kalerkantho


বেঁচে থাকার ব্যয় নিয়ে গোঁজামিলের হিসাব

শিক্ষা চিকিৎসা যাতায়াত খরচ বাদ রেখেই জীবনযাত্রার ব্যয় হিসাব করল ক্যাব

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৩ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



বেঁচে থাকার ব্যয় নিয়ে গোঁজামিলের হিসাব

ছবি : কালের কণ্ঠ

ঢাকা মহানগরের বাসিন্দাদের নিয়মিত খরচের গুরুত্বপূর্ণ খাত হলো খাদ্যপণ্য, নিত্যব্যবহার্য পণ্য ও সেবা, চিকিৎসা, যাতায়াত, বাড়িভাড়া ও শিক্ষা। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তাদের আয়ের সঙ্গে সংগতি রেখে ওই সব পণ্য ও সেবার পেছনে ব্যয় করে। কিন্তু অন্যতম খাত শিক্ষা, চিকিৎসা ও যাতায়াতে ব্যয়ের হিসাব আমলে না নিয়েই এবার জীবনযাত্রার ব্যয় নির্ধারণ করেছে ভোক্তাদের অধিকার রক্ষায় কাজ করা অলাভজনক সংগঠন কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। তাতে জীবনযাত্রার ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব উঠে আসেনি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ক্যাবের হিসাব অনুযায়ী ২০১৭ সালের তুলনায় ২০১৮ সালেও বেড়েছে বিভিন্ন পণ্য ও সেবা কেনা বাবদ খরচ। ক্যাবের প্রতিবেদন মতে, ২০১৮ সালে ঢাকায় জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে ৬ শতাংশ এবং পণ্যমূল্য ও সেবা সার্ভিসের মূল্য বেড়েছে ৫.১৯ শতাংশ। এর আগে ২০১৭ সালে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছিল ৮.৪৪ শতাংশ এবং পণ্য ও সেবা সার্ভিসের মূল্য বেড়েছিল ৭.১৭ শতাংশ।

গতকাল শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে ওই প্রতিবেদন তুলে ধরেন ক্যাবের সভাপতি গোলাম রহমান। তিনি জানান, ঢাকা শহরের ১৫টি খুচরা বাজার ও বিভিন্ন সেবা সার্ভিসের মধ্য থেকে ১১৪টি খাদ্যপণ্য, ২২টি নিত্যব্যবহার্য সামগ্রী এবং ১৪টি সেবা সার্ভিসের তথ্য নিয়ে ওই পর্যালোচনা প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।

শিক্ষা, চিকিৎসা ও যাতায়াত খাতে খরচের হিসাব বাদ দিয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় নির্ধারণ কতটা যৌক্তিক জানতে চাইলে ক্যাব সভাপতি বলেন, ‘এটা আমাদের সামর্থ্যের বাইরে।’ তবে প্রতিবেদনের আলাদা অংশে শিক্ষা, চিকিৎসা ও যাতায়াত নিয়ে মন্তব্য ও সুপারিশ করেছে ক্যাব।’

অভিভাবকদের কাঁধ থেকে শিক্ষার ব্যয় কিভাবে কমানো যায় পরামর্শ দিয়েছে ক্যাব। যাতায়াত খাত প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যাতায়াত ব্যবস্থায় উবার, পাঠাওয়ের মতো অ্যাপভিত্তিক সেবা চালু হয়েছে। সরকারিভাবে বাসভাড়া না বাড়ালেও বাসচালকদের অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। এসবের দিকে সরকারকে নজর দিতে অনুরোধ করেছে ক্যাব। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্যসেবার ব্যাপক সম্প্রসারণ হলেও সেবার মান আগের মতোই প্রশ্নবিদ্ধ ও ব্যয়বহুল। অথচ এগুলো বাদ রেখে জীবনযাত্রার ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ করেছে সংগঠনটি।

ঢাকায় নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শিক্ষা, চিকিৎসা ও যাতায়াতের ব্যয়টা জীবনযাত্রার ব্যয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখে। তবে যদি প্রতিষ্ঠানটি স্বীকার করে, এখানে কাজ করার সামর্থ্য তাদের নেই, তাহলে কিছু বলার নেই।’

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘খাদ্যবহির্ভূত সেবা বিশেষ করে শিক্ষা, চিকিৎসা ও প্রকৃত যাতায়াত খরচ বাদ দিয়ে যদি জীবনযাত্রার ব্যয় হিসাব করা হয় তবে প্রকৃত চিত্র উঠে আসবে না। কারণ ২০১৮ সালে এগুলোতে ব্যয় বেড়েছে। তাই যদি মূল হিসাবে এগুলো আনা হতো তবে জীবনযাত্রার ব্যয় আরো বেশি দেখা যেত।’

ক্যাবের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বছরের শেষে সহনীয় পর্যায়ে নেমে এলেও ২০১৭ সালের তুলনায় ২০১৮ সালে সব ধরনের চালের গড় মূল্য বেড়েছে ৮.৯১ শতাংশ। তবে সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে সাবানের, যা গড়ে প্রায় ২০ শতাংশ। অন্যান্য পণ্যের মধ্যে মাছের দাম বেড়েছে ১৩.৫০ শতাংশ, শাক-সবজির ৯.৩৮ শতাংশ, চা-পাতার ৮.৮৯ শতাংশ, পান-সুপারির ৭.১৮ শতাংশ, তরল দুধের ১০.৩৩ শতাংশ, গরম মসলার ৮ শতাংশ, মাংসের ৩.৩৭ শতাংশ, মুরগির ২.৭৯ শতাংশ, ডিমের ৭.৭১ শতাংশ। ২০১৮ সালে দেশি থান কাপড়ের দাম বেড়েছে ১০.৬৪ শতাংশ আর বিদেশি কাপড়ের দাম বেড়েছে ৬.৪৯ শতাংশ, দেশি শাড়ির দাম বেড়েছে ৬.৫৯ শতাংশ আর গেঞ্জি, তোয়ালে ও গামছায় ৭.৯৪ শতাংশ। নারিকেল তেলের দাম বেড়েছে ৭.৮৬ শতাংশ। ওয়াসার সরবরাহকৃত পানির মূল্য প্রতি হাজার লিটারে বেড়েছে ৫ শতাংশ। দুই কক্ষবিশিষ্ট বাড়িভাড়া বেড়েছে গড়ে ৫.৫ শতাংশ। 

প্রতিবেদন মতে, ২০১৮ সালে পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ডাল, লবণ, মসলা, চিনি ইত্যাদি পণ্যের দাম কমেছে। দেশি মসুর ডালের দাম কমেছে ১২.৪৩ শতাংশ, আমদানীকৃত মসুর ডালে কমেছে ১০.৮৪ শতাংশ, আস্ত ছোলার দাম কমেছে ৩.৩৭ শতাংশ। দেশে উৎপাদিত রসুনের দাম কমেছে কেজিপ্রতি ২০.৫৩ শতাংশ আর আমদানীকৃত রসুনের দাম কমেছে ৩২.৩৭ শতাংশ। কাঁচা মরিচের দাম কমেছে ১৫.২৬ শতাংশ। চিনির দাম কমেছে ১১.৭৫ শতাংশ। লবণের দাম কমেছে গড়ে ২.২৬ শতাংশ। বেশ কিছু শাক-সবজির দামও নিম্নমুখী ছিল, যেমন—লালশাকের দাম কমেছে ১৫.৯৫ শতাংশ, পটোলের দাম কমেছে ১০.১১ শতাংশ, ঝিঙার দাম কমেছে ৯.৭১ শতাংশ আর ঢেঁড়সের দাম কমেছে ১০.৩৭ শতাংশ।

দেশের মোট জনসংখ্যার বড় অংশ গ্রামে থাকলেও নিজেদের সামর্থ্যের অভাবে ব্যয়ের সার্বিক চিত্র তুলে আনা সম্ভব হয়নি বলে জানান গোলাম রহমান। তিনি বলেন, এটি হচ্ছে রাজধানী শহরের একটি খণ্ডচিত্র। এটা শহরের চিত্র সম্পর্কে একটি আংশিক ধারণা দেবে। তবে এই প্রতিবেদনে সারা দেশের তথ্য উঠে না এলেও দেশের ব্যয় বাড়া-কমার অবস্থার একটা ধারণা পাওয়া যায়। তিনি আরো বলেন, ‘আয় কমবেশি সবারই বেড়েছে। যাদের আয় ৬ শতাংশের বেশি তাদের ক্ষেত্রে এই ব্যয় বৃদ্ধি কোনো সমস্যা নয়। কিন্তু যাদের আয় বাড়েনি বা ৬ শতাংশের কম রয়েছে তাদের এটা কষ্টকর বিষয়। তাই আমরা চাই জীবনযাত্রার ব্যয় সীমিত থাকুক, আয় বৃদ্ধি পাক।’

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবির ভূঁইয়া, ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলম ও ক্যাবের অনলাইন পোর্টাল ভোক্তাকণ্ঠ ডটকমের সম্পাদক ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন।



মন্তব্য