kalerkantho


রাজনীতিক হারিয়ে যান অন্য পেশায়

শরীফুল আলম সুমন, রেজাউল করিম ও রফিকুল ইসলাম    

১৫ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



রাজনীতিক হারিয়ে যান অন্য পেশায়

একাদশ জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী এক হাজার ৮৪১ জন। নির্বাচন কমিশন এরই মধ্যে সব প্রার্থীর হলফনামা প্রকাশ করেছে। কালের কণ্ঠ’র পক্ষ থেকে এসব হলফনামা বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনগুলো তৈরি করা হয়েছে

সারা জীবন রাজনীতি করেছেন, জেল খেটেছেন, রাজপথে আন্দোলন করেছেন; কিন্তু পেশা হিসেবে সার্বক্ষণিক রাজনীতি উল্লেখ করেছেন খুব কমই। প্রধান দলগুলোর নেতারাও পেশার ঘরে উল্লেখ করেছেন ব্যবসা, কেউ কেউ দল বা সরকারের পদ উল্লেখ করলেও রাজনীতিকে সরাসরি পেশা হিসেবে দেখাননি। কেউ সমাজসেবা বা এমন অন্য সব অলংকরণের আড়ালে ঢেকেছেন রাজনীতি। ফলে একাদশ সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের পেশাগত তথ্য বিশ্লেষণ করে রাজনীতিকের সংখ্যা পাওয়া যায় হাতে গোনা।

অন্যদিকে পেশা হিসেবে ব্যবসা যাঁরা দেখিয়েছেন, তাঁদের সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে অন্য সব পেশাদারিকে। বড় বড় রাজনীতিবিদ যেমন রয়েছেন এ কাতারে, তেমনি রয়েছেন শিল্পপতি, পুরোদস্তুর ব্যবসায়ী, আবার মৌসুমে ফল বা শস্য কেনাবেচা করেন এমন প্রান্তিক ব্যবসায়ীও। এক হাজার ৭১৮ জন প্রার্থীর হলফনামা খুঁজে ৮৭৫ জনই পাওয়া গেছে ব্যবসায়ী। শতকরা হিসাবে যা ৪৯.৮৮ ভাগ।

দুই বৃহৎ জোটে অন্তর্ভুক্ত এবং নিবন্ধিত ৩৯টি দলই এবার নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। জোটভুক্ত ও জোটের বাইরেও আলাদাভাবে নির্বাচন করছে কোনো কোনো দল। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেও অংশ নিচ্ছেন ৯৬ জন। অথচ পেশাদার রাজনীতিক আছেন মাত্র ৮০ জন, যা মোট প্রার্থীর ৪.৬৫ শতাংশ।

সরকারি চাকরি ছেড়ে পৌরসভা নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে রাজনীতিতে সক্রিয় হন বিএনপির বর্তমান মহাসচিব মির্জা  ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিএনপির প্রধান খালেদা জিয়া দণ্ডিত হয়ে কারাগারে থাকায় মির্জা ফখরুলই এখন দলটিকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। সার্বক্ষণিক রাজনীতিতে সক্রিয় তিনি। আসন্ন সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছেন। নির্বাচন কমিশনে দেওয়া হলফনামায় তিনি পেশা হিসেবে লিখেছেন ব্যবসা ও পরামর্শক। এর আগে নবম সংসদ নির্বাচনেও ব্যবসা ও পরামর্শককে পেশা হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।

বর্তমানে একটি বড় দলের সাধারণ সম্পাদক পুরোপুরি রাজনীতিতে সক্রিয়। কয়েক দফা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছেন। কিন্তু একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হলফনামায় তিনি লিখেছেন, ‘পেশা : বেসরকারি চাকুরি (বর্তমানে এমপি ও মন্ত্রী হিসাবে বেতন-ভাতা পাই এবং বই ও পত্রপত্রিকায় লিখে আয় করি)’। এর আগে নবম ও দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি পেশা হিসেবে লেখেন ‘সাংবাদিকতা (লেখক ও সাহিত্যিক)’।

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ রংপুর-৩ আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নিতে হলফনামায় লিখেছেন, ‘পেশা : সাবেক রাষ্ট্রপতি ও চেয়ারম্যান, জাতীয় পার্টি’। এর আগের দুই নির্বাচনে তিনি লিখেছিলেন, ‘পেশা : চেয়ারম্যান ও প্রোপাইটর’। কিন্তু জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারাম্যান জি এম কাদের পেশা হিসেবে লিখেছেন রাজনীতি। একই দলের আরেক কো-চেয়ারম্যান ও বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ পেশা হিসেবে লিখেছেন, ‘অন্যান্য (ব্যবসা)’।

তবে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ও মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ সার্বক্ষণিক রাজনীতিবিদ। তিনি তাঁর পেশা হিসেবে রাজনীতি ও সংসদ সদস্য লিখেছেন।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সিলেট-৬ আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। তিনি লিখেছেন ‘পেশা : রাজনৈতিক কর্মী হিসাবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত সংসদ সদস্য। বর্তমানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী।’

কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) প্রার্থী জলি তালুকদার (নেত্রকোনা-৪) পেশা হিসেবে উল্লেখ করেছেন রাজনীতি। তিনি বছরে পার্টি থেকে ৯০ হাজার টাকা ভাতা পাওয়ার কথা জানিয়েছেন হলফনামায়। শেয়ার, সঞ্চয়পত্র ও ব্যাংক আমানত থেকে আয়ের কথা বলেছেন।

আওয়ামী লীগের প্রার্থী রেবেকা মোমিন (নেত্রকোনা-৪) পেশা হিসেবে দেখিয়েছেন রাজনীতি ও সমাজকর্ম। কৃষি খাত, দোকান ভাড়া, শেয়ার, সঞ্চয়পত্র, ব্যাংক আমানত থেকে তাঁর আয় হয়।

সিপিবির আরেকজন প্রার্থী পেশা হিসেবে সার্বক্ষণিক রাজনীতি উল্লেখ করেছেন। বিএনপির একজন প্রার্থী পেশা দেখিয়েছেন ট্রেড ইউনিয়নিস্ট।

আওয়ামী লীগের হাবিবুর রহমান মোল্লাও পেশা হিসেবে রাজনীতি ও সমাজসেবা উল্লেখ করেছেন। বাসদের খালেকুজ্জামান পেশা উল্লেখ করেছেন রাজনীতি। তাঁর আয় আসে কৃষি ও বন্ধু-শুভানুধ্যায়ীদের সহযোগিতা থেকে।

আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ হোসেন পেশার ঘরে উল্লেখ করেছেন সমাজসেবা। অনেকেই পেশার ঘরে রাজনীতির সঙ্গে ব্যবসাও উল্লেখ করেছেন। দলে যাঁদের উচ্চপদ রয়েছে এমন বেশ কয়েকজন রাজনীতিক পেশায় সংসদ সদস্য, মন্ত্রিত্বের কথা উল্লেখ করেছেন। ভাতা-পারিতোষিক, কৃষি ও পারিবারিক ব্যবসা, দোকান ভাড়া থেকে আয় দেখিয়েছেন।

একাদশ সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সার্বক্ষণিক রাজনীতিবিদ, একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, দলের বড় পদও পেয়েছেন এমন বেশির ভাগ নেতাই রাজনীতিকে পেশা হিসেবে দেখছেন না। রাজনীতিকে ঠিক রেখে অন্যান্য কাজ বা পেশায় যুক্ত হলেও রাজনীতিকে পেশা উল্লেখ করছেন না। নির্বাচনে অংশ নিতে চাওয়া প্রার্থীদের মধ্যে মাত্র ৮০ জন বা ৪.৬৫ শতাংশ প্রার্থী মনে করছেন তাঁদের পেশা রাজনীতি।

কালের কণ্ঠ’র বিশ্লেষণ বলছে, আগামী সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে প্রার্থীদের ৯৬ শতাংশই রাজনীতিকে পেশা হিসেবে মনে করেন না। জনসেবক বা জনপ্রতিনিধি হতে নির্বাচনে অংশ নিলেও তাঁরা রাজনীতির বাইরে অন্য পেশাকেই মূল হিসেবে মনে করছেন।

নির্বাচন কমিশন (ইসি) সূত্রে জানা যায়, একাদশ সংসদ নির্বাচনে বৈধ প্রার্থী ১৮৪১ জন। যার মধ্যে দলীয় প্রার্থী ১৭৪৫ জন আর স্বতন্ত্র প্রার্থী ৯৬ জন। এর আগে নবম সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হয়েছিল কিন্তু দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করেছিল বিএনপি। তারা এবার নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। এ ছাড়া ছোট ছোট ইসলামী দলগুলোও নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় প্রার্থীর সংখ্যা অনেক বেড়েছে।

নির্বাচনে অংশ নেওয়া সব দলের বৈধ প্রার্থীদের তথ্য বিশ্লেষণ করেছে কালের কণ্ঠ। মূলত কমিশনের ওয়েবসাইটে দেওয়া আসনভিত্তিক তথ্যানুযায়ী সব দলের প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণ করা হয়। সবার তথ্য না পাওয়ায় ১৭১৮ জন প্রার্থীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ-১৯৭২-এর ১২’র (৩খ) ধারা অনুযায়ী প্রার্থীকে হলফনামায় আট ধরনের তথ্য দিতে হয়। কমিশনের ওয়েবসাইটে পাওয়া বৈধ প্রার্থীর হলফনামা অনুযায়ী, আগামী সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে ইচ্ছুক প্রার্থীদের পেশাভিত্তিক বা কোন প্রার্থী কোন পেশার সেটা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, নির্বাচনে অংশ নিতে চাওয়া বা সংসদ সদস্য হতে চান এমন ৮৫৭ জন বা ৪৯.৮৮ শতাংশেরই পেশা ব্যবসা। অর্থাৎ তথ্যই বলছে প্রার্থীদের অর্ধেকই ব্যবসায়ী। এই ব্যবসায়ীর মধ্যে রয়েছে ছোট দোকানদার, ফল ব্যবসায়ী, ধান ও ভুট্টা ব্যবসায়ী, হোটেল ব্যবসায়ী ও যেকোনো ধরনের খুদে ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে শিল্পপতি বা করপোরেট ব্যবসায়ীও।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৮৭ জন শিক্ষক আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে চান। অর্থাৎ ১০.৮৮ শতাংশ শিক্ষকতা করেন বা সাবেক শিক্ষকও প্রার্থীর তালিকায় রয়েছেন। আইনজীবী রয়েছেন ১৬৯ জন বা ৯.৮৩ শতাংশ আইনজীবী সংসদে যেতে চান। পেশা কৃষি বা কৃষি থেকে আয়ে জীবিকা নির্বাহ ও সংসারের ভরপোষণ চলে এমন ২০১ জন বা ১১.৬৯ শতাংশ সংসদ সদস্য হতে চান। প্রার্থীদের ৪৬ জন বা ২.৬৭ শতাংশ ডাক্তার। সমাজসেবা করছেন এমন ১৭ জন বা ০.৯৮ শতাংশ প্রার্থী, ১৮ জন বা ১.০৪ শতাংশ সাংবাদিক এবং ৫০ জন বা ২.৯১ শতাংশ অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা, সামরিক-বেসামরিক ও সাবেক ব্যাংকারও জনপ্রতিনিধি হতে ইচ্ছুক। ৭.৫৬ শতাংশ বা ১৩০ পেশাজীবী এবং অন্যান্য পেশার ৭২ জন বা ৪.১৯ শতাংশ সংসদ সদস্য হতে চান।

পেশাজীবীদের মধ্যে রয়েছে মসজিদের ইমাম, বেসরকারি চাকরিজীবী, পরামর্শক (কলসালট্যান্ট), ইমারত শ্রমিক প্রভৃতি। অন্যান্য পেশার মধ্যে রয়েছে গৃহিণী, সংগীতশিল্পী, চিত্রনায়ক প্রভৃতি। শিক্ষকতা পেশার মধ্যে রয়েছে কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষক এবং মাদরাসার শিক্ষকরা।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়্যারম্যান ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রাজনীতিতে পেশাজীবী হিসেবে পরিচয় দিতে সংকোচ বোধ করেন রাজনীতিবিদরা। এটা থাকা উচিত নয়। তবে আগের চেয়ে অনেকেই এখন এই পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। ধীরে ধীরে এটার উন্নতি ঘটবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক আখতার হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রাজনীতি যেহেতু ইনকাম জেনারেট করে না, তাই পেশা হিসেবে এটাকে দেখাতে প্রার্থীদের বা রাজনৈতিক নেতাদের অনীহা। রাজনীতিকে পেশা হিসেবে দেখালে আপনাদের চলে কিভাবে এমন প্রশ্নের মুখে পড়বেন প্রার্থী। রাজনীতি আমাদের সমাজে পেশা হিসেবে স্বীকৃত নয়। রাজনীতি জনকল্যাণমূলক কাজ। তাই অন্য পেশা থেকে এখন রাজনীতিতে আসে। আগে আইন পেশা থেকে রাজনীতিতে বেশি আসতেন, এখন ব্যবসা বা অন্য কোনো পেশা থেকে আসছেন।’



মন্তব্য