kalerkantho


হানাদার দেখলেই খুন চড়ত মাথায়

আলম ফরাজী, ময়মনসিংহ   

৬ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



হানাদার দেখলেই খুন চড়ত মাথায়

“হানাদাররা আমার দেশে ঢুকছে, এই জিদে এদের দেখা মাত্রই মাথায় আগুন ধরে যাইতো। দূর থাইক্যা দেখলেই মাথায় খুন চড়ত। খতম না করতে পারলে ভালা লাগত না। এই জন্য ক্যাম্পেই কমান্ডাররা আমারে ‘গণ্ডার’ ডাকত।” এভাবেই মুক্তিযুদ্ধের সময়কার স্মৃতি তুলে ধরেন ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার উজানচর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা ইমাম উদ্দিন। রাজিবপুর ইউনিয়নের চরাঞ্চলের এই মানুষটির বয়স আজ প্রায় ৯১ বছর। ছেলেদের আয়-রোজগার ও  নিজের ভাতা দিয়েই চলছে আট সদস্যের সংসার ও ওষুধ-পথ্যের জোগাড়।

ইমাম উদ্দিন বলেন, চাচাতো বোনের সঙ্গে বিয়ে ঠিক হওয়ায় তিনি বড় বোনকে আনতে যাওয়ার কথা বলে  ভারতের বাঘমারায় চলে গিয়েছিলেন। দুই স্থানে ২৫ দিনের ট্রেনিং শেষে তাঁকে কাজী আলম কম্পানির অধীনে দেশের যুদ্ধের জন্য পাঠানো হয়। কম্পানিতে ছিল ১৮৭ জন যোদ্ধা। প্লাটুনভিত্তিক ভাগ করা হয় তাদের। তিনি যুদ্ধ করেন প্লাটুন কমান্ডার হাবিবুর রহমান হলুদের সঙ্গে। যুদ্ধ শুরু মদনপুর দিয়ে। মদনপুর, ধর্মপাশা, গোবিন্দশ্রী, ঈশ্বরগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, তাড়াইল ও কেন্দুয়া উপজেলায় সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন তিনি। কিশোরগঞ্জ যুদ্ধে তিনি গুলিবিদ্ধ হন। চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে ভারতের মহেশখলা প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে আড়াই মাস অবস্থান করে ফের চলে আসেন নেত্রকোনার মদনে। সেখানে সম্মুখযুদ্ধে কয়েক শ হানাদার খতম করে সিলেট জেলা আক্রমণের জন্য রওনা দেন। এরই মধ্যে হানাদাররা পিছু হটলে তারা ধর্মপাশাতেই অবস্থান নেন।

ইমাম উদ্দিন বলেন, ‘পরের দিন খবর পেলাম পাক সেনারা আমাদের আক্রমণ করবে। আমরা তাদের প্রতিহত করতে দিনের বেলায়ই নদীর পারে দুটি অ্যাম্বুশ পাতার পরিকল্পনা করি। সারা দিনেও পাক সেনারা আর এলো না। সন্ধ্যার পর ঝাঁকে ঝাঁকে পাক সেনারা আমাদের দিকে আসছিল। কমান্ডার হাবিবুর রহমান হলুদ বললেন,  যুদ্ধে লাশ ও অস্ত্র ফেলে যাবে না। তিনি প্রথমে এলএমজির ব্রাশফায়ারের নির্দেশ দিলেন। আমি ব্রাশফায়ার করতেই কিছু পাক সেনা লাফিয়ে পড়ল মাটিতে। অন্যরা পাল্টা আক্রমণ শুরু করল। এ সময় সহযোদ্ধা আবুল হাসেমের ডান হাতে গুলি লাগে এবং কদ্দুস নামে এক মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। এরপর আরেকটি এলএমজি জিলানিকে দিলেন হলুদ ভাই। আমার হাতে তখন এসএলআর। এ পর্যায়ে হানাদারদের গুলিতে সহযোদ্ধা আব্দুল হাই মারা যান এবং জিলানী সামান্য আহত হন। জিলানী ও আমি মিলে আরো অনেক (তাঁর অনুমান শতাধিক) হানাদারকে খতম করি। এরপর নদী পার হয়ে পাশের একটি বাড়িতে গিয়ে কিছু খেয়ে আহত সহযোদ্ধা জিলানিকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে মহেশখলার দিকে যাওয়ার প্রস্তুতি নেই। তখন খবর পাই, ধর্মপাশার গোবিন্দশ্রী ধেনু নদীতে লঞ্চভর্তি হানাদার বাহিনী টহল দিচ্ছে। সেখানে যাওয়ার পথেই ওরা আমাদের ঘেরাও করে ফেলে। অপ্রস্তুত থাকায় কৌশলে এক বাড়ির ল্যাট্রিনে ঢুকে পড়ি। সেখানে প্রায় সাত-আট ঘণ্টা অবস্থানের পর পাশের বাড়িতে গিয়ে মাটির কলস সংগ্রহ করি। কলসের কানায় দড়ি বেঁধে পানির নিচে মাথা ডুবিয়ে আমরা নদীতে অবস্থান নেই। পানির টানে নদীর ওপারে পৌঁছে হানাদারদের বহনকারী লঞ্চ নিশানা করে এলএমজি দিয়ে ব্রাশফায়ার করি। আমার অনুমান এতে ২৫ জনের মতো হানাদার পানিতে পড়ে যায়। ভীতসন্ত্রস্ত দখলদাররা দ্রুত ওই স্থান ত্যাগ করে, আমরাও মহেশখলা ক্যাম্পে চলে যাই।’

অক্টোবরে ঈশ্বরগঞ্জ থানা দখল অভিযানের স্মতিচারণা করে তিনি বলেন, প্রথমে তাঁরা মাঝরাতে ময়মনসিংহ-ভৈরব রেলের মাইজগাঁ ও রামগোপালপুর এলাকার কৈট্টপুরি রেল সেতু ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দেন। তারপর আলতাফ কম্পানির কাজী হাসানুজ্জামান হীর থানা রোড, কাজী আলম কম্পানির হাবিবুর রহমান হলুদ থানার সন্মুখ ও হাবিবুল্লাহ কম্পানির মতিউর রহমানের নেতৃত্বে পেছন দিয়ে এবং ইমাম উদ্দিন নলুয়াপাড়া দিয়ে আক্রমণ শুরু করেন। সকাল ৮টা থেকে তিন ঘণ্টার যুদ্ধে তাঁরা গোলাবারুদ সংকটে পড়লে সহযোদ্ধা শামছু আনোয়ার (দুলাল), মন্নান (সোর্স) ও তাহেরকে পাঠানো হয় মজুদ থেকে গোলাবারুদ আনতে। ফেরার পর ভুল খবর পেয়ে তারা থানায় ঢুকে পড়ে এবং হানাদাররা তিনজনসহ আগে ধরা পড়া একজন মোট চারজনকে লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলিতে হত্যা করে। বিকেলের দিকে থানার পেছন দিকে প্লাটুন কমান্ডার মতিউর রহমান শহীদ হন। আব্দুল খালেক ও হাতেম আহত অবস্থায় দত্তপাড়া গ্রামে এক ব্যক্তির বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাঁদেরও হানাদারদের হতে তুলে দেওয়া হলে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ইমাম উদ্দিন বলেন, ‘১২ অক্টোবরের যুদ্ধে সাত সহযোদ্ধাকে হারিয়ে আমরা ঈশ্বরগঞ্জ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হই। ৮ ডিসেম্বর গৌরীপুরের বোরহান তালুকদারের নেতৃত্বে একদল মুক্তিযোদ্ধা এসে অবস্থান নেয় ঈশ্বরগঞ্জ এলাকায়। পরে ওই দলের সঙ্গে যোগ দিয়ে হানাদারদের হঠিয়ে ঈশ্বরগঞ্জ থানা মুক্ত করতে সক্ষম হই।’

 



মন্তব্য