kalerkantho


একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

টিকে থাকাই চ্যালেঞ্জ বিএনপি জোটের

এনাম আবেদীন   

১৬ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



টিকে থাকাই চ্যালেঞ্জ বিএনপি জোটের

বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট এবং নতুন গড়া জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে টিকে থাকতে পারবে কি না, সে প্রশ্ন এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। কারণ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও এখনো স্বস্তিতে নেই দলগুলো। বরং ওই সব জোটের প্রার্থীরা শেষ পর্যন্ত নির্বিঘ্নে নির্বাচনী প্রচার চালাতে পারবেন কি না সেটাই তাঁদের বড় চিন্তা। এ ছাড়া গ্রেপ্তার আতঙ্ক কাটিয়ে জোটের কর্মীদের নির্বাচনী এলাকায় নেওয়া যাবে কি না, সে দুশ্চিন্তাও আছে বিএনপিসহ জোটের নেতাদের মধ্যে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে এমনটি জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট নেতারা জানান, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সার্বিকভাবে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে জোটের নেতাকর্মীদের মধ্যে দুশ্চিন্তা সবচেয়ে বেশি। সে কারণেই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বা সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরির দাবি নিয়ে ঐক্যফ্রন্ট বারবার নির্বাচন কমিশনে (ইসি) যাচ্ছে। গত বুধবারও ইসিতে গিয়ে ওই দাবি জানিয়ে আসে তারা।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা টিকে থাকার চেষ্টা করছি। কিন্তু সরকার চায় কি না আমরা নির্বাচন করি, সেটিই বড় প্রশ্ন।’ তাঁর মতে, গায়েবি মামলা প্রত্যাহার এবং গ্রেপ্তার আতঙ্ক দূর না হওয়া পর্যন্ত সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হবে না। গত বুধবার নয়াপল্টনে পুলিশের সঙ্গে বিএনপির নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনাকে ফখরুল ষড়যন্ত্র ও উসকানি বলে মন্তব্য করেন।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী অবশ্য মনে করেন, প্রশাসন নিরপেক্ষ আচরণ করলেই নির্বাচন নিয়ে আর কোনো সমস্যা থাকে না। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী এই মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ‘গতকাল (বুধবার) নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠক থেকে মনে হয়েছে তাদের ভূমিকা কিছুটা ইতিবাচক। একটু একটু করে পরিবেশ তারা তৈরি করতে পারছে।’

গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী মনে করেন, নির্বাচনে টিকে থাকার প্রশ্নে সব ধরনের চ্যালেঞ্জ বা বাধা এখনো সামনে আছে তাঁদের। কারণ সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সরকার দৃশ্যমান কিছুই করেনি। তিনি বলেন, ‘সরকারের নীলনকশা হলো আমরা যাতে নির্বাচনে না যাই। তারা এরশাদকে নিয়ে আরেকটি ৫ জানুয়ারি করতে চাইছে। তা ছাড়া ইসির ভূমিকাও এখনো সংশয়মুক্ত নয়। না হলে হঠাৎ করে কেন আজ বললেন, কোনো কর্মসূচি লাইভ প্রচার করা যাবে না।’ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের  এই নেতা বলেন, ‘আওয়ামী লীগ চার দিন ধরে উৎসব করল; অথচ বিএনপি করলেই বলা হচ্ছে এটা করা যাবে না, আচরণবিধি লঙ্ঘন। কিন্তু আমরা শেষ দিন পর্যন্ত নির্বাচনে টিকে থেকে সরকারের স্বরূপ উন্মোচন করতে চাই।’  

নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকার ক্ষেত্রে এখনো অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে মনে করেন জেএসডির সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতন। তিনি বলেন, ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হয়নি। প্রশাসন ও পুলিশ এখনো নিরপেক্ষ আচরণ করছে না। নির্বাচন কমিশনও ইতিবাচক ভূমিকা নিচ্ছে না।’ তাঁর মতে, হামলা-মামলা করে কর্মীদের মাঠে নামতে দেবে কি না সেটাই হলো সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, ‘জনগণের যে সমর্থন, তাতে নির্বাচন শতকরা ৫০ থেকে ৬০ ভাগ সুষ্ঠু হলেও জয় আমাদের আসবে। আর সরকার এটি জানে বলেই ক্রমাগত উসকানি দিয়ে যাচ্ছে।’

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য ডা. জাহেদ উর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা টিকে থাকতে পারব কি না তার চেয়ে বড় প্রশ্ন, সরকার আমাদের টিকে থাকতে দেবে কি না।’ নাগরিক ঐক্যের এই নেতা বলেন, ‘নানা উসকানি সত্ত্বেও ঐক্যফ্রন্ট ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। সরকার কোনো স্পেস না দিলে নির্বাচন থেকে সরে আসাও অস্বাভাবিক নয়।’

এমন ইঙ্গিত দিয়ে সম্প্রতি বিএনপির মহাসচিবও বলেছেন, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি না হলে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবে।

গত বুধবার নাইকো দুর্নীতি মামলায় শুনানিতে খালেদা জিয়া আদালতে বলেন, ‘আমাদের আদালতে ব্যস্ত রাখলে নির্বাচন করব কিভাবে? অনেক প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে আমাদের এগোতে হচ্ছে। এর ওপর বারবার আদালতে আসতে হলে বলে দেন আমরা নির্বাচনে না যাই।’

২০ দলীয় জোটের শীর্ষস্থানীয় নেতা বিজেপির সভাপতি ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ অন্যান্য দাবি এখনো আছে। কিন্তু নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে আন্দোলনের অংশ হিসেবে। আমরা মনে করেছি, ভোট দেওয়ার সুযোগ পেলে জনগণ ব্যালটের মাধ্যমে জবাব দেবে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ২০ দলীয় জোট বা ঐক্যফ্রন্ট শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থাকবে কি না সেটি সরকার ও ইসির ওপর নির্ভর করছে।       

দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে গত ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে কারাগারে আছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এর পর থেকেই নির্বাচনে যাওয়ার বিষয়ে বিএনপিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। এরপর গত ১০ অক্টোবর ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ে তারেক রহমানের যাবজ্জীবন সাজা হওয়ায় ওই অনিশ্চয়তা আরো বাড়ে। বিএনপির পাশাপাশি জনমনে এমন আলোচনা ছড়িয়ে পড়ে যে নেতৃত্ব সংকটে পড়া বিএনপির পক্ষে নির্বাচনে যাওয়া কঠিন। দলের মধ্যেও এ প্রশ্নে দ্বিধাবিভক্তি তৈরি হয়। তবে বিএনপির নেতারা ধৈর্যের সঙ্গে এমন পরিস্থিতি মোকাবেলা করার কৌশল নেন এবং দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে সক্ষম হন। খালেদা জিয়ার মুক্তি ছাড়া বিএনপি নির্বাচনে যাবে না—এমন কথা প্রকাশ্যে বলা হলেও শেষ পর্যন্ত ড. কামাল হোসেনকে সামনে রেখে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে গত ১০ নভেম্বর নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানায় বিএনপি।

নির্বাচনে অংশ নিয়ে গণজোয়ার সৃষ্টি করতে পারলে একপর্যায়ে প্রশাসন পক্ষপাতমূলক ভূমিকা থেকে সরে আসবে—এমন আশা থেকেই বিএনপি ও তার মিত্ররা ওই সিদ্ধান্ত নেয়। আবার রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকেও বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেওয়াই ভালো উপায় বলে মনে করে। কিন্তু গ্রেপ্তার আতঙ্ক এখনো বিএনপি ও মিত্রদের দুশ্চিন্তার বড় কারণ বলে আলোচনা আছে।   

বিএনপির দাবি, সারা দেশে দলটির নেতাকর্মীদের নামে কয়েক হাজার মামলা আছে এবং এতে কয়েক লাখ আসামি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৭ ও ১৩ নভেম্বর দুই দফায় বিএনপির পক্ষ থেকে মোট দুই হাজার ৪৮টি ‘গায়েবি’ মামলার তালিকা জমা দেওয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। এতে মোট আসামি উল্লেখ করা হয়েছে এক লাখ ৩২ হাজার ৯২৬ জন। এ ছাড়া অজ্ঞাতপরিচয় আসামির সংখ্যা কয়েক লাখ। গত ১ নভেম্বরের প্রথম দফা সংলাপে নির্বাচনের আগে এসব মামলা তুলে বা স্থগিত করে নির্বাচনে প্রচারের সুযোগ প্রধানমন্ত্রীর কাছে চেয়েছে বিএনপি, যদিও এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি। নির্বাচনী প্রচারে নামলেই ওই সব মামলায় গ্রেপ্তার করে নেতাকর্মীদের নিষ্ক্রিয় করা হবে বলে বিএনপি জোটের মধ্যে আশঙ্কা আছে।

 



মন্তব্য