kalerkantho


এসএসসির প্রশ্নের হিসাব মেলে না

শেষ সময়ে ফরম পূরণেই ওলটপালট

শরীফুল আলম সুমন, ঢাকা ও শরীফ আহমেদ শামীম, গাজীপুর   

১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



শেষ সময়ে ফরম পূরণেই ওলটপালট

এবার মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমানের পরীক্ষার প্রথম দিন থেকেই দেখা গেছে, বেশ কিছু কেন্দ্রে পরীক্ষার্থীর চেয়ে প্রশ্নপত্রের সংখ্যা কম। বিশেষ করে বাংলা প্রথম পত্রের পরীক্ষায় ওই সমস্যা বড় আকারে দেখা দেয়। ফলে কিছু কেন্দ্রে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে প্রশ্নপত্র ফটোকপি করে। আবার কিছু কেন্দ্রে অন্য জায়গা থেকে প্রশ্ন সংগ্রহ করে চাহিদা মেটানো হয়েছে।

গত ২ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়েছে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, এসএসসির ফরম পূরণ করার নির্দিষ্ট সময় পার হয়ে যাওয়ার পরও কিছু শিক্ষার্থীর ফরম পূরণ করা হয়। এ কারণে আগে পাঠিয়ে দেওয়া প্রশ্নপত্রের সঙ্গে শেষ মুহূর্তে শিক্ষার্থীর সংখ্যা মেলেনি। ফলে কোথাও অন্য কেন্দ্র থেকে প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করতে হয়। আবার কোথাও বিকল্প উপায়ে ফটোকপি করে প্রশ্নপত্র দিতে হয় পরীক্ষার্থীদের হাতে।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, এবারের এসএসসির ফরম পূরণ শুরু হয়েছিল গত ৭ নভেম্বর, যা প্রথম দফায় শেষ হয় ২২ নভেম্বর। তবে কয়েক দফা বাড়িয়ে বিলম্ব ফিসহ ফরম পূরণ করার শেষ সময় নির্ধারণ করা হয় গত ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত। কিন্তু এর পরও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে কিছু শিক্ষার্থীর ফরম পূরণ করা হয়েছে।

জানা যায়, চলতি বছর পরীক্ষার আগে টেস্ট বা নির্বাচনী পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের ফরম পূরণ করার সুযোগ না দিতে চাপ ছিল দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পক্ষ থেকে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানই প্রথম দফায় যারা শুধু নির্বাচনী পরীক্ষায় পাস করেছিল তাদেরই ফরম পূরণের তথ্য পাঠায়। কিন্তু যখন সময় শেষ হয়ে যায় আর দুদকের চাপও কমে যায় তখন বিভিন্ন স্কুল কর্তৃপক্ষ টেস্ট পরীক্ষায় ফেল করা শিক্ষার্থীদেরও উত্তীর্ণ দেখিয়ে বিশেষ বিবেচনায় বোর্ড কর্তৃপক্ষের কাছে ফরম পূরণের আবেদন করে। আবার অনিয়মিত শিক্ষার্থী যারা নির্দিষ্ট সময়ে ফরম পূরণ করেনি, তাদের অনেকেও শেষ সময়ে ফরম পূরণ করতে চায়। ফলে বিশেষ বিবেচনায় তাদের ফরম পূরণ করা হয় শেষ মুহূর্তে।

অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন স্কুল কর্তৃপক্ষ টেস্ট পরীক্ষায় পাস না করা এবং শেষ মুহূর্তে অনিয়মিত শিক্ষার্থীদের ফরম পূরণের জন্য বড় অঙ্কের টাকাও আদায় করে।

জানা যায়, গত ২ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টায় পরীক্ষা শুরু হওয়ার আধাঘণ্টা আগে প্রশ্নপত্র উত্তোলন করতে গিয়ে কর্তৃপক্ষ দেখতে পায় পরীক্ষার্থীর তুলনায় গাজীপুরের টঙ্গীর সিরাজ উদ্দিন বিদ্যানিকেতন কেন্দ্রে ৩৭টি এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ৩৮টি প্রশ্নপত্র কম। দুজন কেন্দ্র সচিবই ঘটনাটি পরীক্ষা কেন্দ্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ট্যাগ অফিসারকে জানান। জানানো হয় জেলা প্রশাসককেও। পরে জেলা প্রশাসকের নির্দেশে প্রশ্নপত্র ফটোকপি করে শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণ করা হয়।

সিরাজ উদ্দিন বিদ্যানিকেতন পরীক্ষা কেন্দ্রের সচিব এবং ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. ওয়াহিদুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কেন্দ্রের পরীক্ষার্থীর সংখ্যা অনুযায়ী ফরম ফিলাপের পরপরই শিক্ষা বোর্ডে প্রশ্নের চাহিদাপত্র পাঠাতে হয়। আমরা ওইভাবেই চাহিদাপত্র পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু পরীক্ষা শুরুর দুই দিন আগে বোর্ড আরো ৩৭ জনের প্রবেশপত্র পাঠায়। ফলে পরীক্ষা শুরুর আগে প্রশ্নপত্র উঠিয়ে দেখা যায় ওই ৩৭ জনের প্রশ্ন কম।’ তিনি আরো বলেন, ‘এসব পরীক্ষার্থী বিভিন্ন স্কুল থেকে এসে ফরম ফিলাপ করেছিল। নিয়ম অনুযায়ী যে স্কুল থেকে রেজিস্ট্রেশন করা হয়, ওই স্কুল থেকেই পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। এসব পরীক্ষার্থীকে কিভাবে ফরম পূরণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে তা বোর্ডই ভালো বলতে পারবে। যেহেতু বোর্ড প্রবেশপত্র দিয়েছে তাই দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা প্রশাসকের নির্দেশে প্রশ্ন ফটোকপি করে সরবরাহ করে পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে।’

গাজীপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের শিক্ষা শাখার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মোস্তাফিজুর রহমান কালের কণ্ঠকে জানান, সিরাজ উদ্দিন বিদ্যানিকেতন কেন্দ্রে ৩৭ এবং ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট কেন্দ্রে ৩৮ জন শিক্ষার্থীর প্রশ্নপত্র কম ছিল। ওই পরীক্ষার্থীদের প্রবেশপত্র পরীক্ষা শুরু হওয়ার মাত্র দুই দিন আগে সরবরাহ করেছিল শিক্ষা বোর্ড।

গাজীপুরের জেলা প্রশাসক ড. দেওয়ান মোহাম্মদ হুমায়ুন কবীর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের কাছে ওই সব পরীক্ষা কেন্দ্রের শিক্ষার্থীদের যে তালিকা ছিল, পরীক্ষা শুরুর পর দেখা যায় এর চেয়ে ৭৫ জন বেশি। অতিরিক্ত শিক্ষার্থীদের প্রবেশপত্র দিলেও বোর্ড প্রশ্নপত্র পাঠায়নি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আমরা লিখিতভাবে বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে জানাব।’

কুমিল্লার দেবীদ্বারে দুয়ারিয়া এজি মডেল একাডেমি স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে গত ২ ফেব্রুয়ারি পরীক্ষা শুরু হওয়ার ৪৫ মিনিট পর প্রশ্নপত্র হাতে পায় শিক্ষার্থীরা। ওই ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার কারণে তাত্ক্ষণিকভাবে কেন্দ্র সচিবকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। ওই কেন্দ্রে ৪ নম্বর প্রশ্নপত্রের প্যাকেট খুঁজে পাননি শিক্ষকরা। অথচ ওই প্যাকেটের প্রশ্নপত্রেই পরীক্ষা নেওয়ার জন্য এসএমএস পাঠানো হয়। পরে জেলা সদর থেকে যাওয়া পরিদর্শন টিমের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শামিম আরাকে সঙ্গে নিয়ে উপজেলার ৯টি পরীক্ষা কেন্দ্রের সাতটি থেকে অতিরিক্ত প্রশ্নপত্র নিয়ে ৪৫ মিনিট পর শিক্ষার্থীদের হাতে ৪ নম্বর সেটের প্রশ্নপত্র সরবরাহ করা হয়।

এসব বিষয়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মু. জিয়াউল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রশ্নের হিসাবটা ফরম পূরণের সময় শেষ হওয়ার আগেই করা হয়। তবে সব কেন্দ্রেই কিছু প্রশ্ন বেশি পাঠানো হয়। এর পরও প্রশ্নের সংখ্যার কম-বেশি হতে পারে। তবে প্রতিষ্ঠানপ্রধান অনলাইনে প্রতিটি শিক্ষার্থীর ফরম পূরণের তথ্য পাঠান। সেই তথ্য ছাড়া কাউকে বোর্ড কর্তৃপক্ষ ফরম পূরণের সুযোগ দেয় না।’

বোর্ডের চেয়ারম্যান আরো বলেন, ‘অনেক সময়ই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুবিধা-অসুবিধা থাকে। সে ক্ষেত্রে ফরম পূরণের সময় অনেক সময় বাড়ানো হয়। কারণ, আমরা শিক্ষার্থীদের মানবিক দিকটা বিবেচনা করি। তবে যেসব কেন্দ্রে প্রশ্ন কম পড়ে, সেটা সম্পূর্ণই তাদের ভুল। তারা সঠিক হিসাব দিতে পারে না বলেই প্রশ্নপত্র কম পড়ে।’



মন্তব্য