kalerkantho


সংক্রামক রোগের টিকা দেশেই তৈরির উদ্যোগ

বিপুল টাকা নষ্টের পর বোধোদয়

আরিফুর রহমান    

১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



বিপুল টাকা নষ্টের পর বোধোদয়

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা, পিপিআর, অ্যানথ্রাক্সের মতো রোগ ব্যাপকতা লাভ করায় বাংলাদেশ এ ব্যাপারে বেশ আগে থেকেই সতর্ক। মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে আদান-প্রদানের মাধ্যমে বিস্তার লাভ করা এই জুনোসিস রোগ প্রতিরোধে সরকার বছরে তিন হাজার কোটি টাকারও বেশি টিকা আমদানি করে। আনুমানিক এক হিসাবে, গত ২৮ বছরে টিকা আমদানি হয়েছে ৮৪ হাজার কোটি টাকার মতো। কিন্তু বাস্তবে এই টিকা কোনো কাজে আসে না বলে মনে করছেন খোদ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তারা। প্রাণিদেহে কয়েকটি রোগের ক্ষেত্রে আমদানি করা টিকা ব্যবহার করার পর আবারও রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার ঘটনা ঘটে দেশের বিভিন্ন জেলায়। এ কারণে একদিকে যেমন বছরে সরকারের কয়েক হাজার কোটি টাকা গচ্চা যাচ্ছে, অন্যদিকে দেশের প্রাণিসম্পদের উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে।

এ রকম পরিস্থিতিতে বোধোদয় হয়েছে নীতিনির্ধারণী মহলের। প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশে যদি বায়ো-সেফটি-লেভেল (বিএসএল) ল্যাব স্থাপন করা যায়, তাহলে বিদেশ থেকে প্রতিবছর কয়েক হাজার কোটি টাকার টিকা আমদানি করতে হবে না। দেশের মধ্যেই জুনোসিস রোগের কার্যকর আধুনিক ও নতুন প্রজন্মের জন্য টিকা বীজ উদ্ভাবন ও গবেষণার জন্য বিএসএল ল্যাব কার্যকর ভূমিকা রাখবে। কর্মকর্তারা জানান, এ লক্ষ্যে ঢাকার অদূরে সাভারে টিকার মান নিরূপণ ও নিয়ন্ত্রণে একটি বায়ো-সেফটি-লেভেল (বিএসএল ৩) প্রাণী গবেষণাগার নির্মাণের কাজে হাত দিয়েছে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়।

গত বৃহস্পতিবার সংসদের প্রথম অধিবেশনে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী শাহাব উদ্দিন পোলট্রি মুরগি থেকে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা ছড়ানোর আশঙ্কার কথা জানান।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আশির দশকে যখন পোলট্রি শিল্পের বিকাশ ঘটে, তখন থেকে টিকা আমদানির হার বেড়ে যায়। প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের দেওয়া তথ্য মতে, প্রতিবছর বিদেশ থেকে তিন হাজার কোটি টাকার টিকা আমদানি করা হয়। ১৯৯০ সাল থেকে হিসাব ধরলে গত বছর পর্যন্ত ২৮ বছরে টিকা আমদানি হয়েছে আনুমানিক ৮৪ হাজার কোটি টাকার মতো। কর্মকর্তারা বলছেন, মূলত ইউরোপের দেশগুলো থেকেই এসব রোগের টিকা আমদানি করা হয়। ফ্রান্স, রুমানিয়া, ক্রোয়েশিয়া, রাশিয়া ও বেলজিয়ামের মতো দেশ থেকে টিকা আমদানি করে সরকার। মহাখালীতে যে ল্যাব আছে, সেখান থেকে চাহিদার মাত্র ২৫ শতাংশ উৎপাদন হয়। বাকি পুরোটাই আসে বিদেশ থেকে।

জানতে চাইলে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. হীরেশ রঞ্জন ভৌমিক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রাণঘাতী রোগ অ্যানথ্রাক্স, সোয়াইন ফ্লু, এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা আমরা এখন আমদানি করি। আমাদের টিকার ব্যাপক চাহিদা আছে। কিন্তু মহাখালীতে বিদ্যমান ল্যাবের সক্ষমতা নেই। আমরা বড় আকারে নতুন ল্যাব স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছি। আমরা সাভারে বড় আকারে ল্যাব করতে ১৬৪ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছি। একই সঙ্গে আমরা বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদেরও আমন্ত্রণ জানিয়েছি, যাতে করে তারাও ভ্যাকসিন উৎপাদন করে। উদ্দেশ্য একটাই, আমরা টিকার আমদানি বিদেশনির্ভরতা কমাব। কারণ অর্থনৈতিকভাবে আমরা এখন সক্ষম। আমরা অনেক বড় বড় প্রকল্প হাতে নিচ্ছি। আমরা নিজেরাই টিকা উৎপাদন করব। একসময় নিজেরাই টিকা রপ্তানি করব।’ 

বিশ্ব প্রাণী স্বাস্থ্য সংস্থা (ওআইই) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংজ্ঞা অনুযায়ী, যেসব রোগ মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে আদান-প্রদানের মাধ্যমে বিস্তার লাভ করে, সেগুলোই জুনোসিস রোগ। জুনোসিস ও আন্তঃসীমান্ত প্রাণিরোগের মধ্যে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা, ক্ষুরারোগ, পিপিআর, সেপ্টিসেমিয়া, ব্র্রসিলোসিস, অ্যানথ্রাক্স ও সোয়াইন ফ্লু বেশি ভয়ংকর।

এসব রোগ প্রতিরোধের জন্য সরকারের আমদানি করা টিকা মূলত তৈরি করা হয় উৎপাদনকারী দেশের রোগের ওপর ভিত্তি করে। ফলে বাংলাদেশে এর সুফল মেলে না। আমদানি করা টিকার মান ও কার্যকারিতা যাচাই করার জন্য মানসম্পন্ন বিএসএল গবেষণাগার না থাকায় এত দিন তা করা সম্ভব হয়নি।

বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. নাথু রাম সরকার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা, অ্যানথ্রাক্স, পিপিআর রোগ ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। ওই সব রোগ যাতে বাংলাদেশে ঢুকতে না পারে আমরা তার আগাম সতর্কতা অবলম্বন করছি। সে জন্য আমরা একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছি। এর মাধ্যমে আমরা প্রাণিরোগ গবেষণাগার, নতুন প্রজন্মের টিকা উৎপাদন, ভ্রাম্যমাণ বায়ো সেফটি লেভেল গবেষণাগার নির্মাণ করব। আশা করছি, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রাণঘাতী এসব রোগ বাংলাদেশে ঢুকলে আমরা সতর্ক হতে পারব।’

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বৈধ এবং অবৈধভাবে রাজশাহী, যশোর, খুলনাসহ বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে প্রতিনিয়ত গরু-ছাগল, পাখিসহ অন্যান্য প্রাণী বাংলাদেশে ঢুকছে। এসব প্রাণীর মধ্যে প্রাণঘাতী জুনোটিক (প্রাণী থেকে মানুষে সংক্রামক) রোগ নির্ণয়ে দেশের ২৪টি স্থানে কোয়ারেন্টাইন কেন্দ্র স্থাপন করে সরকার। কিন্তু প্রশিক্ষিত জনবলের অভাব, সীমান্ত থেকে কেন্দ্রগুলোর দূরত্ব, যন্ত্রপাতির অভাবের কারণে কেন্দ্রগুলো এখন বলতে গেলে স্থবির হয়ে আছে। প্রাণীর স্বাস্থ্য পরীক্ষায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ স্থলবন্দর ও রহনপুর রেলবন্দর এলাকায় দুটি কোয়ারেন্টাইন কেন্দ্র নির্মাণ করা হলেও লোকবলের অভাবে এখন বন্ধ রয়েছে। রাজশাহীতেও বন্ধ রয়েছে কেন্দ্রটি। নতুন প্রকল্পের আওতায় এসব কেন্দ্রে প্রশিক্ষিত জনবল, যন্ত্রপাতি দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন বিএলআরআই কর্মকর্তারা।

অবশ্য অবৈধভাবে যেসব প্রাণী দেশে ঢুকবে সেসব প্রাণীতে জুনোসিস রোগ নির্ণয়ে কিছু করার নেই বলে জানিয়েছেন নাথু রাম সরকার। বৈধভাবে যেসব প্রাণী আসবে, সেগুলোকেই শুধু পরীক্ষা করা হবে। অবৈধভাবে আসা প্রাণীর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ডের (বিজিবি) সহযোগিতা চান প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক।

বিশ্ব প্রাণী সংস্থার হিসাবে, ২০ থেকে ২৫টি প্রাণী রোগকে আন্তঃসীমান্ত প্রাণিরোগ বলে বিবেচনা করা হয়। এসব রোগ প্রাণিসম্পদ ও পোল্ট্রি উৎপাদনে মারাত্মকভাবে ব্যাঘাত ঘটায়। একই সঙ্গে মানুষের জন্যও ভয়ংকর হয়ে ওঠে।

পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, জুনোসিস ও আন্তঃসীমান্ত প্রাণিরোগ প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণায় ১৬৪ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। এই প্রকল্পের আওতায় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ২৪টি কোয়ারেন্টাইন কেন্দ্রকে আধুনিকায়ন করা হবে। ২৫টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হবে। প্রাণঘাতী জুনোসিস ও আন্তঃসীমান্ত প্রাণিরোগ প্রতিরোধে আধুনিক ও নতুন প্রজন্মের টিকা বীজ উদ্ভাবন করা হবে। পিপিআর এবং এফএমডি গবেষণাগারের সম্প্রসারণ করা হবে। এর মাধ্যমে সরকারের এসডিজি বাস্তবায়নও সহায়ক হবে।

প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য মতে, দেশের ৮৪ শতাংশ পরিবার এখন প্রাণী কিংবা পাখি লালন-পালন করছে। দেশে এখন দুই কোটি ৫৭ লাখ গরু, ৮৩ লাখ মহিষ, এক কোটি ৪৮ লাখ ছাগল, ১৯ লাখ ভেড়া আছে। জুনোসিস ও আন্তঃসীমান্ত প্রাণিরোগ বাংলাদেশে ঢুকলে মহামারি আকার ধারণ করবে। এক হিসাবে দেখা গেছে, ক্ষুরারোগ এবং ছাগল ও ভেড়ার ভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগ পেস্ট ডেস পেটিটস রুমিন্যান্টস (পিপিআর) বা গোট প্লেগের কারণে দেশে বার্ষিক ক্ষতির পরিমাণ দুই হাজার কোটি টাকা।

জলাতঙ্কও ভাইরাসজনিত অত্যন্ত ভয়ানক জুনোটিক রোগ, যা আক্রান্ত কুকুর, বিড়াল, বেজি ইঁদুরের কামড়ে মানুষসহ গবাধি প্রাণীর মধ্যে সংক্রামণ ঘটায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, বাংলাদেশে প্রতিবছর এক লাখ মানুষ কুকুরের কামড়ের শিকার হয়। দুই হাজারের বেশি মানুষ জলাতঙ্ক রোগে মারা যায়। এ ছাড়া বাংলাদেশে প্রতিবছর ৫০ লাখ গবাদি পশু অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়।

বৃহস্পতিবার সংসদে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী শাহাব উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশে পোল্ট্রি মুরগি থেকে ‘এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা’ ছড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে। তবে বুনো দেশি ও পরিযায়ী পাখি থেকে এ জীবাণু ছড়ানোর আশঙ্কা কম। কয়েক বছর ধরে দেশি কাকের মাধ্যমে এ জীবাণু ছড়ানোর তথ্য আছে। সরকার রাজশাহী এলাকায় এ ব্যাপারে কাজ করছে বলেও জানান মন্ত্রী।



মন্তব্য