kalerkantho


জোট ও পৃথক দুভাবেই ভোট

তৈমুর ফারুক তুষার   

১০ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



জোট ও পৃথক দুভাবেই ভোট

মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিনেও আসন বণ্টনের চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটে। শরিক দলগুলো জোটগত এবং আলাদা ভোট—এ দুই নীতিই নিয়েছে। ২৫৮ আসনে আওয়ামী লীগ নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে। বাকি ৪২ আসনের মধ্যে ২৭ আসনে জাতীয় পার্টি লাঙল প্রতীক নিয়ে, ১৪ আসনে ১৪ দলের শরিক ও যুক্তফ্রন্ট নৌকা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে, একটি আসনে জাতীয় পার্টি জেপির প্রার্থী বাইসাইকেল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। আওয়ামী লীগের ছেড়ে দেওয়া ৪২ আসনে সন্তুষ্ট না হয়ে মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টি ১৩২, জাসদ ৪, ন্যাপ ৯, গণতন্ত্রী পার্টি ৬, জেপি ৮ আসনে দলীয় প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। এ ছাড়া জাসদের একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। ফলে শতাধিক আসনেই মহাজোটের শরিকরা একে অপরের বিরুদ্ধে ভোটযুদ্ধে অবতীর্ণ হবেন।

গতকাল রবিবার নির্বাচন কমিশনকে ২৫৮ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের নৌকা প্রতীক বরাদ্দের চিঠি দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। চিঠিতে লেখা হয়, ‘গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২-এর আর্টিকেল ১৬ (২) ও ১৬ (৩) অনুযায়ী আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ মনোনীত নির্বাচনী এলাকাভিত্তিক প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা এতদসঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে। অতএব, এই সকল তালিকা অনুযায়ী সকল প্রার্থীদের নৌকা প্রতীক বরাদ্দ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানাচ্ছি।’

এই প্রার্থী তালিকায় দেখা যায়, শেষ মুহূর্তে বেশ কয়েকটি আসনে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে আওয়ামী লীগ। এর আগে টাঙ্গাইল-৫ আসনে সানোয়ার হোসেনকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হলেও তাঁকে বাদ দিয়ে আসনটি জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দিয়েছে আওয়ামী লীগ। কুড়িগ্রাম-৪ আসনটি জাতীয় পার্টি জেপিকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু গতকাল আসনটিতে আওয়ামী লীগ তাদের প্রার্থী জাকির হোসেনকে নৌকা প্রতীক বরাদ্দের চিঠি দিয়েছে। কুড়িগ্রাম-১ আসনটি জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছিল দলটি। কিন্তু সেখানে আওয়ামী লীগ তাদের প্রার্থী আছলাম হোসেন সওদাগরকে নৌকা প্রতীক বরাদ্দের চিঠি দিয়েছে। কুড়িগ্রাম-৩ আসনটি জাতীয় পার্টি দাবি করেছিল। কিন্তু আসনটিতে শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের প্রার্থী এম এ মতিনকে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী করা হয়েছে।

মহাজোটের আসন সমঝোতা নিয়ে গতকালও অস্পষ্টতা লক্ষ করা গেছে। সকালে জাতীয় পার্টির মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে বৈঠকের পর দাবি করেন, জাতীয় পার্টিকে ২৯ আসন ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে ১৩২টি আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। কিন্তু জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে যে ২৯ আসন ছেড়ে দেওয়ার দাবি করা হয় সেগুলোর মধ্যে বরিশাল-৩ ও কুড়িগ্রাম-১ আসনে নৌকার প্রার্থী রয়েছেন। বরিশাল-৩ আসনটিতে ওয়ার্কার্স পার্টির সংসদ সদস্য টিপু সুলতানকে মহাজোটের প্রার্থী করা হয়। তাঁকে নৌকা প্রতীক বরাদ্দের চিঠিও দেওয়া হয়। কিন্তু গতকাল এ আসনে গোলাম কিবরিয়া টিপুকে মহাজোটের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করে জাতীয় পার্টি। তবে ওয়ার্কার্স পার্টির একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা দাবি করেছেন, তাঁরা এ বিষয়ে কিছু জানেন না। কুড়িগ্রাম-১ আসনে জাতীয় পার্টির এ কে এম মোস্তাফিজুর রহমানকে মহাজোটের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে দাবি করা হলেও এ আসনে আছলাম হোসেন সওদাগরকে নৌকা প্রতীক বরাদ্দের চিঠি দেওয়া হয়েছে নির্বাচন কমিশনে।

১৪ দলের শরিকদের মধ্যেও আসন বণ্টন নিয়ে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। জোটের শরিক জাসদের পাঁচজন নেতা মহাজোটের মনোনয়নের বাইরে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এঁদের মধ্যে চারজন মশাল প্রতীক নিয়ে ও একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। কুমারেশ রায় রংপুর-২, খাদেমুল ইসলাম খুদি গাইবান্ধা-৩, শাহ জিকরুল আহমেদ ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫, মোহাম্মদ মহসীন বরিশাল-৬ এবং ময়মনসিংহ-৬ আসনে জাসদ নেতা সৈয়দ শফিকুল ইসলাম মিন্টু স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। এ আসনগুলোর মধ্যে রংপুর-২, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫, ময়মনসিংহ-৬, গাইবান্ধা-৩ এ চারটি আসনে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী রয়েছে। জাসদ ৩৭ আসনে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিল। গতকাল মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিনের মধ্যে ওই চারজন ছাড়া অন্যরা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেন।

১৪ দলের শরিক ন্যাপের ১৫ জন প্রার্থী দলীয় মনোনয়ন দাখিল করেছিলেন। এর মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে দুজন বাদ পড়েন ও তিনজন মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেন। ফলে দলটির ১০ জন প্রার্থী কুঁড়েঘর প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। লুত্ফর রহমান চৌধুরী দিনাজপুর-৬, আমিনুর রহমান টিপু বগুড়া-৬, মমতাজুর রহমান বগুড়া-৭, হারুনুর রশীদ বুলবুল নাটোর-৪, আব্দুর রশীদ ঢাকা-৫, মোহাম্মদ সুরত জামান জামালপুর-১, আব্দুল ওয়াদুদ সুনামগঞ্জ-৫, বাপন দাশগুপ্ত চট্টগ্রাম-৮, আলী নেওয়াজ খান চট্টগ্রাম-১৪, আশীষ কুমার শীল চট্টগ্রাম-১৬।

গণতন্ত্রী পার্টি ১০ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেয়। গতকাল পর্যন্ত চার আসনে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করা হয়। ছয়টি আসনে দলটির প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। কিশোরগঞ্জ-৩, পাবনা-৩, সুনামগঞ্জ-২, নোয়াখালী-৩, কুড়িগ্রাম-৪ ও গাইবান্ধার একটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন গণতন্ত্রী পার্টির প্রার্থীরা।

বাংলাদেশ জাসদ একটি আসনে মহাজোটের মনোনয়ন পেয়েছে। মনোনয়নবঞ্চিত হয়েছেন দলটির সভাপতি শরিফ নুরুল আম্বিয়া ও সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান। এ দুই নেতা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াবেন। তবে দলটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক আনিচুজ্জামান আনিচ বরিশাল-২ আসন থেকে স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করবেন।

জোটের শরিকদের দলীয় প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রসঙ্গে সম্প্রতি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘জোটের শরিকরা চাইলে দলীয় প্রতীক নিয়েও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন।’

ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা আমাদের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছি। তবে দু-একটি জায়গায় প্রার্থীরা থেকেও যেতে পারেন।’

জানতে চাইলে গণতন্ত্রী পার্টির সাধারণ সম্পাদক শাহাদাত হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা জোট রক্ষা এবং জোটের বাইরেও ভোট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কারণ আমাদের একটি আসনেও মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। কিন্তু আমাদের তো দলীয় অবস্থান ধরে রাখতে হবে। ফলে ছয়টি আসনে আমরা প্রার্থী দিয়েছি।’

ন্যাপের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা জোটকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে চাই না। কিন্তু আমাদের সংগঠনের নেতাদের তো জনগণের কাছে যেতে হয়। ফলে ১০টি আসনে আমরা ভোট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

জেপির মহাসচিব শেখ শহীদুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মহাজোটে আমাদের সঙ্গে দুটি আসনে সমঝোতা হয়েছিল। কুড়িগ্রাম-৪ আসনটিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী দেওয়ার বিষয়টিতে আমাদের এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। আমাদের প্রার্থীরা ৯টি আসনে বাইসাইকেল প্রতীকে নির্বাচন করবেন।’



মন্তব্য