kalerkantho


ভয়ংকর রুদ্ধশ্বাস ৬ ঘণ্টা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৬ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



ভয়ংকর রুদ্ধশ্বাস ৬ ঘণ্টা

কাফনে মোড়ানো ছেলেকে ধরে মায়ের আহাজারি। ছবি : কালের কণ্ঠ

সময় তখন সকাল পৌনে ৮টা। শাহবাগ থানা পুলিশ খবর পায়, বাংলামোটরের একটি বাড়িতে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। খবর আসে, শিশুর মৃত্যুর পেছনে তার বাবার হাত আছে। ওই বাবাই আরেক শিশুসন্তানের গলায় দা ধরে রেখেছে। ছুটে যায় পুলিশ। ঘটনাস্থলে পৌঁছে ভেতরে ঢুকে বাবার কাছ থেকে জীবিত শিশুকে উদ্ধারের চেষ্টা চালায় পুলিশ। কিন্তু দা নিয়ে তেড়ে আসে বাবা নুরুজ্জামান। এ খবর ছড়িয়ে পড়ে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মী, মিডিয়াকর্মীসহ ছুটে আসেন র‌্যাব সদস্যরাও।

পুলিশ, র‌্যাব ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সকাল ৮টা থেকে চেষ্টা চালান বন্দিদশা থেকে জীবিত শিশুটিকে উদ্ধারের। কিন্তু দা হাতে নিয়ে শিশুটিকে জিম্মি করে রাখার কারণে সে চেষ্টা ব্যর্থ হচ্ছিল বারবার। অবশেষে দুপুর পৌনে ২টার দিকে পাশের মসজিদের ইমাম ও তিন-চার জন মুসল্লি ঢোকেন বাড়ির ভেতরে। তাঁরা গিয়ে জানান, তাঁর মারা যাওয়া শিশুর জানাজা পড়তে হবে। রাজি হন বাবা। তাঁরা বাবা নুরুজ্জামান, তাঁর ছেলে নূর সাফায়াতের কাফনে মোড়ানো লাশ ও আরেক ছেলে সুরায়েতকে কোলে করে ১টা ৫০ মিনিটে বের হয়ে আসেন। পুুলিশ আটক করে বাবাকে। হেফাজতে নেন জীবিত শিশুকে। শেষ হয় শ্বাসরুদ্ধকর এক ঘটনার। পরে জীবিত শিশুকে মায়ের হেফাজতে দেওয়া হয়।

রাজধানীর বাংলামোটরের লিংক রোডের খোদেজা খাতুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উল্টো দিকের ১৬ নম্বর বাড়িতে ঘটে এ ঘটনা। তবে সন্তান নূর সাফায়াতকে বাবা নুরুজ্জামান হত্যা করেছেন নাকি সে অসুস্থ হয়ে মারা গেছে সেটি গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পুলিশের সুরতহাল রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে শিশুটির বয়স আড়াই বছর। তার কপালের বাঁ পাশে কালো জখম পরিলক্ষিত হয়। ঠোঁটে দুটো কালো জখম রয়েছে। এলাকার লোকজন জানায়, শিশুটি কিছুটা অসুস্থ ছিল। ময়নাতদন্ত রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর শিশুটির মৃত্যুরহস্য জানা যাবে বলে পুলিশ জানায়।

যা হলো ছয় ঘণ্টা : বোন রোকেয়া বেগম কেয়া জানান, গতকাল সকাল সাড়ে ৭টার দিকে তাঁর ভাই নুরুজ্জামান আরেক ভাই নুরুল হুদা উজ্জলকে ফোন করে জানান তাঁর ছেলে সাফায়াত মারা গেছে। কয়েক দিন ধরেই ছেলেটি জন্ডিসে ভুগছিল। তার চিকিৎসা করাননি তিনি। খবর পেয়ে পরিবারের লোকজন বাড়িতে ঢুকতে গেলে তখনই দা নিয়ে তেড়ে আসেন নুরুজ্জামান। কাউকে ভেতরে ঢুকতে দেন না। পরে বিষয়টি পুলিশকে জানালে পুলিশ আসে।

বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খবর চলে যায় মিডিয়াকর্মীদের কাছেও। শিশুটিকে জিম্মিদশা থেকে মুক্ত করার জন্য খবর দেওয়া হয় ফায়ার সার্ভিসকেও। আসে র‌্যাব। খবর জেনে এলাকার শত শত মানুষ জড়ো হয় ওই এলাকায়। পথচারীদের ভিড় ছড়িয়ে পড়ে গোটা এলাকায়। এ সময় লোকজনকে সরাতে গিয়েও পুলিশকে হিমশিম খেতে হয়। লোকজন ধারণা করে, এক সন্তানকে হত্যা করে আরেক সন্তানকে জিম্মি করে রেখেছেন নুরুজ্জামান। এ অবস্থায় তাঁকে কিভাবে ভেতর থেকে বের করে আনা হবে তা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে পুলিশ। একপর্যায়ে কৌশলের অংশ হিসেবে মাইকে বাদ জোহর জানাজা পড়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। তাতেও সাড়া দেননি নুরুজ্জামান। অবশেষে সাদা পাঞ্জাবি পরিহিত মাওলানা আজহার ও এলাকার তিন-চারজন মুসল্লি ঢুকতে যান। পুলিশ ও র‌্যাব তাঁদের সহযোগিতা করে। মাওলানা আজহার যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই একজন মুসল্লি কোলে করে কাফন পড়ানো লাশ নিয়ে আসেন। আরেকজন কাঁধে করে জিম্মি শিশু সুরায়েতকে নিয়ে আসেন। আরেকজন নুরুজ্জামানকে গেট দিয়ে বের করেন। বের হতেই তাঁকে পুলিশ ঘিরে ধরে। তাঁকে আটক করে শাহবাগ থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।

র‌্যাব-২-এর সাব-ইন্সপেক্টর শহীদুল ইসলাম দুপুরের দিকে সাংবাদিকদের বলেন, “আমি বাড়ির ভেতরে ঢুকেছিলাম। সেখানে গিয়ে দেখি, শিশুটির বাবা বসে আছেন, তাঁর পাশে একজন হুজুর বসে আছেন। শিশুটিকে কাফনের কাপড় পরিয়ে একটি টেবিলের ওপর রাখা হয়েছে। শিশুটির বাবাকে কোনো সাহায্য লাগবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আপনাদের কারো সাহায্য লাগবে না। আপনারা কেন এসেছেন? আপনারা চলে যান। দুপুর ১টার দিকে আমি নিজে আজিমপুর কবরস্থানে গিয়ে আমার ছেলেকে দাফন করব।’”

যেন জেল খেটে এলাম : গতকাল বিকেলে কথা হয় মসজিদের সাবেক খাদেম আবদুল গাফফারের সঙ্গে। তিনি জানান, আগে নুরুজ্জামানদের বাসার পাশের মসজিদে খাদেম ছিলেন তিনি। গতকাল সকালে একজনের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। ওই সময়ই নুরুজ্জামান এসে জানান, তাঁর ছেলে মারা গেছে। কোরআন খতম করতে হবে। তখন কয়েকজন ছাত্রকে নিয়ে গাফফার তাঁর বাড়িতে যান। গিয়ে দেখতে পান একটি চাদর দিয়ে শিশুসন্তানের লাশ ঢেকে রাখা হয়েছে। বিষয়টি সন্দেহ হয় গাফফার ও ছাত্রদের। গাফফার জানতে চান, কিভাবে মারা গেছে? নুরুজ্জামান জানান, তাঁর স্ত্রী তাঁকে বিদ্যুতের শক দিয়ে মেরে ফেলেছে। তখন গাফফার বলেন, উনি তো আপনার এখানে থাকেন না তাহলে কিভাবে ঘটল এটি? এ প্রশ্ন করার পর ক্ষিপ্ত হন নুরুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘যে কাজ করতে এনেছি আপনারা সেই কাজ করেন। এত প্রশ্ন করবেন না।’ এসব বলে নুরুজ্জামান তাঁর হাতে রামদা নেন। ভয় পেয়ে যান তাঁরা। অবস্থা বেগতিক দেখে সেখানে যাওয়া ছাত্ররা বেরিয়ে যেতে চায়। এ সময় গাফফারও তাদের সঙ্গে বের হতে চান। কিন্তু ছাত্রদের বের হতে দিলেও গাফফারকে আটকে ফেলেন নুরুজ্জামান। তাঁকে বের হতে দেওয়া হয়নি। গাফফারের ভাষায়, ‘আমি একটা রুমে গিয়ে বসে ছিলাম। ভয় পাচ্ছিলাম খুব।’ তিনি জানান, একসময় ভাবলাম কিছু একটা করা দরকার। তিনি নুরুজ্জামানকে বললেন, ইমাম সাহেবকে ফোন করার জন্য। নুরুজ্জামান ও গাফফার দুজনই মাওলানা আজহারকে ফোন করেন। তাঁকে জানাজা পড়ার জন্য অনুরোধ জানান। এরপর দুপুর পৌনে ২টার দিকে ইমাম ও এলাকার তিন-চারজন মুসল্লি পুলিশ ও র‌্যাবের প্রহরার ভেতর দিয়ে বাসার ভেতরে যান। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁরা নুরুজ্জামান, এক ছেলের লাশ ও আরেক ছেলেকে কোলে করে নিয়ে বেরিয়ে আসেন।

নুরুজ্জামানের বোন যা বলেন : নুরুজ্জামানের বোন রোকেয়া বেগম কেয়া কালের কণ্ঠকে জানান, তাঁর বাবা মনু মেম্বার নামকরা মানুষ ছিলেন। তাঁর ঘর থেকে তাঁরা ৯ বোন ও পাঁচ ভাই জন্মান। বাংলামোটরের পাঁচ কাঠা জমি পাঁচ ভাইয়ের নামে লিখে দিয়ে গেছেন তাঁর বাবা। বোনদের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর তাঁরা পরিবার নিয়ে আলাদা থাকেন। দোতলা বাড়ির সামনের দিকে দোকান করে ভাড়া দিয়ে রাখা হয়েছে। দোকানের ভাড়া কয়েক লাখ টাকা আসে। সেই টাকা ভাইয়েরা ভাগ করে নেন।

বাড়িটিতে নুরুজ্জামান তাঁর স্ত্রী প্রিয়া দুই সন্তান সাফায়াত (৩) ও সুরায়েতকে (৪) নিয়ে বসবাস করেন। তাঁর অন্য ভাইয়েরাও এই বাড়িতে থাকতেন। কিন্তু নুরুজ্জামান মাদকাসক্ত হয়ে যাওয়ার পর থেকে ভাইদের দা দিয়ে ভয় দেখাতেন। তাঁর অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে তাঁরা বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র গিয়ে থাকেন। তাঁর স্ত্রী প্রিয়াও কিছুদিন আগে চলে গেছেন। যাওয়ার সময় দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু নুরুজ্জামান তাঁর সন্তানদের দিতে চাননি। ফলে ছেলেদের রেখেই চলে যেতে বাধ্য হন প্রিয়া। ছেলেদের বাইরে থেকে খাবার এনে খাওয়াতেন নুরুজ্জামান।

কেয়া জানান, দুটি সন্তানকে তাঁর ভাই খুব ভালোবাসেন। সারাক্ষণ তাদের বুকে-কাঁধে রাখেন। মাদকাসক্ত হওয়ার পর থেকে দা নিয়ে ঘোরাফেরা করেন। এ কারণে তাঁর বিরুদ্ধে অন্য এক ভাই মামলা করেছিলেন। পুলিশ তাঁকে ধরেও নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কিছুদিন আগে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে চলে আসেন। তিনি বলেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম কারাগারে থেকে ভালো হয়ে আসুক। কিন্তু হলো না।’

গতকাল ঘটনা চলার সময় নুরুজ্জামানের ভাই-বোনরা আসেন। তাঁরা জানান, তাঁরা ভেতরে ঢুকতে পারছেন না। একই সময় তাঁর স্ত্রী প্রিয়াও ঘটনাস্থলে আসেন। কিন্তু তাঁকে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করতে দেখা যায়নি। তবে সুরায়েতকে নিয়ে আসার পর বিলাপ করে মা পরিচয় দিয়ে এক মহিলা শিশুটিকে কোলে নিতে চান।

রাতে শাহবাগ থানার ওসি আবুল হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যে শিশুটিকে উদ্ধার করা হয়েছে তাকে থানায় নিয়ে আসা হয়েছিল। পরে তার মায়ের লিখিত নিয়ে তাঁর কাছে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে নুরুজ্জামান জানিয়েছেন যে সন্তানকে তিনি হত্যা করেননি। কখনো বলছেন সে বিদ্যুত্স্পৃষ্ট হয়ে মারা গেছে। কখনো বা স্ত্রী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের কথা বলছেন।’ এ ঘটনায় গত রাত পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি বলে জানান তিনি।

 



মন্তব্য