kalerkantho


তালিকাভুক্ত গডফাদাররাও অনুষ্ঠানে!

‘মৃত্যুদণ্ডের খড়্গ মাথায়’ ১০২ ইয়াবা কারবারির আত্মসমর্পণ

এস এম রানা ও জাকারিয়া আলফাজ, টেকনাফ থেকে   

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



‘মৃত্যুদণ্ডের খড়্গ মাথায়’ ১০২ ইয়াবা কারবারির আত্মসমর্পণ

কক্সবাজারের টেকনাফে গতকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে ইয়াবা কারবারিদের মধ্যে ১০২ জন আত্মসমর্পণ করে। ছবি : কালের কণ্ঠ

কক্সবাজারের টেকনাফে গতকাল শনিবার যে ১০২ জন ইয়াবা কারবারি আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করেছে, তারা সকালেই একটি জায়গায় জড়ো হয়েছিল। সে খবর পেয়ে পুলিশ সেখানে অভিযান চালালে তারা পালিয়ে যাচ্ছিল। এ সময় আত্মসমর্পণের আহ্বানে সাড়া দিয়ে পুলিশের কাছে ধরা দেয় তারা। তাদের কাছ থেকে সাড়ে তিন লাখ ইয়াবা ট্যাবলেট, ৩০টি এলজি ও ৭০টি কার্তুজ উদ্ধার করা হয়েছে। আত্মসমর্পণকারীদের বিরুদ্ধে টেকনাফ থানায় মাদক ও অস্ত্র আইনে যে দুটি মামলা হয়েছে, এর এজাহারে এমনই বলা হয়েছে। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানেও এমন তথ্য জানানো হয়। এই ইয়াবা কারবারিরা মাদক মামলায় ‘মৃত্যুদণ্ডের খড়্গ মাথায় নিয়ে’ টেকনাফে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। এ ছাড়া অস্ত্র মামলায় যাবজ্জীবন সাজার ঝুঁকিও রয়েছে তাদের।

গত বছর মে মাসে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে সরকার। এরপর দেশজুড়ে অভিযান শুরু হয়। অভিযানে কথিত বন্দুকযুদ্ধে প্রায় ৩০০ জন নিহত হয়। শুধু কক্সবাজারেই নিহত হয় ৪৪ জন। তাদের মধ্যে শীর্ষ ৭৩ ইয়াবা কারবারির তালিকাভুক্ত পাঁচজন রয়েছে। গত ডিসেম্বরে মাদক কারবারিদের আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে ইঙ্গিত আসে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে। জানুয়ারির মাঝামাঝিতে টেকনাফের বেশ কয়েকজন কারবারি আত্মসমর্পণের জন্য পুলিশের আশ্রয়ে চলে যায়।

আত্মসমর্পণ : সকাল ১০টায় অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছে দেখা যায়, টেকনাফ পাইলট হাই স্কুলের মাঠ কানায় কানায় পরিপূর্ণ। ছাত্র-ছাত্রী, নারী-পুরুষসহ বিভিন্ন স্তরের লোকজন মাঠে জড়ো হয়েছে। সেখানে আত্মসমর্পণকারীদের স্বজনরাও ফুল নিয়ে অপেক্ষায় ছিল। অনুষ্ঠান শুরুর আগেই আত্মসমর্পণকারী ১০২ জনকে চারটি বাসযোগে কক্সবাজার থেকে টেকনাফে নিয়ে যাওয়া হয়। অনুষ্ঠানস্থলের পাশে স্কুলের একটি কক্ষে তাদের অপেক্ষায় রাখা হয়।

সকাল পৌনে ১১টায় অনুষ্ঠান শুরু হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান খান কামাল, প্রধান বক্তা ছিলেন পুলিশের আইজি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক, কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন।

অনুষ্ঠানে কক্সবাজারের চারজন সংসদ সদস্য যথাক্রমে জাফর আলম, মো. আশেক উল্লাহ রফিক, সাইমুম সরওয়ার কমল ও শাহিন আক্তার বক্তব্য দেন। এ ছাড়া বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) টেকনাফ রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাজিদুর রহমান, টেকনাফ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মোস্তাক আহমদ, কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট সিরাজুল মোস্তফা ও টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ দাশ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

সকাল ১১টায় আত্মসমর্পণের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজি) আত্মসমর্পণকারীদের ফুল দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে বরণ করেন নেন। এ সময় মঞ্চে মাদক কারবারিদের কাছ থেকে জব্দ করা ইয়াবা, অস্ত্র ও গুলি রাখা ছিল।

আত্মসমর্পণকারী ১০২ জনের মধ্যে ১৩ জন সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির ভাই ও স্বজন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ৭৩ জনের তালিকায় ১ নম্বরে থাকা সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি আত্মসমর্পণ করেননি।

১০২ জন ইয়াবা কারবারির আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘রাষ্ট্র তাদের মামলার বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেবে, মামলাগুলো যাতে দ্রুত আইনি পন্থায় নিষ্পত্তি করা যায়, সেই বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে। তাদের অনেকেই দেখলাম, অবস্থাসম্পন্ন। তার পরও যদি কেউ পুনর্বাসনের জন্য আবেদন করে, তাহলে প্রধানমন্ত্রী তাদের পুনর্বাসন করতেও রাজি। তার পরও ইয়াবা ব্যবসা ছাড়তে হবে।’ তিনি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘যদি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কেউ ইয়াবা পাচারের সঙ্গে জড়িত থাকেন, তাহলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ইয়াবা কারবারিদের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে মন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা মসজিদ গিয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান এবং সিদ্ধান্ত নিন ইয়াবা ব্যবসা করবেন নাকি ভালো মানুষ হিসেবে থাকবেন। তবে মনে রাখবেন, ইয়াবা ব্যবসায়ীদের নিস্তার নাই, নিস্তার নাই, নিস্তার নাই।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিজিবির রিজিয়ন কমান্ডার সাজিদুর রহমানকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আমি অনেক অভিযোগ পাচ্ছি, এ বিষয়ে আপনি এবং বিজিবির ডিজির সঙ্গে আমি বসব।’

প্রধান বক্তার বক্তব্যে পুলিশের আইজি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী যারা আত্মসমর্পণ করেনি তাদের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তিনি বলেন, ‘আপনাদের প্রতি কঠোরতম বার্তা, আমরা আপনাদের ছাড়ব না। লুকিয়ে থেকে বাঁচতে পারবেন না।’ এই সময় আইজিপিও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক করে দেন এবং ইয়াবার সঙ্গে কেউ যুক্ত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে সে যেই বাহিনীরই হোক, কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

এর আগে চট্টগ্রাম রেঞ্জ ডিআইজি খন্দকার গোলাম হোসেনও ইয়াবা পাচারকারীদের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ার উচ্চারণ করেন। তিনি বলেন, ‘সুরম্য বাড়িতে থাকতে পারবেন না। ঘুমাতে পারবেন না। ভূতে ভাঙবে বাড়িঘর।’

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন সামাজিক আন্দোলন শুরুর ঘোষণা দেন।

আত্মসমর্পণকারীদের টেকনাফ থানায় করা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। তাদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

তালিকাভুক্তরা দর্শক সারিতে

অনুষ্ঠানের মঞ্চে ছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য এবং শীর্ষ ৭৩ ইয়াবা কারবারির তালিকায় ১ নম্বরে থাকা আব্দুর রহমান বদি। কিন্তু মঞ্চের অদূরে তিনি অবস্থান নিয়ে বক্তব্য শুনেছেন বলে জানা গেছে। তালিকাভুক্ত আরেক ইয়াবা কারবারি বদির ভাই মৌলভি মুজিবুর রহমানও অনুষ্ঠানস্থলের আশপাশে উপস্থিত ছিলেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

আত্মসমর্পণ না করলেও মঞ্চের সামনের দর্শক সারিতে উপস্থিত ছিলেন তালিকাভুক্ত কয়েকজন শীর্ষ ইয়াবা কারবারি। টেকনাফ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও বদির সহচর জাফর আহমদ তাঁদের অন্যতম। তিনি মঞ্চের সামনের দ্বিতীয় সারিতে বসা ছিলেন। তাঁর ছেলে টেকনাফ সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শাহজাহান মিয়া বসেছিলেন সামনের সারিতে। তিনিও তালিকাভুক্ত। এ ছাড়া টেকনাফ উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান মৌলভি রফিক উদ্দিন ও তাঁর ভাই বাহারছড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মৌলভি আজিজ উদ্দিন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে তাঁদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার তদবিরও করেছিলেন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তালিকাভুক্তদের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা পুলিশ সুপার এ বি এম মাসুদ হোসেন বলেন, ‘অনুষ্ঠানে ২৫-৩০ হাজার মানুষ উপস্থিত ছিল। তাই তাদের মধ্যে তালিকাভুক্ত কেউ ছিল কি না আমি দেখিনি।’

নির্দোষ ও ষড়যন্ত্রের শিকার বলে দাবি

অনুষ্ঠানে আত্মসমর্পণকারী দুজন ইয়াবা কারবারি বক্তব্য দেন। তাঁরা হলেন মো. সিরাজ ও এনাম মেম্বার। দুজনই ইয়াবা কারবারের নানা কুফল তুলে ধরে বলেন, তাঁরা এর বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলবেন। তবে বক্তব্যের শুরুতে এনাম মেম্বার নিজেকে নির্দোষ ও ষড়যন্ত্রের শিকার বলে দাবি করেন। এই সময় একজন পুলিশ কর্মকর্তা মাইকের কাছে দিয়ে তাঁকে ইয়াবার বিষয়ে বক্তব্য দিতে বলেন। পরে এনাম বলেন, ‘আমি ইয়াবার বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন শুরু করব। সীমান্তে যদি বিজিবি, কোস্ট গার্ড ও পুলিশ যৌথ টহল দেয়, তাহলে ইয়াবা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারবে না।’

ইয়াবা ও ৩০ অস্ত্র উদ্ধার

আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে জানানো হয়, ১০২ জনের কাছ থেকে পুলিশ সাড়ে তিন লাখ পিস ইয়াবা ও ৩০টি এলজি উদ্ধার করেছে। এ বিষয়ে টেকনাফ থানায় মামলা করেছেন থানার পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) শরীফ ইবনে আলম। মামলার এজাহারে বাদী উল্লেখ করেছেন, গতকাল টেকনাফ থানা-পুলিশ বিশেষ অভিযান পরিচালনা করতে মহেশখালিয়াপাড়ার কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কে অবস্থান করছিল। এই সময় একটি পরিত্যক্ত হ্যাচারির পাশে কিছু লোক ইয়াবা ও অস্ত্র নিয়ে জড়ো হয়েছে বলে জানতে পারে তারা। পুলিশ অভিযান শুরু করলে জড়ো হয়ে থাকা ব্যক্তিরা পালিয়ে যেতে থাকে। তখন পুলিশ পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের পালিয়ে না গিয়ে আত্মসমর্পণের অনুরোধ জানায়। পুলিশের আহ্বানে সাড়া দিয়ে তারা আত্মসমর্পণ করে। এই ঘটনায় আসামিদের বিরুদ্ধে টেকনাফ থানায় অস্ত্র আইনের ১৯(এ) ও ১৯(এফ) ধারা এবং ২০১৮ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ৩৬ টেবিল ১ এর ১০(গ) ধারায় মামলা দায়ের করা হয়।

কক্সবাজার জেলা পুলিশ সুপার এ বি এম মাসুদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আসামিরা পুলিশ হেফাজতে ছিল, এটা তো আমরা কখনোই বলিনি। সাংবাদিকরা কিভাবে এই কথা লিখেছেন আমি জানি না।’ তিনি বলেন, ‘আসামিরা ইয়াবা ও অস্ত্রসহ একটি স্থানে জড়ো হয়েছিল। পুলিশের অভিযানের সময় আত্মসমর্পণের আহ্বানে সাড়া দিয়ে তারা আত্মসমর্পণ করেছে।’

অথচ গত শুক্রবার কক্সবাজার পুলিশ লাইনে থাকা আত্মসমর্পণকারীদের সঙ্গে তাদের স্বজনরা  দেখা করেছে। স্বজনদের কয়েকজনের সঙ্গে গণমাধ্যমের কথাও হয়েছে। পুলিশ লাইন মসজিদে জুমার নামাজের পর মোনাজাতে এ বিষয়ে সাফল্য কামনা করা হয় বলেও জানা গেছে।

মৃত্যুদণ্ড ও সাজার খড়্গ

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনটি ২০১৮ সালে সংশোধন করা হয়েছে। সংশোধিত আইন অনুযায়ী কারো কাছে ২০০ গ্রাম ইয়াবা পাওয়া গেলেই মৃত্যুদণ্ডের বিধান করা হয়েছে।

প্রচলতি নিয়ম অনুযায়ী, পরীক্ষায় জব্দ করা ইয়াবার মধ্যে ‘অ্যামফিটামিন’ পাওয়া গেছে কি না তার প্রতিবেদন দেয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। প্রতিবেদনে ইয়াবা ট্যাবলেটে ‘অ্যামফিটামিন পাওয়া গিয়েছে’ মর্মে উল্লেখ থাকে। একটি ইয়াবার ওজন শূন্য দশমিক এক গ্রাম। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তির কাছে যদি দুই হাজার বা তার চেয়ে বেশি ইয়াবা উদ্ধারের প্রমাণ পাওয়া যায় তাহলে তার মৃত্যুদণ্ড হতে পারে। গতকাল আত্মসমর্পণকারীদের কাছ থেকে সাড়ে তিন লাখ ইয়াবা উদ্ধারের ঘোষণা দেওয়া হয়। ১০২ জনের কাছ থেকে সাড়ে তিন লাখ ইয়াবা উদ্ধার হলে প্রতিজনের কাছ থেকে গড়ে ইয়াবা উদ্ধার হয়েছে তিন হাজার ৪৩১টি। এ হিসাবে অভিযোগ প্রমাণ হলে বিচারিক আদালত তাদের মৃত্যুদণ্ড দিতে পারেন। আসামিদের কাছ থেকে অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। এই ধারা প্রমাণিত হলে আসামিদের বিরুদ্ধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিতে পারেন আদালত।



মন্তব্য