kalerkantho


এই হলফনামার মূল্য কী

আরিফুর রহমান   

৬ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



এই হলফনামার মূল্য কী

প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার আগে একজন প্রার্থী প্রথম শ্রেণির জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে শপথ করে তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশা, আয়, সম্পদ, মামলাসহ মোট আটটি তথ্য দিয়ে বলেন, ‘আমি শপথ করে বলছি, এই হলফনামায় দেওয়া যাবতীয় তথ্য এবং দাখিল করা সব ধরনের দলিল-দস্তাবেজ আমার জ্ঞান ও বিশ্বাসমতে সম্পূর্ণ সত্য ও নির্ভুল।’ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখেও আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা ২০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে এই শপথ করে রিটার্নিং অফিসারের কাছে হলফনামা জমা দিয়েছেন। কিন্তু গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রার্থীদের হলফনামা দেখে বিস্মিত ভোটার, নির্বাচন বিশ্লেষক এবং আইনজীবীরা। তাঁদের সন্দেহ, প্রার্থীরা হলফনামায় তাঁদের আয়, সম্পদ পেশার সঠিক তথ্য দেননি। তাঁরা তথ্য গোপন করেছেন, অনেকে মিথ্যা তথ্যও দিয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন, পাঁচ বছর আগে একেকজন সংসদ সদস্য (এমপি) তাঁর হলফনামায় আয় ও সম্পদের যে তথ্য দিয়েছেন, পাঁচ বছর পর হুবহু একই তথ্য কিভাবে দেন? এ ছাড়া পাঁচ বছর আগে একজন এমপি কিংবা মন্ত্রীর যে পরিমাণ আয় ও সম্পদ ছিল, পাঁচ বছরের ব্যবধানে সেটি কয়েক গুণ বাড়ে কিভাবে? আবার এমপি পদের জন্য নির্বাচনে দাঁড়ানো কোনো কোনো প্রার্থী এতটা গরিব হন কিভাবে সাধারণ মানুষের মধ্যে সে প্রশ্নও উঠেছে।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে স্পষ্ট করে বলা আছে, হলফনমার মাধ্যমে কোনো প্রার্থী সঠিক তথ্য না দিলে অথবা অসত্য তথ্য দিলে এবং রিটার্নিং অফিসারের তদন্তে তা প্রমাণিত হলে তিনি প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করতে পারবেন। নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) মনোনয়নপত্র বাতিলের ক্ষমতা দেওয়া আছে গণপ্রতিনিধিত্ব আইনে। নির্বাচন কমিশন চাইলে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সহযোগিতা নিতে পারে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন এখন পর্যন্ত দুদক ও এনবিআরের কাছে সহযোগিতা চায়নি। একই সঙ্গে গণপ্রতিনিধিত্ব আইনও কার্যকর করছে না বলে অভিযোগ বিশেষজ্ঞদের। আর প্রশ্রয়ের এই সংস্কৃতি মিথ্যাচারে উৎসাহিত করছে বলেও মনে করছেন তাঁরা।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, প্রার্থীদের হলফনমায় অসত্য ও তথ্য গোপনের বিষয়ে নির্বাচন কমিশন যথেষ্ট মনোযোগী নয়। নির্বাচন কমিশন চাইলে প্রার্থীদের তথ্য যাচাই-বাছাই করতে পারে। কিন্তু কমিশন সেটি করছে না। তিনি বলেন, ‘প্রার্থীর তথ্য গোপন খতিয়ে দেখে সত্যটা বের করে নির্বাচন কমিশন যদি কয়েকজনকে অযোগ্য ঘোষণা করত, তাহলে রাজনৈতিক অঙ্গন অনেকটা কলুষমুক্ত হতো। ভবিষ্যতে কেউ হলফনামা দেওয়ার সময় সতর্ক হতো।’ তিনি বলেন, ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বলেই দিন দিন হলফনামা মূল্যহীন হয়ে যাচ্ছে।

দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদের হলফনামা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ঢাকা-৫ আসনের আওয়ামী লীগের এমপি হাবিবুর রহমান মোল্লার বাসায় গত পাঁচ বছরে নতুন কোনো আসবাবপত্র যোগ হয়নি। এই সময়ে তিনি কোনো ধরনের ইলেকট্রনিক পণ্য কেনেননি। সোনা, অলংকার ও ধাতু কেনা হয়নি গত পাঁচ বছরে। উল্টো তাঁর আয় কমেছে। হলফনামা মতে, ঢাকা-১৫ আসনের আওয়ামী লীগের এমপি কামাল আহমেদ মজুমদারেরও আর্থিক কোনো উন্নতি হয়নি গত পাঁচ বছরে, বরং অবনতি হয়েছে। তাঁর আয় কমে গেছে। দশম ও একাদশ দুই হলফনামা পর্যালোচনা করে এমন তথ্য মিলেছে। অন্যদিকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আয় দ্বিগুণ বেড়েছে। হলফনামায় জমা দেওয়া এসব তথ্য নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে যাওয়া প্রার্থীদের সম্পদ খতিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। তাদের জমা দেওয়া সম্পদের তথ্য বিবরণী খতিয়ে দেখতে নির্বাচন কমিশনকে অনুরোধ জানিয়েছে জার্মানভিত্তিক সংস্থাটি। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, রাজনৈতিক নেতাদের যখন থেকে হলফনামা দেওয়া শুরু হয় তখন উদ্যোগটা ইতিবাচক ছিল। কিন্তু এখন তা হয়ে গেছে শুধু আনুষ্ঠানিকতা, সঙ্গে আছে বিচারহীনতা। প্রার্থীরা হলফনামায় সেযব তথ্য দিয়ে থাকেন তার সঙ্গে বাস্তবতার কতখানি মিল আছে, তা নির্বাচন কমিশনের অনুসন্ধান করা উচিত। চাইলে দুদক ও এনবিআরের সাহায্য নিতে পারে নির্বাচন কমিশন। কিন্তু সে উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। তিনি অভিযোগ করে বলেন, প্রার্থীরা সমান সুযোগ পাচ্ছে না। কাউকে ছোট কোনো ত্রুটি দেখলেই তাঁর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হচ্ছে। আবার কারো বড় ভুলেও তাঁর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।

হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দিলে বা তথ্য গোপন করলে সংক্ষুব্ধ কেউ আদালতের আশ্রয় নিতে পারেন। ২০০৯ সালের ১৮ অক্টোবর ভোলা-৩ আসনের আওয়ামী লীগের মেজর (অব.) জসিমউদ্দিনের এমপি পদ অবৈধ বলে রায় দিয়ে সেখানে পুনরায় নির্বাচন অনুষ্ঠানের নির্দেশ দেন। মেজর (অব.) জসিমউদ্দিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তিনি চাকরি থেকে তাঁর অবসরসংক্রান্ত তথ্য গোপন করেছেন। ওই বছরের  ১৪ ডিসেম্বর হাইকোর্টের নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল টাঙ্গাইল-৫ আসনের মহাজোটের (জাতীয় পার্টি) আবুল কাশেমের এমপি পদ বাতিল ও অবৈধ ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে ওই আসনের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোটপ্রাপ্ত বিএনপির প্রার্থী মেজর জেনারেল (অব.) মাহমুদুল হাসানকে বিজয়ী ঘোষণা করতে ইসিকে নির্দেশ দেন। আবুল কাশেমের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তিনি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সময় ঋণ ও বিল খেলাপি ছিলেন এবং হলফনামায় সেই তথ্য গোপন করেছেন। 

সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন বলেন, প্রার্থী যদি এমপি পদে নির্বাচিত হন, তাহলেও যদি মিথ্যা তথ্য দেওয়ার প্রমাণ মেলে, তাঁর এমপি পদ বাতিল হয়ে যাবে।

বিশিষ্ট আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, কার কত সম্পদ আছে, সেটা অনুসন্ধান করতে অনেক সময়ের প্রয়োজন হয়। নির্বাচন কমিশনের পক্ষে অনেক সময় এত বিশাল কাজ করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। তাই তারা চাইলে এনবিআর ও দুদকের সহযোগিতা চাইতে পারে। কারণ এনবিআরের কাছে আয়কর রিটার্ন জমা রয়েছে। এরই মধ্যে দুদক সহযোগিতা করার ঘোষণা দিয়েছে।

তবে নির্বাচন কমিশনের এক কর্মকর্ত নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, যেসব প্রার্থীর আয় কমেছে, হতে পারে গত পাঁচ বছর তাঁদের ব্যবসা-বাণিজ্য খারাপ গেছে। আর যাঁদের আয় বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে, তাঁদের তথ্য পর্যালোচনার এত লম্বা সময় নির্বাচন কমিশনের হাতে থাকে না। কোন কোন খাতে প্রার্থীর সম্পদ ও আয় বেড়েছে, তা অনুসন্ধান করতে গেলে অনেক সময় লাগে।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২-এর ১২ (৩বি) অনুচ্ছেদ অনুসারে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সব প্রার্থীকে মনোনয়নপত্রের সঙ্গে হলফনামার মাধ্যমে আটটি তথ্য দাখিল করতে হবে। হলফনামায় শিক্ষাগত যোগ্যতা, বর্তমানে কোনো ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত আছেন কি না, অতীতে তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের করা কোনো ফৌজদারি মামলার রেকর্ড আছে আছে কি না, থাকলে রায় কী ছিল—এসব তথ্য দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ ছাড়া প্রার্থীর ব্যবসা ও পেশার বিবরণী, সম্ভাব্য আয়ের উৎস, তাঁর নিজের ও তাঁর ওপর নির্ভরশীলদের সম্পদ ও দায়ের বিবরণী, কোনো ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়েছেন কি না, নিলে সেই ঋণের পরিমাণ কত এবং অতীতে এমপি হিসেবে নির্বাচিত হয়ে থাকলে নির্বাচনের আগে কোনো প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন কি না, এসব তথ্যও দিতে বাধ্য একজন প্রার্থী।

ইসির ‘অক্ষমতা’ : সরকারের সঙ্গে আইনবহির্ভূত ব্যবসায় জড়িত থাকায় এমপি এনামুল হকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানিয়ে দুদক ২০১২ সালের ১০ এপ্রিল সংসদ সচিবালয় ও নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দেয়। চিঠিতে জানানো হয়, এনামুল হক আইনবহির্ভূতভাবে সরকারের সঙ্গে ব্যবসায় যুক্ত রয়েছেন বলে দুদকের অনুসন্ধানে জানা গেছে। চিঠিতে বলা হয়, এনামুল হকের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ‘নর্দান পাওয়ার সল্যুশন লিমিটেড’ ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের মধ্যে রাজশাহীর কাটাখালীতে পাঁচ বছরের জন্য ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎ প্লান্ট নির্মাণের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ ছাড়া এনামুল হকের অপর প্রতিষ্ঠান এনা প্রপার্টিজ লিমিটেড ও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মধ্যে ওই করপোরেশনের বহুতল সিটি সেন্টার  নির্মাণেরও চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এ দুটি চুক্তির মধ্যে বিদ্যুৎ প্লান্টে এনামুল হকের কম্পানির জেনারেল ম্যানেজার ও সিটি সেন্টারের ক্ষেত্রে এনামুল হক নিজে স্বাক্ষর করেছেন। বিষয়টি গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২ (জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আইন)-এর ১২ বিধির লঙ্ঘন উল্লেখ করে  জাতীয় সংসদ ও নির্বাচন কমিশনকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানানো হয় চিঠিতে।

জবাবে দুদককে নির্বাচন কমিশন জানায়, এনামুল হকের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশন কোনো পদক্ষেপ নেবে না। এর আগে আগে ওই বছরের ৯ মে এ বিষয়ে দুদকের এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন জাতীয় সংসদের তৎকালীন স্পিকার আবদুল হামিদ। ওই দিন সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, একজন এমপি যদি দুর্নীতি করেন, তবে দুদক তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত করতে পারে। কিন্তু একজন ব্যক্তি এমপি হওয়ার যোগ্য কি না, সে বিষয়ে তদন্ত করার এখতিয়ার দুদকের আছে বলে মনে হয় না। এই এখতিয়ার সংসদের। সংসদে এ নিয়ে কেউ প্রশ্ন  তুললে সংসদ তা আমলে নেবে। এ বিষয়ে দুদকের এখতিয়ার কতটুকু তা স্পষ্ট করার জন্য তাদের চিঠি দেওয়া হবে বলেও জানান তৎকালীন স্পিকার।

 

 



মন্তব্য