kalerkantho


চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলা

জামিনে পালিয়ে দণ্ড ফাঁকি

আশরাফ-উল-আলম   

২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



জামিনে পালিয়ে দণ্ড ফাঁকি

কলেজ শিক্ষিকা কৃষ্ণা কাবেরীকে হত্যার দায়ে তাঁর স্বামীর বন্ধু এ কে এম জহিরুল ইসলাম পলাশকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে গত ৩ জানুয়ারি। নিহতের স্বামী ও সন্তানদের হত্যাচেষ্টার দায়ে তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডও দেওয়া হয়েছে। ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক শাহেদ নুর উদ্দিন এই রায় ঘোষণা করেন। তবে রায়ের সময় আসামি পলাতক ছিলেন। হত্যাকাণ্ডটি ঘটার পর আসামি পলাশকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। হত্যার দায় স্বীকার করে তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেন। 

২০১৫ সালের ৩০ মার্চ রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোডের ভাড়া বাসায় পলাশের হামলায় মারাত্মক আহত ও দগ্ধ হয়ে পরদিন হাসপাতালে মারা যান আদাবরের মিশন ইন্টারন্যাশনাল কলেজের প্রভাষক কৃষ্ণা কাবেরী। তাঁর স্বামী বিআরটিএর প্রকৌশল বিভাগের উপপরিচালক সীতাংশু শেখর বিশ্বাস বিপুল পরিমাণ টাকা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেছিলেন। এই বিনিয়োগের মাধ্যম ছিলেন গুলশানের হাজী আহম্মেদ ব্রাদার্স সিকিউরিটি কম্পানির ব্যবস্থাপক পলাশ। আর এ টাকা নিয়েই বিরোধে সীতাংশুকে হত্যার পরিকল্পনা করেন তিনি। ঘটনার দিন ছিল সীতাংশুর জন্মদিন। জন্মদিন উদ্যাপনের কথা বলে পলাশ কেক, জুস নিয়ে বাসায় ঢুকে তাঁর ওপর হামলা চালান। স্বামীর চিৎকারে স্ত্রী কৃষ্ণা এগিয়ে এলে তাঁকেও হাতুড়িপেটা করে শরীরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। মা-বাবাকে রক্ষায় দুই সন্তান এগিয়ে এলে তাদের ওপরও হামলা চালান পলাশ।

ঘটনার পর নিহতের ভাই সুধাংশু শেখর বিশ্বাস পলাশের বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। ২০১৬ সালের ৩০ মে আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। ২০১৭ সালের ২০ এপ্রিল ট্রাইব্যুনাল আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। অভিযোগ গঠনের পর আসামি হাইকোর্টে জামিনের আবেদন করেন। হাইকোর্ট তাঁকে জামিন দেন। এর পর থেকে তিনি পালিয়ে আছেন।

মামলার বাদী সুধাংশু শেখর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আসামির উপযুক্ত শাস্তি হয়েছে। কিন্তু লাভ কী হলো। এই শাস্তি তাকে দেওয়া যাবে কি না, তা অনিশ্চিত। আসামি দেশে আছে, নাকি বিদেশে পালিয়ে আছে, তা কেউ জানে না। সে নিরাপদেই আছে।’

শুধু এই একটি মামলাই নয়। এ রকম চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার অনেক আসামিই মামলার বিচার চলাকালে জামিন পেয়ে গেছেন। তবে সুনির্দিষ্ট হিসাব কারো কাছে নেই। এ বিষয়ে জামিনদারদের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হয় না। আসামির পক্ষে যাঁরা জামিনদার হন, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান থাকলেও তা নেওয়ার কথা শোনা যায় না। ফৌজদারি কার্যবিধির ৫১৪ ধারায় কোনো আসামি পলাতক হলে জামিনদারের কাছ থেকে মুচলেকায় দেওয়া অর্থ আদায় করার ব্যবস্থা করবেন আদালত। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের ব্যবস্থা যদি নেওয়া হতো, তাহলে চাঞ্চল্যকর মামলায় আসামির জামিনদার হতে অনেকেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলতেন এবং জামিনদার হলেও আসামির পালানো রোধ করতে তাঁরা সচেষ্ট হতেন। এমন ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় আসামিরা জামিন পেয়ে সহজেই পলাতক হন।

আইনজীবীরা মনে করেন, চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলায় আসামির জামিন দেওয়ার বিষয়ে যেকোনো আদালতের সতর্ক হওয়া উচিত। খুন করার পর আসামি গ্রেপ্তার হন। কিন্তু জামিনের বদৌলতে শাস্তি ভোগ করা থেকে নিষ্কৃতি পেলে এ ধরনের অপরাধের মাত্রা সমাজে বাড়বে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘বিভিন্ন কারণে আসামির জামিন দেন আদালত। এই এখতিয়ার আদালতের রয়েছে। কিন্তু স্বীকারোক্তি দেওয়ার পরও আসামির জামিন পাওয়াটা অনেক সময়ই অস্বাভাবিক মনে হয়। আর জামিন পাওয়ার পর তারা পালিয়ে রেহাই পেলে সমাজে এ ধরনের অপরাধপ্রবণতা বাড়তেই পারে।’

ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের অতিরিক্ত সরকারি কৌঁসুলি এস এম জাহিদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জামিন দেওয়া না দেওয়া আদালতের নিজস্ব বিবেচনার বিষয়। তবে চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলায় আসামির জামিন দেওয়ার বিষয়ে সব আদালতকেই সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। না হলে আইন-শৃঙ্খলার উন্নতি সম্ভব নয়।’

২০০৬ সালের ১৯ অক্টোবর সকালে ঢাকার মিরপুর ১৬ নম্বর রোডের মাথায় একটি ব্যাগের ভেতরে অজ্ঞাতপরিচয় এক নারীর কাটা মাথা, দুটি হাত ও দুটি পা উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় ওই দিনই মিরপুর থানায় এসআই হামিদুল হক একটি হত্যা মামলা করেন। তিনি নিজেই মামলাটির তদন্ত করেন। তদন্ত করতে গিয়ে পরদিন ২০ অক্টোবর মিরপুরের দক্ষিণ বিশিল এলাকার রাস্তা থেকে এসআই আসলাম আরেকটি ব্যাগের ভেতর থেকে এক মহিলার খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করেন। এরপর তদন্তের ভিত্তিতে গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ থানার রামদেব গ্রামের নজরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। নজরুল পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তিতে বলেন, ‘যার খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে তার নাম বিউটি। সে গার্মেন্টকর্মী। ৩২৮/বি আহম্মেদনগর, মিরপুরের বাসায় তাকে ধর্ষণের পর খুন করে লাশ খণ্ডবিখণ্ড করে রাস্তায় ফেলে দিই।’

নজরুল জানান, বিউটির সঙ্গে আরেক গার্মেন্টকর্মী ছিলেন। তিনি জীবিত। তদন্ত কর্মকর্তা পরে ওই গার্মেন্টকর্মীকে রাজধানীর সূত্রাপুর এলাকা থেকে উদ্ধার করেন। পরে তাঁকে আদালতে পাঠিয়ে জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়। বিউটির সঙ্গী ওই গার্মেন্টকর্মী আদালতকে জানান, আশুলিয়ায় একটি গার্মেন্টে বিউটি ও তিনি চাকরি করতেন। নজরুল ইসলাম একটি গার্মেন্টের মালিক। তাঁর দুষ্কর্মের সঙ্গী ফরিদপুর জেলার আলফাডাঙ্গা থানার পাচুরিয়া গ্রামের মোস্তফা তাঁর (গার্মেন্টকর্মী) এলাকার লোক। নজরুল ও মোস্তফা তাঁদের দুজনকে ঈদের বাজার করে দেওয়ার কথা বলে ২০০৬ সালের ১৮ অক্টোবর আশুলিয়া থেকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। নজরুলের বাসায় তাঁদের নিয়ে ওই দিন রাত ১১টা থেকে ভোর পর্যন্ত তাঁদের ধর্ষণ করেন। বিউটি ঘটনাটি সবাইকে বলে দেবেন বললে একপর্যায়ে দুজনে মিলে তাঁকে হত্যা করেন।

এ মামলার বিচার চলে ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৫-এ। বিচার চলাকালে ২০১১ সালের ২ মার্চ আসামি নজরুলকে জামিন দেন হাইকোর্ট। তখন বিচার প্রায় শেষ পর্যায়ে ছিল। আজ পর্যন্ত ওই আসামিকে আর গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। ২০১১ সালের শেষ দিকে এ মামলার রায়ে নজরুলকে ফাঁসির দণ্ড দেওয়া হয়।

গত বছরের ২৫ অক্টোবর কুষ্টিয়ায় স্কুলছাত্র হৃদয় হত্যা মামলায় তিনজনের ফাঁসির আদেশ দেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। এ মামলার আসামিরা হলেন কুষ্টিয়া শহরের কালিশংকরপুর এলাকার সাব্বির খান, হাউজিং এ ব্লকের হেলাল উদ্দীন ওরফে ড্যানী ও ভেড়ামারা উপজেলার দশমাইল এলাকার আবদুর রহিম শেখ ওরফে ইপিয়ার। রায় ঘোষণার সময় সাব্বির খান আদালতে উপস্থিত ছিলেন। বাকি দুই আসামি পলাতক রয়েছেন। আসামি হেলাল ঘটনার পর গ্রেপ্তার হয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে হত্যার দায় স্বীকার করেন। কিন্তু পরে জামিন পেয়ে পালিয়ে যান।

কুষ্টিয়া শহরের মোল্লাতেঘরিয়া এলাকার প্রবাসী মাজেদুল ইসলামের ছেলে হৃদয়কে মুক্তিপণের জন্য অপহরণের পর হত্যা করা হয়। সে কুষ্টিয়া জিলা স্কুলের অষ্টম শ্রেণিতে পড়ত। ২০১১ সালের ২৩ মে সন্ধ্যায় হৃদয় কলম-কাগজ কেনার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয়ে আর ফেরেনি। এ ঘটনায় আটক হওয়া হেলাল উদ্দিনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ঘটনার প্রায় সাড়ে চার মাস পর ভেড়ামারার নয়মাইল এলাকায় একটি মাঠে মাটি খুঁড়ে হৃদয়ের লাশ উদ্ধার করা হয়। সেই আসামি হেলালও হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়ে যান।

কুকুর লেলিয়ে হিমাদ্রী মজুমদার হিমুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় চট্টগ্রামে। ২০১৬ সালের ১৪ আগস্ট চট্টগ্রামের একটি আদালত এ মামলার রায়ে শাহাদৎ হোসেন সাজু, মাহবুব আলী ড্যানি, শাহ আলম টিপু, জাহিদুর রহমান শাওন ও জুনায়েদ আহমেদ রিয়াকে মৃত্যুদণ্ড দেন। রায়ের আগে শাওন জামিন নিয়ে পালিয়ে যান। সাজা ভোগ করানোর জন্য তাঁকে আর পাওয়া যাচ্ছে না।

ফেনীর বহুল আলোচিত ফুলগাজী উপজেলার চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি একরামুল হক একরাম হত্যা মামলায় ৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় গত বছরের ১৪ মার্চ। চাঞ্চল্যকর এ মামলার রায় ঘোষণার আগেই, মামলার বিচার চলাকালে ৯ আসামি জামিন পেয়ে যান। রায়ের আগে তাঁরা পালিয়ে যান।

শত্রুপক্ষকে ফাঁসাতে ২০০৮ সালের ৩০ জুন বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জে বোন ও বোনের চার কন্যাকে রাতের আঁধারে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করে দুই ভাই। গ্রেপ্তার করা হয় এসআই (চাকরিচ্যুত) শাহজাহান বৈরাগী ও তাঁর ভাই শহিদুল বৈরাগীকে। তাঁরা ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিও দেন। মামলা চলাকালে শাহজাহান জামিনে বের হয়ে পালিয়ে যান। ২০১৪ সালের ২৮ জানুয়ারি বিচারক শাহজাহানের অনুপস্থিতিতে দুই ভাইকে ফাঁসির দণ্ডাদেশ দেন। শাহজাহানকে গ্রেপ্তারে পরোয়ানা ইস্যু করা হলেও আজ পর্যন্ত তাঁকে গ্রেপ্তার করা যায়নি।

২০১১ সালের ৫ আগস্ট আট বছরের শিশু ইরানের লাশ মেহেরপুরের রাধাগোবিন্দপুর ধলা গ্রামের পাটক্ষেত থেকে উদ্ধার করা হয়। ২০১৬ সালের ২২ নভেম্বর মেহেরপুরের জেলা ও দায়রা জজ আদালত মামলার আসামি আহমেদ শরীফ দিপুকে মৃত্যুদণ্ড দেন। ওই শিশুর মায়ের সঙ্গে পরকীয়ার সম্পর্কের জের ধরে ইরানকে হত্যা করা হয় বলে আসামি স্বীকারোক্তি দেন। কিন্তু বিচার চলাকালেই আসামি আদালত থেকে জামিন পেয়ে যান। এরপর আর তাঁর খোঁজ নেই।

নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ী হালিম হত্যা মামলায় গত বছর চার আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন নারায়ণগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ আদালত। আসামিরা হলেন সাদেকুর রহমান, মো. ইকবাল হোসেন, সোহাগ ও বাবু কাজী। এই চার আসামিই বিচার চলাকালে উচ্চ আদালত থেকে জামিন পান। রায়ের আগে তাঁরা পালিয়ে যান।

এ রকম অনেক চাঞ্চল্যকর মামলার অনেক আসামি জামিন নিয়ে লাপাত্তা হয়ে গেছেন। ঢাকার আইনজীবী সঞ্জীব চন্দ্র দাস বলেন, ‘জামিন পাওয়ার অধিকার আসামির সাংবিধানিক অধিকার। তার পরও চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলায় আসামির বিচার ব্যবস্থায় সরকারের মনিটরিং থাকতে হবে। ভয়ংকর আসামিরা যাতে জামিন না পায় সে জন্য সরকারকে আন্তরিক থাকতে হবে। অন্যদিকে জামিন পাওয়ার পর তারা যাতে পালাতে না পারে সে জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নজরদারি থাকতে হবে।’

আরেক আইনজীবী দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘জামিনপ্রাপ্ত আসামিকে আদালতে হাজির করার জন্য মুচলেকায় স্বাক্ষর করা জামিনদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে এতসংখ্যক আসামি পালাতে পারত না। অন্যদিকে জামিন আবেদন করার পর আদালতকে রাষ্ট্রপক্ষের জানাতে হবে যে মামলাটি চাঞ্চল্যকর মামলা। অনেক সময় বিচারকদের চোখ ফাঁকি দিয়ে আসামিদের জামিন আদায় করা হয়। সে কারণে সংশ্লিষ্ট সবার নজরদারি থাকা উচিত।’



মন্তব্য