kalerkantho


পশ্চিমাদের নিষ্ক্রিয়তায় রোহিঙ্গা নিয়ে সংশয়

মেহেদী হাসান   

২৪ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



পশ্চিমাদের নিষ্ক্রিয়তায় রোহিঙ্গা নিয়ে সংশয়

গণহত্যা থেকে বাঁচাতে মিয়ানমারের কয়েক লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ এখন নিজেই বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে। পশ্চিমা দেশগুলো এ দেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মানবিক সংকট মোকাবেলার ওপরই শুধু গুরুত্ব দিচ্ছে। তাদের প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারকে বাধ্য করার মতো কোনো উদ্যোগই তারা নিচ্ছে না। ফলে তাদের উদ্দেশ্য নিয়েই বিভিন্ন মহলে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। আগে পশ্চিমা দেশগুলোর এমন ভূমিকার কারণে মধ্যপ্রাচ্যে ফিলিস্তিন সংকট সৃষ্টি হয়েছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন গত সোমবার জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার প্রতিনিধিকে বলেছেন, মিয়ানমারে সম্মানজনক প্রত্যাবাসন দেরি হলে তৃতীয় দেশে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর করা যায়। তবে কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ থেকে আগে যেসব দেশ রোহিঙ্গাদের ‘শরণার্থী’ হিসেবে গ্রহণ করেছিল, সেই দেশগুলোও এখন বড় পরিসরে রোহিঙ্গা নিতে আগ্রহী নয়। গত বছর কানাডা প্রথমে ১২ জন এবং পরে প্রায় ৩০০ জন রোহিঙ্গাকে শরণার্থী হিসেবে গ্রহণ করতে আগ্রহী দেখিয়েছে। এ দেশে আশ্রিত ১১ লাখ থেকে ১৩ লাখ রোহিঙ্গার তুলনায় এটি খুবই নগণ্য এবং একে ‘লোক-দেখানো’ প্রস্তাব বলেই মনে করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সংকটকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিয়ে গেলেও চীন, রাশিয়া, ভারতের মতো দেশগুলো একে এখনো বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের দ্বিপক্ষীয় সমস্যা  হিসেবে দেখছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয়—দুই পক্ষের দেশগুলোরই মিয়ানমারে কোনো না কোনো স্বার্থ আছে। মিয়ানমারে প্রভাব রাখে—এমন কিছু দেশ তাদের সেই প্রভাব ধরে রাখতে চায়। আবার কিছু পশ্চিমা দেশ রোহিঙ্গা ইস্যু পুঁজি করে মিয়ানমারে ঢুকতে চায়। মানবাধিকার ইস্যুতে সরব যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারে নিজের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কায় সুস্পষ্ট ‘গণহত্যা’কেও গণহত্যা বলে স্বীকার করছে না। 

বেশির ভাগ দেশ অবশ্য রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে স্বেচ্ছায়, নিরাপদে এবং সম্মানজনকভাবে প্রত্যাবাসন সমর্থন করার কথা বললেও সেখানে ফেরার আগ পর্যন্ত বাংলাদেশেই তাদের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করার পক্ষে। আবার রোহিঙ্গাদের এ দেশে রাখার জন্যও বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহল সক্রিয়। গত নভেম্বরে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করার উদ্যোগের সময় দেশি-বিদেশি কিছু সংস্থা রোহিঙ্গাদের মধ্যে প্রত্যাবাসনবিরোধী প্রচারণা চালিয়েছিল। প্রত্যাবাসনবিরোধী ব্যানার, প্ল্যাকার্ড সরবরাহ করে তারা। 

এ সপ্তাহে ঢাকায় সরকারি প্রতিনিধি ও বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে কথা বলে আভাস পাওয়া গেছে, রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার বিষয়টি এখন নানা শর্তের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের প্রত্যাবাসন চুক্তি অনুযায়ী, প্রত্যাবাসন হতে হবে স্বেচ্ছায়, নিরাপদে এবং সম্মানজনকভাবে। তা ছাড়া রোহিঙ্গাদের প্রমাণ করতে হবে যে তারা রাখাইনের বাসিন্দা ছিল। প্রথমত, মিয়ানমারে নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত অনেক রোহিঙ্গার পক্ষেই এটি প্রমাণ করা কঠিন। দ্বিতীয়ত, নাগরিকত্ব, ক্ষতিপূরণ ও নির্যাতন-নিপীড়নের বিচার ছাড়া রোহিঙ্গাদের বড় অংশই ফিরে যেতে চায় না। অন্যদিকে মিয়ানমারও এখন পর্যন্ত এসবের কোনোটিরই নিশ্চয়তা না দিয়ে কালক্ষেপণ করছে।

জানা গেছে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বুথিডংয়ে গত ৫ জানুয়ারি জঙ্গিগোষ্ঠী ‘আরাকান আর্মি’র কথিত হামলায় ১৩ পুলিশ সদস্য নিহত এবং আরো ৯ জন আহত হয়। এর তিন দিন পর ৮ জানুয়ারি মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মঞ্জুরুল করিম খানকে ডেকে দ্রুত প্রত্যাবাসন শুরু করার বিষয়ে আলোচনা করে।

সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার প্রস্তুত বলে জানালেও এর অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির কোনো উদ্যোগ নেয়নি, বরং সেখানে ‘আরাকান আর্মি’র সঙ্গে মিয়ানমার বাহিনীর চলমান সংঘাতে অবশিষ্ট রোহিঙ্গাদেরও ফিরে আসার উপক্রম হয়েছে।

মিয়ানমার সরকার বাংলাদেশে ‘আরাকান আর্মি’র ঘাঁটি থাকার তথ্য স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রচার করলেও বাংলাদেশ সরকার জোরালোভাবে তা নাকচ করেছে। সংশ্লিষ্ট কূটনীতিক ও কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে মিয়ানমার ওই অপপ্রচার চালিয়েছে।

এদিকে সীমান্তের শূন্যরেখায় মিয়ানমারের স্থাপনা নির্মাণ নিয়ে দুই দেশের উত্তেজনার মধ্যে মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিপি এ জন্য দুঃখ প্রকাশ করে। তবে ঢাকায় মিয়ানমার দূতাবাস এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, স্থাপনা নির্মাণের ওই স্থানটি মিয়ানমার ভূখণ্ডে পড়েছে। সম্প্রতি সেখানে ‘অনুপ্রবেশ’ ঠেকানোর অজুহাতে মিয়ানমার বাহিনীকে সতর্কতামূলক কিছু গুলিও ছুড়তে হয়েছে।

ড. এ কে আব্দুল মোমেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। একাধিকবার তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে গণহত্যা থেকে বাঁচিয়েছে। এখন রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান দীর্ঘায়িত হলে শুধু বাংলাদেশ, মিয়ানমার, ভারত, থাইল্যান্ডই নয়, চীনসহ পুরো অঞ্চলের শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

রোহিঙ্গাদের এ দেশে উপস্থিতির কারণে দীর্ঘ মেয়াদে বিরূপ প্রভাবের বিষয়ে সমীক্ষা চালাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দিয়েছেন এ কে আব্দুল মোমেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পশ্চিমা কূটনীতিক গতকাল বুধবার সকালে কালের কণ্ঠকে বলেন, রোহিঙ্গাদের অন্য দেশে পাঠানোর প্রস্তাবে পশ্চিমা দেশগুলো কতটা রাজি হবে, তা নিয়ে তাঁর জোর সন্দেহ আছে। ১১ লাখ একটি বিশাল সংখ্যা। তা ছাড়া তাদের গ্রহণকারী দেশগুলোকেও নানা ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে হতে পারে। কারণ ইউরোপীয় তথা পশ্চিমা দেশগুলোতে এখন প্রত্যাবাসন আগের চেয়ে অনেক স্পর্শকাতর ইস্যু।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. এম শাহীদুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মিয়ানমারের ওপর অর্থনৈতিক ও সামরিক ব্যবস্থা ছাড়া এ সমস্যার সমাধান হবে না। বাংলাদেশ চুক্তি করেছে মিয়ানমারের সঙ্গে। মিয়ানমারে ক্ষমতা এখনো গণহত্যাকারী সামরিক কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে। সংগত কারণেই ওই চুক্তি ব্যর্থ হতে যাচ্ছে। চাপ প্রয়োগ ছাড়া এ চুক্তি কখনো সফল হবে না। কারণ যারা রোহিঙ্গাদের তাড়িয়েছে তারা কি এমনি এমনি তাদের ফেরত নেবে?’ তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র কথা দিয়েছিল মিয়ানমারের অভিযুক্ত জেনারেলদের বিচার করবে। এ বিষয়ে এখনো কোনো উদ্যোগ দেখছি না। বাংলাদেশও এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে চাপ দেয়নি। রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান পেতে হলে অবশ্যই মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে। আমরা এখনো তা পারিনি। চীনের ভরসায় বসে আছে বাংলাদেশ। অথচ চীন কখনো এ সমস্যা সমাধানের জন্য ভূমিকা রাখবে না। বাংলাদেশের উচিত যুক্তরাষ্ট্রকে চাপ দেওয়া এবং তার প্রতিশ্রুতির কথা মনে করিয়ে দেওয়া।’

রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো সম্ভব না হলে কী হতে পারে জানতে চাইলে ড. এম শাহীদুজ্জামান বলেন, রোহিঙ্গারা না গেলে বাংলাদেশ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পর্যটন এলাকা কক্সবাজারে এরই মধ্যে চরম বিরূপ প্রভাব পড়েছে। রোহিঙ্গাদের উপস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে পরিস্থিতি হবে ভয়াবহ।

এদিকে মিয়ানমারে মানবাধিকারবিষয়ক জাতিসংঘের স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার ইয়াংহি লির সাত দিনের বাংলাদেশ সফর আগামীকাল শুক্রবার শেষ হচ্ছে ঢাকায় সংবাদ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে। তিনি নোয়াখালীর ভাসানচরে যেতে পারেন। কক্সবাজার থেকে ওই চরে রোহিঙ্গাদের সরিয়ে আনার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।

জানা গেছে, ইয়াংহি লির ভাসানচরে যাওয়া নিয়ে কিছুটা জটিলতা তৈরি হয়েছিল। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেছেন, সরকার ইয়াংহি লিকে ভাসানচরে যেতে বাধা দেয়নি। তবে ওই দ্বীপে রোহিঙ্গাদের জন্য স্থাপনা নির্মাণকাজ এখনো শেষ হয়নি। সেটি শেষ হলে সরকার নিজে থেকেই বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের ভাসানচর পরিদর্শনে আমন্ত্রণ জানাবে।

ইয়াংহি লি বাংলাদেশে আসার আগে থাইল্যান্ড গিয়েছিলেন। মিয়ানমারে ঢুকতে না পারায় তিনি দেশটির মানবাধিকার পরিস্থিতি জানতে প্রতিবেশী দেশগুলো সফর করছেন। থাইল্যান্ড ও বাংলাদেশ সফরে পাওয়া তথ্য এবং এসংক্রান্ত সুপারিশগুলো তিনি আগামী মার্চ মাসে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের ৪০তম অধিবেশনে উপস্থাপন করবেন।

লিকে মিয়ানমারে ঢুকতেই দিচ্ছে না দেশটির সরকার। তবে জাতিসংঘ মহাসচিবের মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূত ক্রিস্টিন শ্রেনার বার্গনার বর্তমানে মিয়ানমার সফর করছেন। আগামী ১ ফেব্রুয়ারি পাঁচ দিনের সফরে বাংলাদেশে আসছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রীর মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূত বব রে। মিয়ানমার সরকারের অনাগ্রহের কারণে বব রেও এখনো মিয়ানমার সফর করতে পারেননি। জানা গেছে, রোহিঙ্গা সংকট ছাড়াও মিয়ানমারে অনেক সমস্যা আছে। তাই তাঁরা শুধু রোহিঙ্গা ইস্যুতে কাজ করছেন, তা নয়। বৈশ্বিক ও আঞ্চলিকভাবে প্রভাবশালী দেশগুলোরও মিয়ানমারে বড় ধরনের স্বার্থ রয়েছে। তাই তারাও মিয়ানমারকে এ সংকট সমাধানের বিষয়ে খুব একটা চাপ দিচ্ছে না।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেন অবশ্য বলেছেন, ‘কূটনীতিতে শেষ বলে কিছু নেই। মিয়ানমার আজ যাকে তার ভূখণ্ডে থাকতে দিচ্ছে না, হয়তো ভবিষ্যতে তাকে দাওয়াত দিয়ে নিয়ে যাবে।’ রোহিঙ্গা সংকটকে কঠিন চ্যালেঞ্জ হিসেবে অভিহিত করে আগামী দিনগুলোতে এ নিয়ে তিনি কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

 



মন্তব্য