kalerkantho


জাপানি সাময়িকী নিক্কেইকে সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা

তিন বছরেই দেশের প্রবৃদ্ধি হবে ১০%

‘বিপুল ভোটে বিজয়ী হবে আ. লীগ’

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

৭ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



তিন বছরেই দেশের প্রবৃদ্ধি হবে ১০%

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি যে গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে আগামী তিন বছরে এ দেশের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশে উন্নীত হবে। আর ২০২৪ সালের মধ্যে তাঁর জাতি নিম্ন আয়ের দেশের বদনাম ঘুচাবে। গত বুধবার জাপানভিত্তিক সাময়িকী নিক্কেই এশিয়ান রিভিউকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এই আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার এই সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে নিক্কেই এশিয়ান রিভিউ। আগামী ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করে এশিয়ার রাজনীতি, বাণিজ্য ও কূটনীতিবিষয়ক সাময়িকীটি। সাক্ষাৎকার প্রতিবেদনটিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যের পাশাপাশি বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রায় বর্তমান সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ ও সাফল্য তুলে ধরা হয়। এতে বর্তমান সরকারের বিদ্যুত্ উৎপাদন, অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা ও রোহিঙ্গা ইস্যুতে সাফল্য বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়।

নিক্কে এশিয়ান রিভিউর প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনা গত প্রায় এক দশক ধরে দেশের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৬ থেকে ৭ শতাংশে ধরে রেখেছেন। আর গত জুনে শেষ হওয়া অর্থবছর তাঁর দেশ ৭.৮৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৮.২৫ শতাংশ এবং ক্রমাগত এ হার আরো বাড়তে থাকবে। তিনি বলেন, ‘আমি যদি নির্বাচিত হই, আমি আশ্বস্ত করতে পারি যে আমরা যে কর্মসূচি হাতে নিয়েছি তাতে ২০২১ সাল নাগাদ প্রবৃদ্ধির হার ১০ শতাংশে পৌঁছাবে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ধাপে ধাপে নীতি গ্রহণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ এশিয়ার দ্রুততম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দেশে পরিণত হতে পারবে। এর একটি উদাহরণ হলো তিনি ১০০টি বিশেষ নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চলের নেটওয়ার্কে বিদেশি কম্পানিগুলোকে কারখানা স্থাপনে রাজি করানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন। বর্তমানে এমন ১১টি অঞ্চলে কার্যক্রম চলছে, আরো ৭৯টি এখনো নির্মাণাধীন আছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, আসন্ন নির্বাচন শেখ হাসিনার নীতিমালার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি পরীক্ষা। ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসেছিল। সেবার নির্বাচন বর্জন করে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। তবে এবার বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে, যদিও তাদের নেত্রী জেলে আছেন। জনমত জরিপগুলোর ফলাফলে দেখা গেছে, ৩০০টি আসনের মধ্যে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভ করবে আওয়ামী লীগ।

সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আগামী বছর যত দ্রুত সম্ভব দ্বিতীয় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প বাস্তবায়নে দরপত্র আহ্বান করা হবে। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মধ্যে দেশের বিদ্যুত্ সরবরাহ প্রক্রিয়াকে বিস্তৃত ও বৈচিত্র্যপূর্ণ করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এ পারমাণবিক কেন্দ্রটি স্থাপন করা হবে।

বাংলাদেশের বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ডকে উদ্ধৃত করে নিক্কে এশিয়ান রিভিউর প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের ১৭ হাজার ৩৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উৎপাদন সক্ষমতার ৫৮ শতাংশই প্রাকৃতিক গ্যাসের মাধ্যমে উৎপাদন করা হয়ে থাকে। তবে দেশের গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায়, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুতের চাহিদা পূরণের জন্য পারমাণবিক বিদ্যুত্ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রতিবছর বাংলাদেশে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে ১০ শতাংশ হারে।

নিক্কে এশিয়ান রিভিউর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৯ সালে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে উচ্চাকাঙ্ক্ষী অবকাঠামো কর্মসূচি হাতে নেন শেখ হাসিনা। তাঁর শাসনকালে বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা ২৭টি থেকে বেড়ে ১২১টিতে দাঁড়িয়েছে। ১৬ কোটি ৬০ লাখ জনসংখ্যার মধ্যে ৯৩ শতাংশের কাছে বিদ্যুত্ পৌঁছে গেছে। তাঁর ক্ষমতায় আসার আগে তা ৪৭ শতাংশ ছিল। আগামী বছরের মাঝামাঝি নাগাদ শতভাগ মানুষের কাছে বিদ্যুত্ সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রতিবেদনে বলা হয়, রাশিয়া ও ভারত রূপপুরে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করছে। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর (কেন্দ্রটির) দুটি চুল্লির সুবিধা রয়েছে। দুটি রি-অ্যাক্টরের উৎপাদনক্ষমতা হবে সর্বমোট দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। ২০২৪ সাল নাগাদ বিদ্যুত্ উৎপাদন শুরু হবে।

প্রস্তাবিত দ্বিতীয় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়েও কথা বলেন শেখ হাসিনা। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি দেশের অন্যতম দরিদ্রতম এলাকা দক্ষিণাঞ্চলে নির্মিত হওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘আমরা এখনো (এর জন্য) জমি খুঁজছি।’ তিনি জানান, নির্বাচনের পর জমি নির্ধারণ হলে এ ব্যাপারে প্রস্তাব (দরপত্র) আহ্বান করা হবে।

নিক্কে এশিয়ান রিভিউর প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, চীন তার জাতীয় কর্মসূচি ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভস’-এর অধীনে বাংলাদেশে বর্তমান সময়ে অনেক উন্নয়ন প্রকল্পে জড়িত। এরই মধ্যে দেশটি বাংলাদেশে দ্বিতীয় পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে স্থানীয় গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে।

বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের চুক্তি অনুযায়ী, এ দেশে ৩৮ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে চীনের। এর মধ্যে ২৪ বিলিয়ন শুধু অবকাঠামো নির্মাণে দ্বিপক্ষীয় সহায়তা ও ১৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার যৌথ প্রকল্পের জন্য। ভারতের সঙ্গে দরপত্রে জেতার পর ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে এখন ২৫ শতাংশ শেয়ার চীনের। এ ছাড়া চীনের সামরিক সরঞ্জাম আমদানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অন্যতম শীর্ষ দেশগুলোর একটি।

পরাশক্তি দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্কের ওপর জোর দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘ঢাকা শুধু তাদের প্রস্তাবই গ্রহণ করবে, যাদের প্রস্তাব আমাদের জন্য উপযোগী ও স্বস্তিদায়ক হবে।’

সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী মিয়ানমার থেকে আট লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে আসার বিষয়ে কথা বলেন। বিষয়টিকে নির্বাচনি ইস্যুতে পরিণত করার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বিষয়টি উড়িয়ে দেন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছে। কারণ, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশিরাও পাকিস্তানের এমন নিপীড়নের শিকার হয়েছিল। তখন প্রায় এক কোটি বাংলাদেশিকে আশ্রয় দেয় ভারত।’ নিজেদের অতীতের পরিস্থিতির কথা মনে করেই বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে বলে মন্তব্য করেন শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি খুবই ভাগ্যবান যে জনগণ আমাকে বিশ্বাস করেছে। যখন রোহিঙ্গাদের দুর্দশা দেখে সবাইকে এগিয়ে আসতে বলেছি, প্রয়োজনে আমাদের খাবার ভাগ করতে বলেছি, তখন জনগণ তা মেনে নিয়েছে। আশ্রয় দিয়েছে।’

প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ‘আমাদের যা করার ছিল করেছি। তাদের আশ্রয় দিয়েছি, খাবার দিয়েছি, চিকিৎসা দিয়েছি। নারী ও শিশুদের যত্ন নিয়েছি।’

প্রতিবেদনে বলা হয়, নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরুর বিষয়ে একমত হয়েছিল বাংলাদেশ ও মিয়ানমার। তবে রোহিঙ্গারা যেতে আগ্রহ প্রকাশ না করায় তা পিছিয়ে যায়। নিকটবর্তী দ্বীপ ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরের পরিকল্পনার বিষয়ে নিশ্চিত করেছেন শেখ হাসিনা। তবে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, দ্বীপটি বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে এবং এটি জেল ক্যাম্পের মতো হবে।

এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নিক্কেই এশিয়ানকে বলেন, ‘এটা চমৎকার একটা দ্বীপ। এখানে সবাই গরুর খামার করত। তারা সেখানে আরো ভালো থাকবে। শিশুরা শিক্ষা পাবে, চিকিৎসা পাবে। ত্রাণ সরবরাহে সুবিধার জন্য অবকাঠামোও নির্মাণ করব আমরা। আপাতত এক লাখ মানুষের আবাস তৈরি করা হলেও সেখানে ১০ লাখের বসবাসের ব্যবস্থা সম্ভব।’

সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী আশ্বাস পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, কোনো শরণার্থীকে জোর করে মিয়ানমারে পাঠানো হবে না। তবে এই সংকট সমাধানে অন্যান্য দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কিভাবে মিয়ানমারকে তাদের জনগোষ্ঠীকে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করা হবে, তা এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব।’



মন্তব্য