kalerkantho


সবার আগে দরকার ইসির নিরপেক্ষতা

সুষ্ঠু ভোটের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বিশিষ্টজনদের পরামর্শ

পার্থ সারথি দাস   

১৭ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



সবার আগে দরকার ইসির নিরপেক্ষতা

শেষ পর্যন্ত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে ছোট-বড় সব দল। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট দশম সংসদ নির্বাচন বর্জন করলেও এবার এ জোটসহ নতুন গড়া জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে নিয়ে ভোটে যাচ্ছে বিএনপি। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগও ১৪ দলীয় জোট সম্প্রসারণ করে, এমনকি জাতীয় পার্টি ও বিকল্পধারাসহ বিভিন্ন দলকে নিয়ে মহাজোট গঠন করে ভোটে লড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিএনপি ও তার মিত্ররা নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু করলেও নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ভূমিকা ও পরিবেশ নিয়ে এখনো পুরোপুরি সন্তুষ্ট নয়। দলগুলো প্রয়োজনে শেষ মুহূর্তেও নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর হুমকি পর্যন্ত দিয়েছে।

এ অবস্থায় অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের আবহ বজায় রাখতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিশ্লেষক ও বিশিষ্টজনরা। তাঁরা বলছেন, সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচনী আবহ তৈরির শুরুতে ইসিকে নিরপেক্ষ চরিত্রের পরিচয় দিতে হবে। সহিংসতার পর তদন্ত ছাড়াই কোনো এক পক্ষের ওপর দায় চাপানো সমীচীন নয়। সব দলকে সহনশীল আচরণ করতে হবে। প্রতিপক্ষের লোকজনকে গ্রেপ্তারের জন্য প্রশাসনকে প্রভাবিত করার কোনো কাজে ক্ষমতাসীন দলকে দেখতে চায় না সাধারণ মানুষ। কারণ সাধারণ মানুষ ভোটের আগের পরিবেশ দেখে উৎসাহিত। তবে আগাম সতর্ক অবস্থানে থাকতে হবে ইসিকে। অপপ্রচার চালিয়ে সহিংসতা বা নাশকতা ঘটানোর মাধ্যমে কেউ যাতে পরিবেশ নষ্ট করতে না পারে সে বিষয়েও সবাইকে সচেতন ও সক্রিয় থাকতে হবে।  

বিশ্লেষকদের মতে, গত বুধবার রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপি কার্যালয়ের সামনে হামলা, তার জের ধরে গ্রেপ্তার এবং তার আগে মোহাম্মদপুরে স্থানীয় আওয়ামী লীগের কোন্দলের কারণে দুজনের প্রাণহানির ঘটনা উৎসবময় পরিবেশকে নষ্ট করছে।

এদিকে আওয়ামী লীগের গতবারের নির্বাচনী মিত্র জাতীয় পার্টি আগেরবারের মতোই মহাজোটগতভাবে ভোটে লড়তে চায়। তবে তারা আওয়ামী লীগের কাছে দাবি করছে ১০০ আসন। দর-কষাকষি করছে বিকল্পধারাও। খোদ আওয়ামী লীগেও মনোনয়নপ্রত্যাশী অনেক। টানা ১০ বছর ক্ষমতায় থাকা দলটির নেতারা মনোনয়ন নিয়ে প্রতিযোগিতায় কতটা সহনশীল থাকতে পারবেন তা নিয়ে শঙ্কা আছে। আবার বিএনপির কোনো কোনো নেতা জোটের সমীকরণে মনোনয়ন না পাওয়ার আশঙ্কায় আওয়ামী লীগ বা তার মিত্র দলে ভিড়ে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে লড়তে চাইছেন। এসব ঘটনার জের ধরে বিভিন্ন স্থানে সহিংসতাও হতে পারে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বা সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করতে হবে ইসিকে। ইসি ক্ষমতাসীন দলকে বেশি সুবিধা দিচ্ছে বলে দৃশ্যমান হলে ভোটারদের আস্থা কমে যাবে।

সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য ইসিকে আরো ভূমিকা রাখতে হবে বলে মনে করেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খান। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আস্থার সংকট এখনো কাটেনি। নির্বাচনী উত্তাপ রয়েছে। নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পারবে কি না, তা নিয়ে তার অবস্থান স্পষ্ট করতে পারেনি। সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে তাই সংশয়ের অবকাশ আছে। আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম কিনতে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের ভিড়ে ধানমণ্ডিসহ আশপাশের সড়ক অচল ছিল। যানজটে মানুষকে ভুগতে হয়েছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। আমি নিজেও একদিন আড়াই ঘণ্টা যানজটে থেকেছি ওই এলাকায়। নির্বাচন কমিশন প্রথম দিকে বিষয়টি খেয়াল করেনি, ব্যবস্থা নেয়নি।’

হাফিজউদ্দিন খান বলেন, ‘ঐক্যফ্রন্ট নেতারা নির্বাচন আরো পেছানোর দাবি জানিয়েছেন। নির্বাচন কমিশন তাঁদের বলেছে আর পেছানো যাবে না। কিন্তু কী কারণে আর পেছানো যাবে না তার যুক্তিগুলো নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে তুলে ধরা হয়নি। যুক্তি ভালোভাবে তুলে ধরা উচিত ছিল।যুক্তি তুলে না ধরে রাজনৈতিক দলের দাবি অগ্রাহ্য করলে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। বিরোধীরা তার সুযোগ নেবে। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে আস্থার সংকট রয়েই গেছে। সেটা দূর করতে হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন বলছে, তারা নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত। কিন্তু আমরা প্রস্তুতির অবস্থাটা দেখতে পাচ্ছি না।’

গতকাল শুক্রবার রাজশাহী, রংপুর ও খুলনা বিভাগের সহকারী রিটার্নিং অফিসারদের ব্রিফিংয়ে নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম বলেছেন, ‘পৃথিবীর কোথাও শতভাগ সুষ্ঠু নির্বাচন হয় না। আমরা একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে চাইছি, যা নিয়ে কারো প্রশ্ন থাকবে না।’

এ প্রসঙ্গে হাফিজউদ্দিন খান বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম যে বলেছেন নির্বাচন শতভাগ সুষ্ঠু হবে না, এটা বলা অনুচিত হয়েছে। তিনি বলতে পারতেন, শতভাগ সুষ্ঠু নির্বাচনের চেষ্টা করা হচ্ছে।’

হাফিজউদ্দিন আরো বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে দলীয় কোন্দলসহ বিভিন্ন ধরনের সমস্যা তো আছেই। ইতিহাসের রেকর্ডসংখ্যক প্রার্থী আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন চেয়েছেন, সেটা প্রায় চার হাজার। আগের চেয়ে কত সহজ হয়ে গেছে মনোনয়ন চাওয়া। একটি আসন থেকে অসংখ্য মনোনয়নপ্রত্যাশীর দৃশ্য প্রমাণ করে দলের অবস্থাটি।’

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পরিবেশ ভালো। নির্বাচন কমিশন তার নির্বাচন পরিচালনার জন্য প্রশাসনের দায়িত্ব গ্রহণ করবে। সেটা কিভাবে হয় সেটা দেখার বিষয়। তবে নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করার জন্য এখন বিরোধীদের বিরুদ্ধে অহেতুক হামলা, মামলা কমাতে হবে। সব দলকে নির্বাচনের মাঠে সমান সুযোগ দিতে হবে। কেউ যেন আতঙ্কে না থাকে।’ নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানমের বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে তোফায়েল আহমদ বলেন, ‘তিনি বলতে পারতেন নির্বাচন শতভাগ সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠানের চেষ্টা নির্বাচন কমিশনের থাকবে। তা না বলে শতভাগ সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় বলে তাঁর যে বক্তব্যের কথা বলা হচ্ছে, তা দেওয়া তাঁর উচিত হয়নি।’ আওয়ামী লীগের চার হাজার ২৩ জন এবং বিএনপির চার হাজার ১১২ জন মনোনয়নপ্রত্যাশীর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ওটা উৎসবমুখরতা নির্দেশক নয়। এটা নৈরাজ্যকর। সবাই সংসদ সদস্য হতে চায়। সংসদ সদস্য হওয়াটা ব্যবসার মতো লাভজনক হয়ে গেছে। ভোট মানে উৎসব নয়, এটা দায়িত্ব। এটা নির্বাচন কমিশনসহ সব দলকে মাথায় রাখতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘বিএনপিতেও মনোনয়নপ্রত্যাশী এত বেশি যে মনে হচ্ছে সংসদ সদস্য পদ পাওয়া কত সহজ। এটা হচ্ছে সংসদ সদস্যের নির্ধারিত কাজের বাইরে আরো ক্ষমতা বাড়ানো। প্লট, ফ্ল্যাট দেওয়া, দপ্তরি নিয়োগ, স্কুল পরিচালনা কমিটি, বিভিন্ন কমিটিতে তাদের ক্ষমতা বেড়েছে। সংসদ সদস্য হতে পারলেই ক্ষমতা বাড়বে। তাই মনোনয়নপত্র বেশি বিক্রি হয়েছে। এখানে প্রকাশ পেয়েছে বিশৃঙ্খলা, নৈরাজ্য।’

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা, মানবাধিকারকর্মী ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের চেয়ারপারসন সুলতানা কামাল বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের গত কয়েক দিনের আচরণে সাধারণ মানুষের মনে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে আসলে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কি না। নির্বাচন কমিশন তার ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে পালন করছে কি না এ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মনোনয়ন ফরম কেনা নিয়ে আমরা যা দেখলাম, একটা জোটকে তারা একেবারেই ছাড় দিয়ে দিল। যেভাবেই হোক, হাজার হাজার মানুষকে নিয়ে এসে ফরম নেওয়া হলো। কিন্তু অন্য একটি দলে যখন মনোনয়ন ফরম বিক্রি হচ্ছিল তখন তাদের লাঠিপেটা করা হলো, একটা ঘটনা ঘটল। নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করল। তারা আগে খেয়াল করেনি। তাদের এই আগে খেয়াল না করাটা গ্রহণযোগ্য নয়। তাদের এই অজুহাত গ্রহণযোগ্য নয়।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সাধারণ সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নির্বাচনের জন্য পরিবেশটি দুই দিন আগেও ইতিবাচকই ছিল। তা ঘোলাটে করা হয়েছে, উত্তাপ ছড়ানো হয়েছে। সেটা করা হয়েছে বিএনপি কার্যালয়ের সামনে হামলার ঘটনায়। আজ শুনলাম নরসিংদীতেও ঘটনা ঘটেছে। নিরাপত্তাকে এসব বিষয় প্রশ্নবিদ্ধ করে। মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিরপেক্ষ থাকতে হবে। তাদের প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে সক্রিয় থাকতে হবে। তাদের আচরণ যেন পক্ষপাতদুষ্ট না হয়। নির্বাচন কমিশনের উচিত কাজের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করা যে তারা নিরপেক্ষ। সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করার জন্য তাদের আন্তরিকতা কাজের মাধ্যমে আমরা দেখতে চাই। সংসদ সদস্যরা স্বীয় পদে থেকে এলাকায় গিয়ে নির্বাচনে প্রভাব ফেলছেন কি না তা তদারকি করতে হবে নিরপেক্ষভাবে। মুখে বললে বা নির্দেশ দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, সংসদ বিলোপ ও নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের বিষয়গুলো তো বাস্তবায়ন হয়নি। যেহেতু হয়নি সেহেতু নির্বাচন কমিশনকেই বেশি দায়িত্ব পালন করতে হবে প্রকৃত দায় নিয়ে। নির্বাচন সামনে, সরকারবিরোধীদের গ্রেপ্তার, হামলা কিংবা দলীয় লোকদের পদায়ন—এসব বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের কড়া নজর থাকা উচিত। কারণ আমরা সুষ্ঠু নির্বাচন চাই।’

বদিউল আলম মজুমদার বলেন, প্রধান দুই দলে মনোনয়ন ফরম বেশি বিক্রি হওয়ার কারণ এমপি পদটি লাভ করা।

 



মন্তব্য