kalerkantho


সেবার পরীক্ষায় সব অপারেটর ফেল

কলড্রপে শীর্ষে গ্রামীণফোন

বিশেষ প্রতিনিধি   

১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



সেবার পরীক্ষায় সব অপারেটর ফেল

দেশে মোবাইল ফোন অপারেটরদের সেবার মান কোন পর্যায়ে রয়েছে তার তথ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি গতকাল সোমবার প্রকাশ করেছে। এতে শুধু ঢাকা নগরীর অবস্থার কথা জানানো হয়েছে। ঢাকা নগরীতে বিটিআরসির এই ড্রাইভ টেস্টের ফল অনুসারে ফোরজি গতিতে কোয়ালিটি সার্ভিস বা মানসম্মত সেবার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়নি কোনো মোবাইল ফোন অপারেটর।

ফোরজিতে গ্রামীণফোনের রয়েছে ৫ দশমিক ৪৪ এমবিপিএস, রবির ৫ দশমিক ৯১ এমবিপিএস এবং বাংলালিংকের ৫ দশমিক ১৮ এমবিপিএস। ফোরজি গতি পরীক্ষায় সরকারি অপারেটর টেলিটককে রাখা হয়নি।

রাজধানীর বাইরেও এ বিষয়ে বিটিআরসির মানসম্মত সেবা বা কোয়ালিটি অব সার্ভিসের ড্রাইভ টেস্ট চলছে জানিয়ে বিটিআরসি বলেছে, এর ফলও দ্রুত প্রকাশ করা হবে। অবশ্য মোবাইল অপারেটরদের পক্ষ থেকে গতকাল তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় এ ধরনের ড্রাইভ টেস্টে টেলিযোগাযোগ সেবার মানের সার্বিক চিত্র এতে উঠে আসে না বলে দাবি করা হয়েছে।

কোয়ালিটি অব সার্ভিস (কিউওএস) নীতিমালা অনুযায়ী থ্রিজি প্রযুক্তির ইন্টারনেটে ডাউনলোডের সর্বনিম্ন গতি ২ এমবিপিএস এবং ফোরজিতে ৭ এমবিপিএস হতে হবে। তবে আপলোড গতি গ্রামীণফোনের ২ দশমিক ৫৫, রবির ২ দশমিক ৫০ এবং বাংলালিংকের ২ দশমিক ৩৩ এমবিপিএস। যা বেঞ্চমার্ক অনুযায়ী ঠিক আছে। বেঞ্চমার্কে এটি ১ এমবিপিএস হলেই চলে।

কলড্রপের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বাজে অবস্থা গ্রামীণফোনের। কিউওএস নীতিমালা অনুসারে বেঞ্চমার্ক ২ শতাংশ গ্রহণযোগ্য হলেও এ অপারেটরের কলড্রপের হার ৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ। কল সেটআপ টাইমের ক্ষেত্রে নেতিবাচক অবস্থানে গ্রামীণফোন, বাংলালিংক এবং টেলিটক সবাই। এ ক্ষেত্রে বেঞ্চমার্ক ৭ সেকেন্ড হলেও গ্রামীণফোনের ১০ দশমিক ৪ সেকেন্ড, বাংলালিংকের ৭ দশমিক ৬৯ সেকেন্ড এবং টেলিটকের ৭ দশমিক ১১ সেকেন্ড। আবার মীন অপিনিয়ন স্কোরের ক্ষেত্রে নেতিবাচক অবস্থায় রয়েছে রবি। এ ক্ষেত্রে বেঞ্চমার্ক ৩ দশমিক ৫ হলেও রবির রয়েছে ৩ দশমিক ৪৭।

অবশ্য থ্রিজির গতি পরীক্ষায় রাজধানীতে টেলিটক ছাড়া সব অপারেটর বেঞ্চমার্ক ঠিক রেখেছে। টেলিটকের ডাউনলোড গতি ১ দশমিক ৬৩ এমবিপিএস। বাকি অপারেটরগুলোর ডাউনলোড গতি ৩ এমবিপিএসের ওপরে।

কিউওএস নীতিমালা অনুযায়ী অপারেটরগুলোর বিভিন্ন সেবার মান মূল্যায়ন করে র্যাংকিং করার কথা। র্যাংকিংয়ের জন্য এই ড্রাইভ টেস্ট অন্যতম। ঘোষিত মানদণ্ড অনুসারে সেবা দেওয়া না হলে সংশ্লিষ্ট অপারেটরের বিরুদ্ধে বিটিআরসি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে।

বিষয়টি সম্পর্কে রবি আজিয়াটা লিমিটেডের হেড অব করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স সাহেদ আলম বলেন, ‘ড্রাইভ টেস্ট টেলিযোগাযোগ সেবার মান পরিমাপের এমন একটি পদ্ধতি, যা দিয়ে একটি নির্দিষ্ট সময় ও স্থানে সেবার মান পরীক্ষা করা হয়। তবে টেলিযোগাযোগ সেবার মানের সার্বিক চিত্র এতে উঠে আসে না। সেবার মান পরীক্ষায় আমরা নিয়মিত এ ধরনের ড্রাইভ টেস্ট করে থাকি। নিয়ন্ত্রক সংস্থা পরিচালিত ড্রাইভ টেস্টে যেসব তথ্য-উপাত্ত উঠে এসেছে এগুলোর বিস্তারিত আমরা পাইনি, তাই আমাদের পক্ষে এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো মন্তব্য করা কঠিন।’

গত ৫ ফেব্রুয়ারি মেবাইল অপারেটেরদের সেবার মানের শোচনীয় অবস্থা নিয়ে কালের কণ্ঠে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। তাতে ভুক্তভোগীদের বরাতে বলা হয়েছিল ফোরজির কাঙ্ক্ষিত গতি পাওয়া যাচ্ছে না। বড় শহরগুলোতেই এই দুরবস্থা। প্রান্তিক পর্যায়ে অবস্থা আরো শোচনীয়।

মোবাইল ফোনের মানসম্মত সেবা নিয়ে সরকারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসিও সন্তুষ্ট নয়। গত ৪ ফেব্রুয়ারি বিটিআরসির কমিশনার (ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড অপারেশন) মো. রেজাউল কাদের কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মোবাইল অপারেটরদের সেবার মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। এ নিয়ে একটি ড্রাইভ টেস্ট বা জরিপ শুরু হয়েছে। ঢাকা মহানগরীতে এ জরিপ সম্পন্ন হওয়ার পর এখন খুলনায় চলছে। এ মাসেই এর একটা ফলাফল আপনারা জানতে পারবেন।’ তিনি আরো জানিয়েছিলেন, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে আমরাই এটা করছি।’

এর আগে গত ১৬ জানুয়ারি টেলিকম রিপোর্টারদের সংগঠন ‘টিআরএনবি’র সঙ্গে এক আলোচনাসভায় বিটিআরসির সিস্টেম অ্যান্ড সার্ভিস বিভাগের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আজিজুর রহমান সিদ্দিকী বলেছিলেন, অপারেটরদের সেবার ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট মান বেঁধে দেবে কমিশন। তা পূরণ করতে না পারলে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে। এ ক্ষেত্রে আমরা একটা চিঠি দিব, তাতে বলা হবে অপারেটরদের কোয়ালিটি অব সার্ভিস বাড়াতে হবে, না হলে একটি নির্দিষ্ট পার্সেন্টেজ অব সার্ভিস কাট করা হবে। বিধিনিষেধের ধরন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিটিআরসির এই পরিচালক সেদিন জানান, ‘উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সংশ্লিষ্ট মোবাইল অপারেটকে বলা হবে আপনারা এ এলাকায় সার্ভিস দিতে পারবেন না, এখন থেকে আর গ্রাহক বাড়াতে পারবেন না, আপনারা এ মানের ওপরে বা নিচে অপারেটর করতে পারবেন না—এসব বলা হতে পারে।’

তবে বিটিআরসি এ ধরনের নির্দেশনা দিতে যাচ্ছে খবর পেয়ে মোবাইল অপারেটর প্রতিনিধিরা ইতিমধ্যেই বিটিআরসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং জানিয়েছেন কোনো নির্দেশনার প্রয়োজন নেই। তাঁরা নিজেদের উদ্যোগেই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছেন।

জানা যায়, মোবাইল ফোন সেবা সম্পর্কে নানা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৫ সালের ১৬ আগস্ট থেকে বিটিআরসি মোবাইল ফোন অপারেটরদের সেবার মান ও তাদের গ্রাহক সন্তুষ্টি যাচাইয়ের জন্য দেশের ১৫টি জেলায় জরিপ চালায়। জেলাগুলো ছিল হবিগঞ্জ, বগুড়া, খুলনা, চট্টগ্রাম, সিলেট, কক্সবাজার, রবিশাল, রংপুর, চাঁদপুর, ঠাকুরগাঁও, পটুয়াখালী, রাজশাহী, ঝিনাইদহ, ময়মনসিংহ ও ঢাকা। সে সময় বিটিআরসির পক্ষ থেকে জানানো হয়, জরিপে পাওয়া ফলাফল গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হবে। এর ফলে গ্রাহকরা জানতে পারবেন কোন অপারেটরের সেবার মান কেমন।

তার আগে বিটিআরসি ২০১৪ সালের ২১ জানুয়ারি সাময়িকভাবে মোবাইল সেবার বিভিন্ন মান নির্ধারণ করে দিয়ে একটি নির্দেশনা জারি করে। নির্দেশনাতে বলা হয়, ‘দেখা যাচ্ছে মেবাইল অপারেটররা তাদের কোয়ালিটি অব সার্ভিস নিয়ে মোটেই মনোযোগী নয়। তাদের গ্রাহক বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কর ড্রপের ঘটনাও বাড়ছে। দুর্বল নেটওয়ার্ক, কাস্টমার কেয়ারের বেহাল দশা গ্রাহক ভোগান্তি বাড়াচ্ছে। অপারেটররা তাদের নিজেদের মতো করে নেটওয়ার্ক পর্যবেক্ষণ করছে। এ কাজে সর্বজনীন কোনো মান রক্ষা হচ্ছে না।’ ওই জরিপ প্রতিবেদন আজও আলোর মুখ দেখেনি।



মন্তব্য