্রতিদিন যেভাবে মুরগি আর মাছকে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয় তাতে মানুষের ঝুঁকি তো বাড়ছেই, পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পরিবেশের জীবাণুর মধ্যে তৈরি হচ্ছে রেজিস্ট্যান্স (প্রতিরোধ ক্ষমতা)।

পশু-পাখির জন্য ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকের সহজলভ্যতার বিষয়ে জানতে চাইলে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মো. রুহুল আমিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভিয়েতনামের কোনো ভেটেরিনারি ওষুধ এখানে আমদানির অনুমোদন নেই। এটি বৈধভাবে আসেনি। আর কলিস্টিন সালফেট এখন সাধারণভাবে নিষিদ্ধ করার প্রক্রিয়া চলছে। এটা রিজার্ভ রাখার ব্যাপারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা রয়েছে।’

ওই কর্মকর্তা বলেন, স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া আছে—কোনো ভেটেরিনারি চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া প্রাণিসম্পদের কোনো ওষুধ বিক্রি করা যাবে না। কারণ এগুলো মাত্রা ঠিক না রাখলে খাদ্যচক্রের মাধ্যমে মানবদেহে ঢুকে ক্ষতি ঘটাতে পারে। বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিকের ডোজ কম হলে যেমন রেজিস্ট্যান্স তৈরি করে তেমনি বেশি হলে তা গবাদি পশু, মুরগি বা মাছের শরীরে থেকে যায়। আবার এসব মাছ-মাংস বা দুধ ওই অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের কত দিন পর খাওয়ার উপযোগী হবে সেটা মেনে চলতে হবে। তা না হলে বড় বিপদ নেমে আসবে। কারণ এখন অ্যান্টিবায়োটিক খুবই ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেটা যেমন মানুষের তেমনি প্রাণিসম্পদেরও।

প্রাণিসম্পদে অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার সম্পর্কে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ড. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অ্যান্টিবায়োটিকের রেজিস্ট্যান্স এখন বড় টেনশনের ব্যাপার। মাছ-মাংসের মাধ্যমে এটি মানুষের শরীরে ঢুকতেই পারে। আগুনের তাপেও সেটা প্রভাবিত হয় না। এ জন্য এসব ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।’

আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. মাহামুদুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, এমন কিছু ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিক আছে যা মাছ-মাংস বা অন্যান্য খাদ্যের মাধ্যমে মানুষের দেহে প্রবেশ করে। এসব অ্যান্টিবায়োটিক মানুষের কিডনি নষ্টের জন্য ভূমিকা রাখে। তাই দেশে এসব ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক ড. আ ব ম ফারুক কালের কণ্ঠকে বলেন, এ দেশে মানুষের জন্য প্রযোজ্য অনেক অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার হয়ে থাকে গবাদি পশুর জন্য। ফলে হিতে বিপরীত ফল দেয়। আর গবাদি পশুতে এমনিতেই যেনতেনভাবে ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ হচ্ছে। অথচ বিশ্বের কোথাও প্রেসক্রিপশন ছাড়া কোনো অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ বিক্রি করা বা কেনা সম্ভব নয়, শুধু বাংলাদেশেই এটা সম্ভব হচ্ছে। অ্যান্টিমাইক্রোবায়াল রেজিস্ট্যান্সের ফলে বিশ্বে ২০৫০ সাল নাগাদ বছরে প্রায় এক কোটি মানুষ মারা যাবে বলে ধারণা করা হয়।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সাবেক এক কর্মকর্তা বলেন, মানুষের সুষম খাদ্যের জোগান দিতে উৎপাদন নিশ্চিত করতে হয় হাঁস-মুরগিসহ অন্যান্য গবাদি পশুর। আর ওই সব গবাদি পশুকে রোগমুক্ত রাখতে প্রয়োগ করা হয় নানা ওষুধ। কিন্তু দেশের বেশির ভাগ খামারি ওই সব ওষুধ সম্পর্কে সচেতন না হওয়ায় তারা খুব সাধারণ মানের কিছু ধারণা থেকে যখন তখন ইচ্ছামাফিক অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করছে। এর মধ্যে কিছু ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিক শুধু গবাদি পশুরই নয়, মানুষের জন্যও মহাবিপদ বয়ে আনে। কিন্তু এগুলো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ বা মনিটরিংয়ের তেমন কোনো ব্যবস্থা দেখা যায় না।

ওই বিশেষজ্ঞ বলেন, এখন মানুষের নিরাপদ খাদ্যের স্বার্থেই গবাদি পশু-পাখিকে অ্যান্টিবায়োটিকের বিকল্প হিসেবে ‘প্রোবায়োটিক’ ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। সেই সঙ্গে খামারের ব্যবস্থাপনাগত কিছু কৌশল অবলম্বনেও জোর দেওয়া হয়, যাতে রোগবালাই কম হয়।

মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নিয়ম মেনে কিছু অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা যায়। তবে এর যথেচ্ছ ব্যবহারের ব্যাপারে আমরাও সচেতন। আমরা চাষিদের এ ব্যাপারে সচেতন করার বিভিন্ন কার্যক্রম চালাচ্ছি।’

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক (গবেষণা) ড. আইনুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দুধের বিষয়ে সেটা আমরা সঠিক বলে মনে করছি না। আর অ্যান্টিবায়োটিক নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি দেখার দায়িত্ব ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের। তবে আইন অনুসারেই এখন আর কোনো অ্যান্টিবায়োটিক তরল হিসেবে খাওয়ানো যাবে না কোনো গবাদি পশুকে। তবে ওষুধ হিসেবে তা ব্যবহার করা যাবে।’

এদিকে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) উদ্যোগে গত বছর অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার ও এর কার্যকারিতা নিয়ে একটি সমীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছিল। তাতে বলা হয়েছিল, ৫৫.৭০ শতাংশ অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর। ঢাকা শহরে যে রোগজীবাণুর সংক্রমণ ঘটে তার বিরুদ্ধে ৫৫.৭০ শতাংশ অ্যান্টিবায়োটিক কোনো কাজ করে না। সেই সঙ্গে বাংলাদেশে মৎস্য খামারে ১০ ধরনের ও ৫০ শ্রেণির অ্যান্টিবায়োটিক, কীটনাশক ও গ্রোথ এজেন্ট ব্যবহার করা হয়। প্রাণিসম্পদ খাতে ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক মানুষের কিডনি, লিভার ও হৃদযন্ত্রের ক্ষতিসাধন করছে।

 

 



মন্তব্য