kalerkantho


ঢাকার সড়ক যেই সেই

শৃঙ্খলা পিষ্ট বাসের অসুস্থ পাল্লায়

পার্থ সারথি দাস   

১৩ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



শৃঙ্খলা পিষ্ট বাসের অসুস্থ পাল্লায়

ছুটির দিন হওয়া সত্ত্বেও গতকাল শনিবার সকাল ১০টায় ঢাকার রাস্তায় উপচে পড়ছিল যাত্রী ও যানবাহন। মোটরসাইকেলের জটের মধ্যে বাসগুলো চলছিল পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে। এখানে-ওখানে দাঁড়িয়ে বাসগুলোর জট আরো জটিল হয়ে বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল রাস্তা। মিরপুর-১০, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, তালতলা, আগারগাঁওয়ে চলার রাস্তা তো খেয়ে ফেলেছে বাসগুলোই। লাল ও হলুদ রং মেশানো বিহঙ্গ পরিবহনের একটি বাস (ঢাকা মেট্রো-ব-১১৭১৯৭) চলছিল ধীরে ধীরে। ভাঙাচোরা রাস্তায় দুলতে দুলতে আগারগাঁওয়ের দিকে এগোচ্ছিল। যেখানে-সেখানে থামিয়ে তাতে তোলা হচ্ছিল যাত্রী। দূর থেকে বাসের সামনে গিয়ে চালককে লক্ষ্য করে কেউ হাত তুললেই থামিয়ে ফেলা হচ্ছে বাস।

শেওড়াপাড়ায় থেমে থেমে চলা অবস্থায়ই ফাঁক পেয়ে ওই বাসে উঠে দেখা গেল, বসার আসন ৩৭টি। এর মধ্যে শেষের সারির একটি মাত্র খালি। ওই ফাঁকা আসনে বসার পর আর খালি থাকল না আসন, তবুও বাস থামিয়ে যাত্রী তোলা হচ্ছিল। একটু পর দেখা গেল, বাস চলছে না। কারণ সামনে যানজট। শেওড়াপাড়া থেকে তালতলা হয়ে জট লেগেছে আগারগাঁও পর্যন্ত। আগারগাঁও মোড়ে বাস থেকে নেমে দেখা গেল, যানজটের বড় কারণ রাস্তায় যেখানে-সেখানে যাত্রী তোলা। বাসগুলো রাস্তায় এমনভাবে আড়াআড়ি রেখে যাত্রী তোলা হচ্ছিল যে একটি বাস অতিক্রম করা পেছনের বাসের পক্ষে সম্ভব নয়।

মেট্রো রেল প্রকল্পের কাজ চলায় মিরপুর-১২ থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত রাস্তার এমন দশা যে রাস্তা হিসেবে চেনাই দায়। রাস্তার পাশে গত সেপ্টেম্বরে লাগিয়ে রাখা ‘বাস থামার স্থান’ বা ‘বাস থামা নিষেধ’ লেখা নির্দেশনাগুলোর বেশির ভাগ চলে গেছে আড়ালে। বিহঙ্গ পরিবহনের ওই বাসের চালক মো. বিপ্লব বাস থেমে থাকলেই যেন খুশি। নির্দিষ্ট স্থান ছাড়াও যেখানে-সেখানে বাস থামানোর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সবাই যে যার মতো হাত উডায়, হাত উডাইলেই গাড়ি থামাইয়া দিতে হয়।’ ২৫ মিনিট পর বাস চলতে শুরু করলে আবার শুরু হলো হাত দেখে বাস থামানো। গতকাল শাহবাগ-ফার্মগেট, শাহবাগ-মৎস্য ভবন, প্রগতি সরণি-কুড়িল পথেও গণপরিবহনে এমন বিশৃঙ্খলা দেখা গেছে।

দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সদ্য সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মো. মোয়াজ্জেম হোসেনের গবেষণামূলক প্রবন্ধে উঠে এসেছে, যানজটের বড় কারণ বাসের বিশৃঙ্খল চলাচল। তাতে রাজধানীতে একটি বাস ঘণ্টায় যেতে পারছে গড়ে পাঁচ কিলোমিটার, অথচ ১২ বছর আগেও এ গতি ছিল ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার। যানজটে আটকে থাকায় যাত্রীদের মানসিক চাপ ও অন্যান্য রোগ দেখা দিচ্ছে। যানজটের ফলে শুধু ঢাকায় দৈনিক ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। তাতে বছরে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে।

অধ্যাপক মো. মোয়াজ্জেম হোসেনের মতে, সড়ক খাতে বিনিয়োগ, যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও যানজট নিরসনে রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এই ক্ষতির অন্তত ৬০ শতাংশ বা ২২ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব।

পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. এস এম সালেহ উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, বাসের চালকরা প্রতিযোগিতা করতে গিয়েই নির্দিষ্ট স্থানে বাস থামাচ্ছে না। কম্পানি গঠন হলে এ অবস্থার পরিবর্তন হবে।

জানা গেছে, ঢাকায় পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা আনতে ঢাকার কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় ২০০৪ সালে কম্পানিভিত্তিক বাস চলাচল পদ্ধতি প্রবর্তন করার সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু তা এ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) উদ্যোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিচালিত সমীক্ষায় উঠে এসেছে, রাজধানীর ১২৬টি রুটের গন্তব্য মিরপুর। মতিঝিল, আরামবাগ, দৈনিক বাংলা, পীরজঙ্গি মাজার, কমলাপুর এসব স্থানের নামে ভিন্ন ভিন্ন রুট অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। মতিঝিলেই ১১২টি রুটের গন্তব্য। গুলিস্তানে শেষ হয়েছে ৮৬টি রুট। রাজধানীর মিরপুর-গুলিস্তান রুটে চলছে ১২টি কম্পানির বাস। এক রুটে বিভিন্ন কম্পানির বাসের মধ্যে চলছে অসম ও অসুস্থ প্রতিযোগিতা। একটি বাসের পথ আটকে অন্য বাস যাত্রী তোলে। তাতে ঢাকার রাস্তায় বাসগুলোর সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার হচ্ছে না। যাত্রা সময়ও বিলম্বিত হচ্ছে।

গতকাল ফার্মগেটে শিকড় পরিবহনের একাধিক বাস আড়াআড়িভাবে থামিয়ে যাত্রী তোলা হচ্ছিল। তাতে আটকে পড়েছিল পেছনের বাস ও অন্যান্য গাড়ি।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মীর রেজাউল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাসচালক, হেলপার, যাত্রীদের সচেতন করতে আমরা লিফলেট বিতরণ করেছি যাতে তারা বাস স্টপেজ ব্যবহার করেন।’

ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েতউল্লাহ কয়েক দিন আগে  কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ট্রাফিক পুলিশ যে বাস স্টপেজ চিহ্নিত করছে তা নিয়ে আমাদের সঙ্গে আগে যোগাযোগ করেনি। বাস কাউন্টার স্থাপনের জন্য দুই সিটি করপোরেশনে আমরা চিঠি দিয়েছি। তারও উত্তর সময়মতো পাইনি।’

যদিও ঢাকার সড়কে ও পরিবহনে শৃঙ্খলা আনার মূল দায়িত্ব সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন সংস্থার, তবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সড়কে শৃঙ্খলা আনার ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। তিনি গত ১০ জানুয়ারি দুপুরে নিজ মন্ত্রণালয়ে বলেছেন, আট লেন, ছয় লেন করে কোনো লাভ হবে না যদি পরিবহনে শৃঙ্খলা না আসে।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে গত ২৯ জুলাই থেকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কয়েক দিন আন্দোলন চলার পর রাজধানীতে কম্পানিভিত্তিক বাস চলাচল শুরু করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল। নেওয়া হয়েছিল বাস রুট রেশনালাইজেশন ও কম্পানির মাধ্যমে বাস পরিচালনা প্রবর্তনের প্রকল্প। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র সাঈদ খোকনকে আহ্বায়ক করে গত ৯ সেপ্টেম্বর কমিটি করা হয় ১০ সদস্যের। ডিএনসিসির মেয়র প্রয়াত আনিসুল হকের উদ্যোগে রাজধানীর গণপরিবহনব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে ঢাকা মহানগরীতে ছয়টি কম্পানির মাধ্যমে ২২টি রুটে বাস পরিচালনার জন্য ওই প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। মূল কমিটি ও উপকমিটির সদস্য ড. এস এম সালেহ উদ্দিন গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, বর্তমানে ঢাকায় প্রায় ৩০০টি রুট আছে। এগুলো ২২টিতে নামিয়ে আনা হচ্ছে। নতুন সাড়ে চার হাজার বাস নামানো হবে। উপকমিটি এ পর্যন্ত দুটি সভা করেছে। শিগগির আরো সভা হবে। পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নে দুই বছর লাগবে।



মন্তব্য