kalerkantho


দলের ভেতরেও প্রশ্ন

এই নেতৃত্বে কতদূর এগোবে বিএনপি

এনাম আবেদীন   

১৯ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



এই নেতৃত্বে কতদূর এগোবে বিএনপি

পর পর তিনটি নির্বাচনে বিপর্যয়ের পর বর্তমান নেতৃত্ব দিয়ে বিএনপি কতদূর সামনে এগিয়ে যেতে পারবে, সে আলোচনা এখন দলটির সামনে এসেছে। জানা গেছে, শুধু বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যেই এমন আলোচনা সীমাবদ্ধ নেই বরং একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দলের শুভানুধ্যায়ী তথা সমর্থক সুধীসমাজের মধ্যেও এ আলোচনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পরামর্শে দল পরিচালিত হচ্ছে বলে অন্য নেতাদের পক্ষ থেকে বলা হয়ে থাকে। কিন্তু তারেক রহমানের নেতৃত্ব আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় পছন্দ করছে কি না তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে বৃহৎ প্রতিবেশী দেশ ভারতের সমর্থন পাওয়া গেলে নির্বাচনে ফল এতটা বিপর্যয়কর নাও হতে পারত বলে অনেকে মনে করে।

এক-এগারোর পরিস্থিতির পর ২০০৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট মাত্র ৩২টি আসনে জয়লাভ করেছিল। এরপর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন দলটি বর্জন করে, যেটি কৌশলগত ভুল বলে অনেকে মনে করে। আর সর্বশেষ গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে অংশ নেওয়া সঠিক হলেও ভারতসহ আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন কোন দিকে তা বিএনপির নেতারা আঁচ করতে পারেননি বলে এখন দলটির অভ্যন্তরে আলোচনা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, অনেক চেষ্টা-তদবিরের পরও তারেক রহমানকে এখনো আস্থায় নেওয়া হয়নি।

বিএনপির একটি বড় অংশ মনে করে, জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় তারেক রহমানের অংশগ্রহণ বা স্কাইপে আসা দলের জন্য বড় ক্ষতির কারণ হয়েছে। ওই অংশের নেতাদের মতে, প্রথমত তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ কয়েকজনকে মনোনয়ন দেওয়ায় দলের মধ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। দ্বিতীয়ত, ওই ঘটনায় মনে হয়েছে, নির্বাচনে জয়লাভ করলে তারেকই হবেন সরকারের মূল চালক। এমনকি প্রধানমন্ত্রীও হতে পারেন বলে কেউ কেউ ধারণা করে। কারণ নির্বাচনের আগে ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে বৈঠকে ঢাকাস্থ বিদেশি কূটনীতিকরা জানতে চেয়েও এ বিষয়ে জবাব পাননি ড. কামাল হোসেনের কাছ থেকে। বিএনপিও বিষয়টি স্পষ্ট করেনি। ফলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যে অংশটি বিএনপিকে কিছুটা আস্থায় নিয়েছিল তারাও শেষ পর্যন্ত তারেক লাইম লাইটে আসায় দূরে সরে গেছে বলে মনে করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে তারেকের নেতৃত্বে বিএনপি ভবিষ্যতে কতদূর যাবে তা নিয়ে নতুন করে গুঞ্জন শুরু হয়েছে বিএনপিতে।

যদিও বিএনপির স্থায়ী কমিটির কোনো সদস্য এ বিষয়ে মুখ খুলতে রাজি হননি। তবে গুঞ্জনটি ভেতরে ভেতরে চাউর হচ্ছে বলে জানা গেছে। শুধু তাই নয়, একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিপর্যয়ের কারণে কাউন্সিলের মাধ্যমে দলের নেতৃত্বে পরিবর্তন আনার প্রস্তাব দিয়েছেন বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির দুই সদস্য। দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে গতকাল শুক্রবার বিকেলে এক আলোচনাসভায় ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের বক্তব্যে সরাসরি বিএনপির নেতৃত্ব পুনর্গঠনের কথা উঠে আসে।

কোনো কোনো বিশ্লেষক মনে করেন, নির্বাচনের আগে ছুটি নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে তারেক রহমান আড়ালে পরোক্ষ নীতিনির্ধারকের ভূমিকায় চলে গেলে জনমনে ইতিবাচক ধারণা সৃষ্টি হতো। বিশেষ করে ক্ষমতায় গেলে তিনি প্রধানমন্ত্রী হবেন না, এমনটি স্পষ্ট করলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তা ভালোভাবে গ্রহণ করত।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনে নিয়ামক ভূমিকা পালনকারী গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী কালের কণ্ঠকে স্পষ্ট করে বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন আদায়ের পাশাপাশি বিএনপিকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে তারেক রহমানকে কয়েক বছরের জন্য ছুটি নিতে হবে। তিনি বলেন, দলকে কী কারণে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে, এটি তারেককে বুঝতে হবে। না বুঝলে করণীয় কিছু নেই। প্রয়োজন হলে বিএনপিরই একজনকে দায়িত্ব দিতে হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি। জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, খালেদা জিয়া কারাগার থেকে বের হলে তিনি হাল ধরবেন। তাঁকে নিয়ে কোনো মহলের প্রশ্ন বা আপত্তি নেই।

সুশাসনের জন্য নাগরিক—সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, বিএনপির নেতৃত্ব সংকট এখন চরমে। দুর্ভাগ্যবশত এই দলের মধ্যে পরিবারতন্ত্রও প্রকট। এই সংকট কাটাতে হলে নতুন নেতৃত্ব ক্ষমতায়িত করতে হবে, যাতে একদিকে তারা দল হিসেবে সচল হয়; পাশাপাশি জনগণ এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের আস্থা অর্জন করতে পারে।

রাজনীতি-বিশ্লেষক ড. তারেক শামসুর রহমানের মতে, বিএনপি বর্তমানে যে নেতৃত্ব দিয়ে চলছে তাতে বেশি দূর এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এগিয়ে যেতে হলে বিএনপির বর্তমান নেতৃত্বের সংস্কার প্রয়োজন হবে। তিনি বলেন, স্থায়ী কমিটির শূন্য পদগুলোতে যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য নেতাদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

কারো নাম উল্লেখ না করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক বলেন, খালেদা জিয়াকে বাদ দিয়ে অন্য যে শীর্ষ নেতৃত্ব তাঁরা নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কারো কারো তাঁদের ব্যাপারে আপত্তির কথা শোনা যায়। তিনি আরো বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতও চায়, বিএনপিতে যোগ্য এবং গ্রহণযোগ্য বিকল্প একজন নেতা মার্চ করুক। তাহলে তারা সমর্থন দেবে।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্তত তিনজন সদস্য কালের কণ্ঠকে বলেন, চেয়ারপারসনের অনুপস্থিতিতে ঢাকায় যৌথ নেতৃত্বে দল একরকম ভালোই চলছিল। কিন্তু যেদিন তারেক রহমান স্কাইপে এসে সাক্ষাৎকার নেওয়া শুরু করলেন সেদিনই সব ভেস্তে গেল। কারণ সবাই মনে করতে লাগল তারেকই সব।

দলটির প্রবীণ আরো দুই নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ধানের শীষে জামায়াতের প্রার্থীদের নির্বাচন করতে দেওয়াটাও বিএনপির কৌশলগত আরেকটি ভুল ছিল, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সমর্থন করেনি।

বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় ক্ষমতার রদবদলের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ ফ্যাক্টরের তুলনায় বাইরের ফ্যাক্টরগুলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তাঁদের মতে, ব্যাপক জনসমর্থন থাকার পরও ওই সমীকরণ মেলাতে ব্যর্থ হওয়ায় তৃতীয়বারের মতো বিএনপিকে বিপর্যয়কর অবস্থায় পড়তে হলো।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মধ্যে বিএনপি বড় দল হলেও তারেক রহমানকে ওই ফ্রন্টের শীর্ষ নেতা মনে করা হয় না। ফ্রন্টের প্রধান নেতা মানা হয় গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনকে। অন্যদিকে ২০ দলীয় জোটের প্রধান সমন্বয়ক করা হয়েছে এলডিপির চেয়ারম্যান অলি আহমদকে। বস্তুত ওই জোটেও তারেক রহমানের সরাসরি প্রভাব কম। তবে ১৯৯৯ সালে চারদলীয় জোট গঠনের পর খালেদা জিয়াকে জোটনেত্রী এবং পরে ২০ দলীয় জোট গঠনের পরও তাঁকে জোটনেত্রী বলা হয়েছে।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া গত বছর ফেব্রুয়ারি মাসে একটি দুর্নীতি মামলায় সাজা নিয়ে কারাগারে যাওয়ার পর থেকে লন্ডনে বসে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিয়েছেন।

বিএনপির গঠনতন্ত্রের ৮(গ) ধারার ২ উপধারায় উল্লেখ আছে, চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতিতে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। একই ধারার ৩ নম্বর উপধারায় বলা হয়েছে, চেয়ারম্যানের পদ শূন্য হলে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান অবশিষ্ট মেয়াদে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

বিএনপির সিনিয়র নেতারা জানান, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তারেক রহমানকে বাদ দিয়ে নতুন করে কাউকে দলের নেতৃত্বে নেওয়ার সুযোগ নেই। নতুন কাউকে দায়িত্ব দিতে হলে দলের গঠনতন্ত্র সংশোধন করতে হবে। এ জন্য জাতীয় কাউন্সিল প্রয়োজন। তবে চেয়ারপারসন কারাগারে এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান লন্ডনে থাকায় দলকে ‘ফাংশনাল’ করার জন্য একজন নির্বাহী সভাপতি করা যায় বলে বিএনপির শুভাকাঙ্ক্ষীদের কেউ কেউ মনে করেন। এ ধরনের পদ গণফোরামে রয়েছে। ড. কামাল হোসেন ওই দলের সভাপতি হলেও অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরীকে নির্বাহী সভাপতি করা হয়েছে।

গত ১৫ জানুয়ারি বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে প্রবীণ এক সদস্য দলের ঘুরে দাঁড়ানোর উপায় হিসেবে তিনটি প্রস্তাব করেছিলেন। এর মধ্যে একটি হলো আগামী মার্চ অথবা এপ্রিলে জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠান। কিন্তু তার আগে দলের নির্বাহী কমিটির সভা এবং নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীদের বৈঠক ডেকে পরিস্থিতি পর্যালোচনার প্রস্তাব করেন তিনি। যদিও এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি।



মন্তব্য